রেগে গেলে সহজে আর স্বাভাবিক হতে পারেন না। তবে বেঁটে খাটো মানুষটার মন ভালো। পেয়ারা তলায় অবনীকে ডেকে বললেন, আমরা চলে যাব। তোমরাও চলে যাও। আগুনকে বাগে আনা যায় কিন্তু জলকে তো বাগে আনা যায় না। জলের মতো বেয়াদপ পৃথিবীতে আর দুটি নেই।
দাঁড়িয়ে থেকে চোখ ঝাপসা হয়ে এল শুভর। সবুজের ব্যবহার আজ তার অস্বাভাবিক ঠেকছে। সবুজ যেন তাকে চেনে না এমন মুখভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে আছে। যেন কত অজানা, অচেনা। কেন এমন অপরিচিতের মতো মুখ করে চেয়ে আছে সবুজ। ওকি কিছু বলতে চায়? তা যদি হবে তাহলে এগিয়ে আসছে না কেন? ওর সাথে তো ঝগড়া হয়নি? ওরা চলে যাবে বলেই কি বিচ্ছেদের পাচিল তুলছে ইচ্ছে করে? শুভ এক দৌড়ে ঘরের মধ্যে চলে এল। চেনা ঘরের চেহারা বদলে গিয়েছে বন্যার ভয়ে। এক মানুষ সমান উঁচু করা হয়েছে তক্তপোষ। দরকারী জিনিসপত্তর বস্তায় বেঁধে নিয়েছে অবনী। ত্রিপল দিয়ে অস্থায়ী ছাউনি বানিয়েছে ছাদের উপর। বাঁশের সিঁড়িটা যাতে বন্যার জলে ভেসে না যায় সেইজন্য সিঁড়ির দুমাথা গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে শক্ত করে। ঝড়ো হাওয়ায় ত্রিপল যাতে না উড়ে যায় সেইজন্য ইটচাপা দিয়ে রেখেছে। ত্রিপলের ডগায়। মুষলধারে বৃষ্টি হলে এই অস্থায়ী ছাউনি কতটা কাজে দেবে তা ওপরওয়ালাই জানেন।
এতকিছুর পরেও মনোবল হারায়নি অবনী। সে বান-বন্যা দেশের মানুষ। ঘোলাজল তার কাছে চাষের জল। জলকে সে ভয় পায়নি কোনোদিনও। তবে স্রোতের মুখে সে বাহাদুরী দেখাতে ভয় পায়। স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব কিছু। তবু জীবনের অন্য নাম স্রোত একথা সে অস্বীকার করতে পারে না।
পাঁচিলের ধারে আইশ্যাওড়া গাছের পাতাগুলো চকচক করছে কৃষ্ণবরণ যুবতীর মুখমণ্ডলের লাবণ্যের মতো। আইশ্যাওড়ার ডাল ভেঙে দাঁত মাজলে সাদা মুলোর চেয়েও ঝকঝক করে দাঁত। ওই বেঁটে গাছের গোলাপী ফলগুলো নেশা ধরিয়ে দেয় অবনীর চোখে। মেদিনীপুরের দেশ গাঁয়ে এমন ফল তার চোখে পড়েনি। এক এক জেলার মাটিতে একেক ধরনের চাষ, গাছপালা ঝোপঝাড়ও ভিন্ন ভিন্ন। মাটি কি তাহলে রূপ বদলায় জায়গা বুঝে? অবনীর মাথাটা ঝিমঝিমিয়ে ওঠে বৃষ্টি ভেজা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে।
তার মনের অনেকটাই খেয়ে নিয়েছে বন্যা। এই বন্যা বুঝি হাঙরের মতো এগিয়ে আসবে তাকে পুরোপুরি গিলে নিতে। টিকেদারবাবুর তিনজন মুনিষ গোরুর গাড়িতে চাপিয়ে দিচ্ছে ঘরের জিনিস। তদারকির কাজ মন দিয়ে দেখছেন তিনি।
একে একে এই হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাবে সবাই। ওরা জানে জলের সঙ্গে কুস্তি লড়া সহজ ব্যাপার নয়। বাঁধ ভাঙা জল বুনো হাতির চেয়েও ভয়ঙ্কর। তার পাগল হয়ে দৌড়ে বেড়ান সবাই সহজ চোখে মেনে নিতে পারবে না। বানের জল আর ঘূর্ণি হাওয়া দুজনের বড়ো ভাব। সামনে যা পাবে তাই গিলে খাবে গোগ্রাসে, রাক্ষস।
