অবনী হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এসেছিল সেদিন। মুখ আর মুখোশের মানে সেদিনই সে ভালো ভাবে জেনে গেল। নদীয়ার কালীগঞ্জ, আর মেদিনীপুরের বালিঘাই এগরার কোনো ফারাক নেই।
পঞ্চায়েত থেকে ঢেঁড়ি পিটিয়ে গিয়েছে কাল ডিভিসি আবার জল ছাড়বে। এই ছাড়া জলে শুরু হবে নতুন করে তাণ্ডব। বাঁধের কোণায় ছুঁয়ে থাকা জল উপচে যাবে এবার। ইঁদুরগর্তে ঘোলা জলের স্রোত ঢুকে তৈরি করবে ঘূর্ণি। বাঁধের ঘোঘা বড়ো হলে বাড়বে জলের ঘর-সংসার।
বাঁধ বাঁচানোর চেষ্টা চলছে সব প্রকার। সবাই এক বাক্যে দুষছে আকাশকে। আকাশের ছেরানি রোগ না সারলে সমূহ বিপদ। গোদের উপর বিষফেঁড়ার মতো ছাড়া জল আরও ভয়ঙ্কর। শুধু মাঠ ভাসবে না, ভাসবে ঘর। ভয়ে পা থেকে মাথা অবধি শিরশিরিয়ে উঠল অবনীর।
–মা শীতলাবুড়ি মুখ রেখো মা। জয় মা বুড়িমা মুখ রেখো মা। অবনী বিড়বিড়িয়ে উঠল, আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই মা। দয়া করো, আমার সংসারটা যেন না ভেসে যায়।
সরস্বতীর অসহ্য লাগছিল অবনীর হাবভাব। সে চেঁচিয়ে ডাকল তার ঘরের মানুষটাকে কৈ গো, এদিকে এসো। ঠাকুর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে? ঠাকুর নয়, মানুষের মতো দাঁড়িয়ে ছিল অবনী, কথাটা তার গায়ে লাগল। কোনোমতে ফ্যাসফেসে গলায় বলল, যাচ্ছি, তুমি সব ঘরের জিনিসগুলো বের করে দাও।
গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টি ঝরছে, ভিজে গেলে? সরস্বতীর গলায় বজবজিয়ে উঠল সংশয়জনিত সন্দেহ।
সামান্য বিরক্তি হলেও তা চেপে রাখল অবনী, তোমাকে যা বলছি তাই করো তো।
সরস্বতী ঝাঁঝিয়ে উঠতে পারত কিন্তু সে ওপথে হাঁটল না, মাথা নীচু করে সুড়সুড়িয়ে সে ঢুকে গেল ঘরের ভেতর। সংসারের ছড়ানো জিনিস চোখে লাগে না, গোছাতে গেলে সেটাই হয়ে ওঠে একটা মস্ত বোঝ। তবু একা কোনোমতে মালপত্তর ভর্তি বস্তাটা বহু কষ্টে টেনে আনে দোরগোড়ায়। সামান্যতেই হাঁপিয়ে যায় সে। সাহায্যের জন্য শুভর দিকে তাকাতেই শুভ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, মা ধরব।
কোনো উত্তর না দিয়ে সরস্বতী বুঝিয়ে দিল তার কি কর্তব্য। ততক্ষণে অবনী এসে হাত লাগাল বস্তায়, যাও আর একটা বস্তা আছে, সেটাও নিয়ে আসো।
–অত জিনিস ছাদের উপর রাখবা কোথায়? সরস্বতীর প্রশ্নে যথেষ্ট যুক্তি ছিল, অবনী না ভেবেই বলল, থালা-বাসন না নিয়ে গেলে মাটিতে যে খেতে হবে। এগুলো আগে ছাদে তোলা দরকার।
–দেখো রাতে যেন শোওয়ার মতো জায়গা থাকে। আমি বাপু সারাদিন খাটাখাটনির পর রাত জাগতে পারব না।
-তোমার রাত জাগার কোনো দরকার নেই। রাতটা আমি সামলে দেব। তুমি দিনটা সামলিও।
