–তুর বাবা-মা জানে না? বিস্ময়ের বাঁধ ভেঙে গেল রঘুনাথের।
সূর্যাক্ষ দরাজ গলায় হেসে উঠল, বাবা একদিন দেখে ফেলেছিল তবে বকেনি। শুধু বলল-তোমার এখন সিগারেট খাওয়ার বয়স হয়নি। খাচ্ছো যখন বেশি খেও না। ওষুধের মতো পরিমাপ করে খেও।
তার মানে?
–মানেটা বুঝলি না? সূর্যাক্ষ বেশ মজা করে বলল, বাবা বলেছে–একটা দুটো খেতে। তার বেশি যেন না হয়। আসলে গরিব পার্টি করে তো। গরিব মানুষের দামি জিনিস বেশি খাওয়া ভালো নয়।
-তোর কাছে বিড়ি আচে? রঘুনাথ সাহস নিয়ে বলে ফেলল কথাটা, কালীপুজোর রাতে থাকা দেখতে গিয়েচিলাম। সেদিন প্রথম বাঁধের ধারের দুকান থিকে সিকারেট কিনে খাই। বড়ো কড়া মাল। গলায় ধুয়ো আটকে গিয়েচিলো। তামুকটা তিতা-তিতা, জিভে লাগলে চড়বড় করে জ্বলে।
সূর্যাক্ষ উঠে গিয়ে বইয়ের তাকটার কাছে দাঁড়াল। বই ভর্তি তাকের ভেতর থেকে সে বিড়ির বান্ডিলটা বের করে আনল। একটা রঘুনাথকে দিল, নে ধরা।
-দেশলাই না দিলে কি হাওয়ায় বিড়ি ধরে?
–ও হো। ভুল হয়ে গিয়েছে। সর্যাক্ষ বিছানার তলা থেকে লুকোনো দেশলাইটা বের করে দিল। শুধু রঘুনাথ নয়, সে নিজেও একটা বিড়ি ধরিয়ে মৌজ করে টান দিয়ে বলল, বিড়ি হল গিয়ে আয়ুবর্ধক ধূম্র টনিক। যে খেয়েছে সেও পস্তায়, আর যে খায়নি সে-ও পস্তায়। এ হল গিয়ে শাঁখের করাত। যেতে কাটে, আসতে কাটে। দুনিয়া ঘুরে এলে এর তুলনা পাওয়া ভার।
রঘুনাথ অর্ধেক কথা না বুঝে বোঝার মতো মুখ করে তাকাল। তখনই নীচ থেকে ডাক ভেসে এল মীনাক্ষীর। উদ্বেগ ভরা গলা। ব্যস্ত হয়ে উঠল সূর্যাক্ষ, এই রে, মা ডাকছে। মৌরির কৌটোটা কোথায় রাখলাম? বিছানার উপর তো রেখেছিলাম। বিছানার উপরে মৌরির কৌটো ছিল না, ওটা ছিল বইয়ের তাকে। শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেতেই গুচ্ছের মৌরি মুখে পুরে দিল সূর্যাক্ষ, তুই বস। আমি আসছি।
দক্ষিণ খোলা ঘর, হাওয়া এসে অবাধে হাডুডু খেলছে ঘরের ভেতর। পাতলা পর্দা তিরতির করে উড়ছে সেই হাওয়ার আদরে। পাশের বাঁশবন থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে কোঠরা ব্যাঙের ডাক। আশেপাশে কোথাও বুঝি চামচিকির বাসা আছে, বিদঘুঁটে গন্ধে নাক কুঁচকে যাচ্ছে রঘুনাথের।
মিনিট দশেক পরে কাঠের সিঁড়ি কাঁপিয়ে ফিরে এল সূর্যাক্ষ, মা এখনও খায়নি। বাবার ভাত আগলে বসে আছে। আমি কত বললাম খেয়ে নিতে। কিছুতেই খাবে না। পতিভক্তির জ্বলন্ত উদাহরণ। পেটে জ্বালাপোড়া শুরু হলে বুঝবে!
–তুর বাপ কি সবসময় অমন দেরি করে?
