শুভর পাশের গ্রাম চাপড়ায় যাবার কোনো ইচ্ছে ছিল না। এখন কাদা পথে সাইকেল ঠেলতে হাজার সমস্যা। মাইলখানিক পথ মাঠে মাঠে যাওয়া যায়, নয়তো আমবাগানের পথটা ধরতে হবে। দাসপাড়ার পাশ দিয়ে যে রাস্তা গিয়েছে সেটা তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। বেলে মাটিতে কাদা হয় না, আর হলেও সে কাদা কোনো সমস্যা তৈরি করে না।
ঘর থেকে দুটো থলি আর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল শুভ। অন্য সময় হলে সে অজুহাত তৈরি করে এড়িয়ে যেত। সরস্বতী যাওয়ার সময় বলল, সাবধানে যাবি। মোটে দেরি করবি নে। তুই না আসা পর্যন্ত আমার খুব চিন্তা হবে।
শুভরও ভয় করছিল। বলা যায় না কখন বাঁধ ভেঙে যায়। বন্ধুদের মুখে বন্যার ভয়াবহতার কথা সে বিশদ শুনেছে।
শুভ কাছ থেকে তার বাবাকে দেখে। বাবার মুখের দুঃখী ভাবটা তার ভালো লাগে না। একটা মানুষ সব সময় গালে হাত দিয়ে কী ভাবে এত? মানুষের সমস্যার শেষ নেই। সমস্যা থাকবে তা বলে সমস্যার ভেতরে তলিয়ে যেতে হবে মানুষকে? মাথা তুলে দাঁড়াবার কোনো চেষ্টা থাকবে না মানুষের? এভাবে কথায় কথায় হেরে যাবার কোনো অর্থ হয় না। কালীগঞ্জ বাজারে বিদুর কাকার বক্তৃতা শুনেছে সে। এত সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে যা শুনে গায়ের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। মাথা ঠিক রাখা যায় না। অথচ বিদুরকাকার দুবেলা ভাত জোটে না। শিবনাথবাবু কত হেয় করে কথা বলেন তার সঙ্গে। মাথা গরম হয়ে ওঠে শুভর। মানুষের সঙ্গে মানুষ এত খারাপ ব্যবহার করে কি ভাবে? তার মা বলে, চোখের চামড়া মোটা হলে মানুষ পশু হয়ে যায় যখন তখন। শুভর মনে হয় মায়ের কথাটা সত্যি।
শিবনাথবাবু শুধু মোটা নয়, তার চোখের চামড়াও মোটা। মনটা ভাগাড়ের চেয়েও নোংরা। শুধু সাদা ধবধবে পোশাক পরলেই মানুষের মন পরিষ্কার হয় না।
চাপড়া থেকে ফিরতে বেলা গড়িয়ে গেল। সাইকেল ঠেলে হাঁপিয়ে উঠেছিল শুভ। মেঘে ঢাকা আকাশের গোমড়া মুখ ভাসছিল কালভার্টের জলে। যে কোনো সময় ঝাঁপিয়ে পড়বে এমন একটা মুহূর্ত। বড়ো অসহ্য লাগছিল শুভর। এক সময় বৃষ্টি না হলে ভীষণ মন খারাপ করত তার। এখন মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিতে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। কতদিন মাঠে যায় নি খেলতে। খেলবে কোথায়? মাঠ ভর্তি জল সাদা আঁচল বিছিয়ে দিয়েছে পরম মমতায়। কদিন থেকে শুভ লক্ষ্য করছে টিউবওয়েলটার দৈন্য দশা। হ্যাঁন্ডেলে চাপ না দিলেও জল ঝরছে অনবরত।
সরস্বতী কপাল কুঁচকে বলল, এ লক্ষণ ভালো নয়। এমন হলে মানুষের কপাল ফাটে।
শুভ এ কথার অর্থ পরিষ্কার বুঝতে পারেনি। তবে সামনে যে খুব খারাপ সময় এটা সে অনুভব করতে পেরেছে। অবনী হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে বলল, দেখো মাঠের কেঁচো সব বারান্দায় উঠে এসেছে। এ লক্ষণ ভালো নয়। মনে হচ্ছে সামনে মহাবিপদ। আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে।
প্রকৃতি ক্ষেপলে তার ক্ষেপামু চট করে দূর করা যায় না। বিধির থাবা বাঘের থাবব চাইতেও হিংস্র। বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে অবনী ঠকঠক করে কঁপছিল। কথা বলার ইচ্ছে হল না তার।
–কি ভাবলে? বেজার মুখে শুধোল সরস্বতী।
অবনী নিরুপায় হয়ে বলল, কি আর ভাবব, ভাবার আর কি আছে। যা হবে দেখা যাবে।
–জানো, আমার খুব ভয় করছে। আমি জীবনে বন্যা দেখিনি।
বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকাল অবনী, অত ভেবো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। মাথার উপর একজন আছে তো
সরস্বতীর বুকটা ভয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠল, অশুভ আশঙ্কায় দুলে উঠল মন।
–আমাদের ঘরটা যদি জলের তোড়ে ভেঙে যায় তাহলে?
