ওয়ারাম অনেকদিন পরে ঝারিকে দেখল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। রূপ যেন ফেটে পড়ছে বউটার। বর্ষার মানকচু গাছ বুঝি লজ্জা পাবে তাকে দেখে। রসিকতা করার লোভটা সামলাতে পারল না গুয়ারাম, ছেলের মুখেভাত হয়ে গেল–আমার মিঠাইটা কুথায় গো বউমা?
ঝারি মজা পেয়ে হাসল, হবে, সব হবে। আগে আমার দুয়ারে তুমার পায়ের ধুলো পড়ুক-তারপর।
-দেখচো তো আমার শরীলের অবস্থা। বড়ো বিপন্ন শোনল গুয়ারামের কণ্ঠস্বর, জানি না আর কোনোদিন তুমার ছেলের মুখ দেখা হবে কি না! তবে আমার শরীলের অবস্থা ভালো নেই। পাটকাঠির বেড়ায় উই লেগেছে গো…।
-তুমার ভাইয়ের মুখে সব শুনেচি। ঝারির চোখে সমবেদনা ফুটে উঠল। গুয়ারাম বলল, শরীর পারলে একদিন তুমার দুয়ারে যাব। তবে কবে যাবো আগাম বলতে পারচি নে। তুমি একবার সময় পেলে ছেলেটারে নিয়ে এসো। আমার ছেলেটা তো আর আমার হল না!
-সে কি কথা!
-হ্যাঁ, যা সত্যি তাই বলছি। মেলা দিন হল সে ঘর আসেনি। গুয়ারাম কাছিমের মতো মুখ তুলে চারপাশটা দেখে নিল, আগে তাও রাত-বেরাতে আসত। এখন আর মুটে আসে না। জানি না সে বেঁচে আছে কি না।
–কি যা তা বলচো! ঝারি বিমূঢ় ঢঙে তাকাল, রঘুর কুনোদিন ক্ষতি হবে না। ওর মতন ছেলে হলদিপোঁতায় কটা আচে বলতো?
গুয়ারাম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উপরের দিকে মুখ তুলল, ওই ওপরওয়ালাই জানে সে এখুন কুথায়। সারে বড়ো অভাব গো! সে এলে জান-মান বাঁচত।
ডিভিসি জল ছাড়ল আবার। আখের ভুই ডুবে গিয়েছে জলে। বুড়িগাঙ চওড়া হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছে চরসুজাপুর কমলাবাড়ি পর্যন্ত। দিগন্ত জুড়ে শুধু ঢেউ আর ঢেউ। সেই সঙ্গে ঘোলা জলের তান্ডব। এই জলের দিকে তাকালে রঘুনাথের কথা মনে পড়ে গুয়ারামের। অথচ ঘোলা জলের সাথে কালো কুচকুচিয়া রঘুনাথের কত ফারাক।
কয়লা কালো, বেবুর কাঠ কালো। ওদের দেহে লুকিয়ে আছে আগুনের ঝোরা। আগুনের পাহাড়। বুড়িগাঙের জলে আগুনের ঢেউ উজান ঠেলে চলেছে জীবনের নতুন পদাবলী রচনার জন্য।
গুয়ারাম বাঁধে দাঁড়িয়ে লাঠিটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
.
৪৮.