অবনী চোখ ফিরিয়ে নিয়ে উদাস হয়ে গেল নিমেষে। কুমোরখাদকে এখন আর চেনা যায় না, ভরা যৌবন ঢ্যাপফুলের চেয়েও সুন্দর। রোদের সাথে জলের খেলা সহজাত। কতদিন রোদের মুখ তারা দেখেনি–সে কথা ভাবার চেষ্টা করল অবনী। মন খারাপ হয়ে গেল তার।
পালবাড়ির উদ্দেশ্যে ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তুলে যাচ্ছে মালবোঝাই গোরুগাড়ি। পেছন পেছন হাঁটছেন টিকেদারবাবু। অবনী ভাবছিল তিনি হয়ত যাওয়ার সময় পিছু ফিরে তাকাবেন। কিন্তু তার ভাবনায় গোড়ায় গলদ। বিপদের দিনে মানুষ আগে বাঁচাবে নিজেকে। নিজে বাঁচলে বাপের নাম। আশাহত অবনীর মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল।
ঘেঁটকুল গাছের পাতা চুঁইয়ে জল ঝরছে হরদম। এই গাছগুলোকে কেউ বুঝি দেখেও দেখে না। এর রূপ যেমন তেমনি এর বদগুণ। গিয়াস গাছি রস চুরি ঠেকাতে ঘেঁটকুল কচুর গোড়া কুঁচি কুচি করে কেটে রেখে দিত রসের ঠিলিতে। চুরি করে রস খেতে গেলে তার কুটকুটানি আর কমত না। ডাক্তার-বদ্যি না করালে নিস্তার নেই এমন জ্বলন। অবনী ঘেঁটকুল ভেজানো রস খায়নি তবু তার ভেতরটা জ্বলছে। শুভর প্রশ্নটা তাকে স্বস্তি দিচ্ছিল না কিছুতেই, বাবা, সবাইকে ডেকে নিয়ে গেল অথচ আমাদের কেউ ডাকল না। কেন ডাকল না বাবা?
কি উত্তর দেবে অবনী ছেলের এই প্রশ্নের। সব প্রশ্নের কি উত্তর হয়। কিছু প্রশ্ন আছে যার উত্তর জেনেও নীরব থাকতে হয়। অবনীও এ ঘটনায় কম দুঃখ পায়নি। এতগুলো বছর এক সঙ্গে বসবাস করা অথচ বিপদের সময় ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়া এ কেমন বিচার বাবু ভদ্র সমাজের? চোখের চামড়া মোটা না হলে এমন কাজ কেউ কি করতে পারে?
ডাক্তারবাবুর মেয়ে মাধুরীই একমাত্র বলেছিল, আমাদের সঙ্গে শুভদেরও নিয়ে চল। বাঁধ ভেঙে গেলে ওরা কোথায় থাকবে?
মেয়ের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেন নি ডাক্তারবাবু। প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে মুখ কালো করে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। মেয়ের নির্বুদ্ধিতায় তিনি যে রীতিমত অপ্রস্তুত এটা তার হাবভাব চোখের দৃষ্টি বলে দিচ্ছিল। দিনের আলোতেও আড়াল খুঁজছিলেন তিনি।
দিনের আলোতে যার মন কালো হয়ে যায় তার আড়াল বুঝি কোনোদিনও জোটে না। অবনীর ভাবনায় এই চিন্তাগুলো মিছিল করে আসছিল বারবার। ডুমুরের পাতার চেয়েও খসখসে হয়ে গেল তার মনের আস্তরণ। ব্যাধিটার কোথায় জন্ম, জন্ম থেকে জেনে গিয়েছে অবনী। বামুনবুড়ির হলে তাকে যে কাজটায় ঢুকিয়েছে সে কাজটা আদৌ তার নয়। প্রথম প্রথম সংকোচ হত হাসপাতাল ঝাড়ু দিতে। পরে সেই সংকোচ ব্যাঙাচির লেজের মতো খসে যায়। জীবনের জন্য কোনো কাজ ছোট নয়। মন ছোট হলে বুক ছোট হতে বাধ্য। বুক ছোট হলে ভাবনা হয়ে যায় সাগর থেকে ডোবা। গন্ধ ডোবার মন নিয়ে সুগন্ধ আশা করা যাবে কিভাবে।