-ধুর, অমন কোনোদিন হয় নাকি? অবনী জোর গলায় বলে, সাবধানে থাকতে হবে। সাবধানের মার নেই। আমি নিজেকে নিয়ে ভাবি না। শুধু শুভর কথা ভাবছি ।
সরস্বতী মুখ ফিরিয়ে বলল, গাঁয়ের মানুষগুলোর কি হবে গো? ওরা কোথায় যাবে?
-শুনেছি সবাই বাঁধের উপর থাকবে। এক বাঁধ ভেঙে গেলে বাকি বাঁধের ক্ষতি হয় না।
অবাক হয়ে শুনল সরস্বতী। বিস্ময়ও অনেক সময় রক্ত চলাচল বাড়িয়ে দেয়। কালো চাপ বাঁধা মেঘের দিকে তাকিয়ে বুক শুকিয়ে গেল তার। চারপাশ থেকে উঠে আসা জলীয়গন্ধ অসহ্য লাগল তার নাকে।
হাসপাতালের পাঁচিলের ও পিঠে কুমোরদের খাদ। বারো মাস ওখান থেকে মাটি কেটে নিয়ে যায় ওরা। গত বছর গরমে খাদে ঢুকে মাটি কাটতে গিয়ে চাপা পড়ে গিয়েছিল একজন। হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও সে বাঁচল না। মাটির বিরাট চাই তার বুকটাকে জলে চুবানো স্পঞ্জের মতো নরম করে দিয়েছিল। বড়ো ডাক্তার বুকে চাপ দিতেই গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এসেছিল নাক-মুখ দিয়ে। সেই ভয়াবহ দৃশ্য এখনও মাঝে মাঝে মনে পড়ে সরস্বতীর। কুমোরখাদের দিকে তাকাতে তার ভয় করে। চোখের তারা কেঁপে ওঠে।
সবুজরা আর একটু পরে চলে যাবে। ওদের গোছগাছ প্রায় সারা। পাল বুড়ো দুটো গোরর গাড়ি পাঠিয়েছে ওদের জন্য। সবুজের মা অনেক আগে দুই মেয়েকে নিয়ে চলে গিয়েছেন। তার পায়ে ব্যথা জোরে হাঁটতে পারেন না। হঠাৎ বাঁধ ভেঙে জল এলে কোথায় যাবেন তিনি। আগাম সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। সবুজ দুরে দাঁড়িয়ে ওদের ব্যস্ততার আঁচ পাচ্ছিল। মাত্র কদিনেই সবকিছু যেন বদলে গেল। এত নিবিড় সম্পর্ক সব যেন ছানাকাটা দুধের মতো ছাড়া-ছাড়া হয়ে গেল। গত কদিনে অনেক বেশি গভীর দেখাচ্ছে সবুজকে। বাঁধের ধারে সে একদিনও যায় নি জল দেখতে। ওর বাবা ভীষণ কড়া ধাতের মানুষ। ডাক্তারবাবু বলেন, হাই প্রেসার।