ঘেঁটকুল গাছের মসৃণ পাতায় মোটা মোটা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে চোখের নিমেষে। অ্যাশোওড়ার পাতাতেও জল দাঁড়ায় না, শুধু ওর গোড়াগুলো ডুবে আছে চেটো ডোবা জলে। টানা সাতদিন ধরে বৃষ্টি, আকাশের তবু থামবার কোনো লক্ষণ নেই। এমন সৃষ্টিছাড়া বৃষ্টিতে মিয়ানো মুড়ির মতো মন নিয়ে ঘুরছিল শুভ। অবনী তাকে দেখতে পেয়ে ডাকল, শোন, আকাশের মতিগতি ভালো বুঝছি নে। এইমাত্র পঞ্চায়েত অফিস থেকে ঘুরে এলাম। সবাই বলাবলি করছে যে কোনো সময় বাঁধ ভাঙতে পারে। বাঁধের যা দশা বেশিক্ষণ আর ঠেকা দিতে পারবে না।
শুভর চোখ থেকে নিমেষে উধাও হয়ে গেল স্বস্তি। তার বদলে একটা শিউরে ওঠা ভাব ওর চোখের সাদা জমির দখল নিল। অবনীর তর সইছিল না। চিন্তার শেষ নেই ওর। বাধ ভাঙলে ঘর সংসার নিয়ে কোথায় দাঁড়াবে সে? কোয়ার্টারের সবাই যে যার মতো গোছগাছ করে নিয়েছে। খাটের পায়ায় চারটে-ছটা ইট দিয়ে উঁচু করেছে খাট। সেই উঁচু খাটের উপর ঘরের জিনিস সাজিয়ে রেখেছে সবাই। জল যাতে ছুঁতে না পারে তার জন্য সবার মধ্যে এক অসম লড়াই।
জলের থাবা বিশাল থাবা। সেই থাবা থেকে বাঁচার ক্ষমতা নেই কারো। অবনী কপাল কুঁচকে ভাবল এ যাত্রায় পার পেয়ে গেলে ভালো। নাহলে বিপদের আর শেষ থাকবে না। বাঁধ ভেঙে গেলে হাসপাতালের মাঠ নাকি সমুদ্র হয়ে যায়, থৈ-থৈ জলে তখন সাঁতার ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
ডাক্তারবাবু তাঁর কোয়াটারের যাবতীয় জিনিস পাঠিয়ে দিয়েছেন শিবনাথবাবুর বাড়িতে। চারবার ট্রিপ দিয়েছে শিবনাথবাবুর ট্রাক্টর। কালীগঞ্জ বাজারের ওদিক বেশ উঁচু। বড় বন্যার সময় জল ওঠেনি। এবছর যে জল উঠবে না একথা কেউ হলফ করে বলতে পারে না। তবে জল উঠলেও ভয়ের কোনো কারণ নেই। কেননা শিবনাথবাবুর দোতলাবাড়ি, দোতলাতেই প্রায় দুখানা ঘর। ছখানা ঘরের দুখানা ঘর তিনি ছেড়ে দিয়েছেন ডাক্তারবাবুকে। একদিন আগে থেকে মাধুরীরা ভয়ে চলে গিয়েছে ওখানে। শুধু ডাক্তারবাবু নন কোয়ার্টারের আর সবাই যে যার মতন ব্যবস্থা করে নিয়েছেন মাথা গোঁজার।
সবাই যা অনায়াসে পেরেছে, অবনী তা পারেনি। এটা তার অক্ষমতা কিনা ভাবছিল সে। গালে হাত দিয়ে হাত ব্যথা হয়ে গেল তবু সে এর কোনো উত্তর পায়নি। গ্রামসমাজে ছোঁয়াছুঁয়ি রোগটা বালি ঢাকা নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে। অস্পৃশ্যতা বুঝি স্বর্ণলতার মূল, যার গোড়া খুঁজে কেউ উপড়ে ফেলতে পারে না। হাসপাতালের আউটডোরে দাঁড়িয়ে ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, অবনী শেষ পর্যন্ত তুমি কি ঠিক করলে? কোথায় যাচ্ছো? যদি কোথাও ঠিক না হয়ে থাকে তাহলে সময় থাকতে বড়ো ইস্কুলে চলে যাও। শুনেছি, ইস্কুলের মাঠটা উঁচু। সবাই বলছিল গেল বন্যায় ওখানে জল ওঠেনি।
এসব উপদেশ হাজারবার শুনে অবনী ঠিক করেছে বাঁধ ভাঙলেও সে আর কোথাও যাবে না। বাঁশ দিয়ে ছাদে ওঠার সিঁড়ি বানিয়ে নিয়েছে সে। একটা বড়ো মাপের ত্রিপল সংগ্রহ করেছে সে। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে ত্রিপলটাকে কাজে লাগাবে সে। আকাশ ধরলে তার আর কোনো চিন্তা নেই। কোয়ার্টারের ছাদের উপর দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারবে। লোকের বাড়িতে গেলে বউ-ছেলে নিয়ে নিরাপদে থাকতে পারত সে। গাঁয়ের কেউ তাকে থাকার প্রস্তাব দেয়নি। আর এসব কথা আগ বাড়িয়ে সে কাউকে বলতে পারেনি। তার ভিতরেও সংকোচ জড়তার শেষ নেই। সবাই ছোট কাজ করে বলে ঘেন্না করে। তাদের চোখের ঘৃণা সে কি ভাবে মুছে দেবে? তার এত শক্তি কোথায়? সে শুধু শুভকে বলল, তুই খপখপ চাপড়া চলে যা। চাল আর আটা নিয়ে চলে আসবি। চাল আটা থাকলে অনেকটাই ঠেকা দিতে পারব। খাওয়া-দাওয়ার চিন্তা না থাকলে তখন অন্য চিন্তা করা যাবে।