সূর্যাক্ষ অন্যমনস্ক হয়ে গেল, বাবার এই এক দোষ। সময়জ্ঞান থাকে না। হঠাৎ বাইরের গেট খোলার শব্দ হল। ঘড়িতে পেন্ডুলাম মাথা ঠকল বারো বার। সূর্যাক্ষ ঢিল ফেলা পুকুরের মতো চঞ্চল হয়ে উঠল, এই বাবা এল। যাক, বাঁচা গেল। নাহলে এত রাতে মা আমাকে খুঁজতে পাঠাত।
-তুর বাপ যে এয়েচে কি করে বুঝলি? রঘুনাথ নিজেকে চালাক ভেবে প্রশ্ন করল। সূর্যাক্ষ বলল, বাবার গেট খোলার কায়দাটাই আলাদা। গেট খোলার শব্দ শুনে আমি বলে দিতে পারি কে এসেছে।
–ভারী মজার তো! রঘুনাথ সুতোর কাছাকাছি আগুন এসে যাওয়া বিড়ির টুকরোটা নিভিয়ে জানলা দিয়ে ফেলে দিল। সূর্যাক্ষ কাঠের চেয়ারটা টেনে নিয়ে তার মুখোমুখি বসল, তোকে একটা কথা বলা হয়নি।
-কী কথা? রঘুনাথ আগ্রহ প্রকাশ করল না।
–থাক, কাল বলব।
রঘুনাথ বইয়ের তাকটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে শুধোল, এই তাকে সব বই তুর? অ্যাতো বই তুই পড়িস কী করে? এত মোটা মোটা বইতে ছবি থাকে না?
-থাকে। তবে সেই ছবি তোর ভালো লাগবে না। সূর্যাক্ষ এড়িয়ে যেতে চাইল।
-ওই মোটা বইটা দেখব? পড়তে তো পারব না, অন্তত ছুঁয়ে দেখি। রঘুনাথের মোটা ঠোঁটে হিলহিলিয়ে উঠল মলিন হাসি। বইটা টেনে বাইরে আনতে গিয়ে হাত থেকে ঠিকরে পড়ল। বেশ শব্দ হল। বই ছিঁড়ল না কিন্তু বইয়ের ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল একটা সাদা-কালো মেয়ের ছবি। অপ্রস্তুত সূর্যাক্ষ ছবিটা চিলের মতো ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে লুকিয়ে ফেলতে চাইল গেঞ্জির ভেতর। রঘুনাথের মনে দোলা দিয়ে উঠল রোমাঞ্চ, ওটা কি রে? আমাকে দেখাবি না বুঝি? ঠিক আছে, ওটা আর লুকোস নে, ঠিক জায়গা মতো রেখে দে। পড়া-লিখার জিনিস, হারিয়ে গেলে তুর ক্ষেতি হবে। রঘুনাথ কিছু আন্দাজই করতে পারেনি, সে বোকার বোকা, হদ্দবোকা। এবার বন্ধ জানালাটা খুলে দিল সূর্যাক্ষ। সাদা-কালো ছবিটা বিছানার উপর ছুঁড়ে দিয়ে সে বলল, নে দেখ। আমার লাভার। আমি একে ভালোবাসি।
বুকের ভেতর
০৬.
মানুষের বুকের ভেতর কত কি যে লুকোনো থাকে, মানুষের হৃদয় হল সমুদ্রতল! শুধু জল নয়, সেখানে জীবনও থাকে। রঘুনাথ ভালোবাসা ছাড়া কোনো শব্দেরই অর্থ উদ্ধার করতে পারল না, সে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল, ছবিটা খাট থেকে তুলে নিল হাতে। তারপর নতুন কিছু দেখার মতো সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ছবিটাকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জড়তা ভেঙে গিয়ে ডিম ফোঁটা মুরগির বাচ্চার মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল বিষয়টা, সূর্যাক্ষ মুখোমুখি চেয়ার টেনে বলল, মেয়েটাকে চিনলি না তো? ওর নাম দ্বীপী। নিমতলার ধারে ওদের ঘর। আমি রোজ একবার করে ওদের বাড়িতে যাই। গিয়ে গিয়ে নেশার মতো হয়ে গিয়েছে। না গেলে কষ্ট হয়, বুকটা টনটনিয়ে ওঠে, মনে হয় সারাদিনের কোনো একটা কাজ করতে ভুলে গিয়েচি। রঘুনাথ আশ্চর্য হল না, মেয়েটার সাথে বুঝি তুর লটঘট চলছে? তা ভালো। তবে এসব ধ্যাসটুমু করতে গিয়ে পড়াশোনার যেন দফারফা না হয়ে যায়। পীরিত করা বড়ো ঝামেলার জিনিস রে। আমার বুড়াদাদু বলে ভাব-ভালোবাসা হল গিয়ে বুড়িগাঙের বানের জল, এই আচে ওই নেই, তাই ভালোবাসা বুকে বয়ে বেড়িয়ে শরীল খারাপ করার কুনো মানে হয় না।