-খাওয়ার জলের কি হবে? সরস্বতীর প্রশ্নে যেন ঘুম ভেঙে জেগে উঠল অবনী, অনবরত জল ঝরা টিউবওয়েলটার দিকে তাকিয়ে সে বলল, এখনও সময় আছে জল ভরে নেওয়ার। বানের জল ঢুকলে কল ডুবে যাবে। তখন খাওয়ার জল আর পাওয়া যাবে না।
শুভ মা-বাবার কথা মন দিয়ে শুনছিল, অবশেষে সে বলল, জল পাওয়া যাবে তবে জল আনতে গেলে থানার কলে যেতে হবে। সবুজ বলছিল বড়ো বানের সময় সব ডুবেছে কিন্তু থানার মাঠ ডোবে নি।
কথা শুনে আশ্বস্ত হয়ে শ্বাস ফেলল অবনী। বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে একতলার ছাদে ওঠা কোনো কঠিন কাজ নয়। তবে বাঁধ না ভাঙলেও রাতটা ওখানে কাটাতে হবে না হলে যে কেউ ছাদে উঠে গায়েব করে দেবে মালপত্তর।
নৈঋতে মেঘ করেছে যা হারিয়ে দেবে কালো খাসীর গায়ের রঙ। এই বুনো মেঘকে ভীষণ ভয় পায় অবনী। এর হাবভাব, মতিগতি কিছুই বোঝা যায় না। এই মেঘ পদ্মর মতো সুন্দর, ঘোলা নেশার চেয়েও নেশাখোর। চাপ বাঁধা মেঘ ঢাললে চট করে থামতে চায় না। আবার পেছল হয়ে যাবে পথঘাট। মাঠের বাকি কেঁচো উঠে আসবে উঠোনে। অবনী হা-করে তাকিয়ে থাকে সেই ধুমসা মেঘের দিকে।
.
৩৭.
দুপুরের আগে বাঁধ ভেঙে গেল দুজায়গায়। মালীপাড়া আর কদবেলতলা ধাওড়ায়। ঘাসুরিডাঙার কাছে বাঁধ উপচে জল ঢুকছে গায়ে। চুঁইয়ে চুঁইয়ে ভেসে যাচ্ছে বাঁধের মাটি। বালির বস্তা ফেলেও কোনো কাজের কাজ হল না। বিদুর বলল, আর প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দরকার নেই। এবার যে যার ঘরে যাও।
লোকমুখে হাজার কথা কানে আসছিল অবনীর। যত শুনছিল ততই অস্থির হচ্ছিল মনটা। দেশগাঁয়ে কেলেঘাই নদীতে বান আসত। বৃষ্টির জলে কখন কেলেঘাই মাঠ পেরিয়ে ঢুকে যেত গাঁয়ের ভেতর। অতিথির মতো জলদস্যু সেজে খুন করত গরীব মানুষের স্বপ্ন। সে বান আর এ বানে কত ফারাক। এ বানের জলের শব্দ দশটা বুনো হাতির সমান। কান পাতা দায়। ভয়ে ধড়াক করে বুক। কলজেয় বুঝি কেউ ঢুকিয়ে দেয় নখ।
অবনী ধড়াস বুকে ছাদে উঠে এল সবার শেষে। সরস্বতী বলল, দেখো, আর কিছু রয়ে গেল কি না।
অবনী গা করল না, কেমন বিষণ্ণ চোখে তাকাল। হাসপাতালের মাঠে ফণা তোলা সাপের মতো জল ঢুকছে। অবনী ভ্যাদামাছের মতো ড্যামা ড্যামা চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে। ছাদ থেকে মালীপাড়ার বাঁধের ভাঙা চেহারাটা দেখা যায়। জলের সাথে ভেসে আসছে কান-ফাটানো আওয়াজ।
ভয়ে গলা শুকিয়ে গেল সরস্বতীর, ওগো, দেখছো কেমন জল ঢুকছে।
-বাঁধ ভাঙলে জল ঢুকবেই। এ তো জলের ধর্ম—
সরস্বতী চুপ করে শুনল কথাগুলো। তারপর কেমন ঝিমিয়ে গিয়ে বলল, এত কাছে বাঁধ ভাঙল যে রাতে জলের শব্দে ঘুম আসবে না। জলের শব্দ নয়তো যেন বিসর্জনের হাজার ঢাক বাজছে।
