বাঁধের গোড়ায় সড়সড় করে জল। এই জলের স্বভাব চোরের মতন। রঘুনাথ জলের দিকে তাকিয়ে সুতোর কাছাকাছি এসে যাওয়া বিড়িটা ছুঁড়ে দিল দূরে। সাত করে একটা হেরে যাওয়ার শব্দ হয়ে নিভে গেল বিড়িটা।
নূপুর এগিয়ে এল তার সামনে, দাদারে, ঘর যাবি নে?
নূপুরের কথায় ছ্যাঁকা খেল রঘুনাথ, মুখ ফেরাল সে, ঘর যেতে তো মন চায়, কিন্তু মা তো কথা বলে না।
–ও জেঠির কথা বাদ দাও। নপুর হালকা করতে চাইল প্রসঙ্গ।
রঘুনাথ সেই একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে বলল, মার কথা বাদ দিলে হয় বল? আমি বুঝতে পারিনে, মার কাছে আমি কি দোষ করেছি?
-ও তোমার বুঝে কাজ নেই। নপুর রঘুনাথের হাত ধরে টানল, নিজের ঘরে না যাও তো, আমাদের ঘরে চলো। বাবা চলে যাওয়ার পর ঘরটা কেমন কঁকা হয়ে আছে।
-তা তো হবেই! মানুষটা যে কুথায় গেল।
–আমার মনে হয় তারে কেউ মেরে ফেলেছে! নূপুর বোবার মতো তাকাল।
–কে মারবে তাকে? তার কেউ শত্রু ছিল না।
-ছিল গো, ছিল। তুমি জানো না। নুপুরের গলা একটুও কাপল না। সে দৃঢ় গলায় কথাগুলো বলে রঘুনাথের মুখের দিকে তাকাল।
রঘুনাথ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, মোটে ভাববি নে, কাকা ঠিক ফিরে আসবে। তার মতন মানুষ বেশিদিন ঘরছাড়া হয়ে থাকতে পারবে না। হলদিপোঁতা ছেড়ে সে সপ্নে গিয়েও সুখ পাবে না।
নপুর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল, ঘর খরচা এট্টা টাকাও নেই আমার কাছে। কদিন খুদ ফুটিয়ে খাচ্চি। দাদু জাউভাত খেতে পারে না। প্রতিদিন খাওয়ার সময় চোখের জল ফেলে। আমার দেখতে ভালো লাগে না।
নুপুরের কথা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল রঘুনাথের। অথচ একসময় কত মানুষ ওদের ঘরে পাত পেড়ে খেয়ে যেত। লুলারামের মন খোলা আকাশ না হলেও সে কৃপণ নয়। মানুষের বিপদে আপদে প্রায় সে দাঁড়াত। হলদিপোঁতার পুজো পরবে সে ছিল সবার আগে। রঘুনাথ ছোটবেলায় ভাবত-বড়ো হয়ে সে কাকার মতো হবে। তবে ঢিলি কাকির জন্য তার দুঃখ হত। মনটা ঝাঁকিয়ে উঠত হর সময়। ঢিলি কাকির উপর কাকার ব্যবহার মোটেও ভালো ছিল না। তার মনে হয় কাকা কোনোদিন চাইত না কাকি ভালো থাকুক।
পাপ করলে আজকাল শাস্তি হাতেনাতে পেতে হয়। এক আকাশে দুটো চাঁদ ওঠে না। ঢিলি কাকি নিজেকে সরিয়ে নিল স্বেচ্ছায়। তার মৃত্যু ওদের স্বাধীনতা দিতে পারেনি, বরং বিচ্ছেদের সাপটা ছোবল মেরেছে দু-জনকে। সেই বিষে জ্বলে পুড়ে দন্ধেছে ওরা দুজন।
নূপুরের মুখের দিকে তাকিয়ে রঘুনাথ অকপটে বলল, তুই ভাবিস নে, আমি সময়মতো তোর কাছে সব কিছু পৌঁছে দেব। পকেট হাতড়ে সে কিছু টাকা নুপুরের হাতে গুঁজে দিল, এগুলো রাখ। পরে আরও দেব। মার খোঁজ নিবি। আমি রাতে এসে বাবাকে দেখে যাব। বলা যায়
-কোথায় কোন পুলিশের লোক ঘুরছে।
–পুলিশ তুমার কি করবে?
–কিছু না। ধরে নিয়ে গিয়ে হাজতে পুরে দেবে।
-তুমার দোষ কি যে তোমাকে হাজতে দেবে? নূপুরের সরল জিজ্ঞাসায় একটু অবাক হল রঘুনাথ, নিজেকে আড়াল করে সে বলল, আমি ধোয়া তুলসীপাতা হতে পারলাম কই? আমারও মেলা দোষ আচে।
তুমার কি দোষ তা জানি। নূপুর বিশ্লেষণী তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। রঘুনাথ হতভম্ব। পাশ কাটিয়ে বলল, জল দেখে ঘরে ফিরে যা। আমার তাড়া আছে। আমাকে পাশের গায়ে যেতে হবে। কপা এগিয়ে আবার ফিরে এল রঘুনাথ, পকেট থেকে বেশ কিছু টাকা মুঠো করে বের করে বলল, শোন নূপুর, এই টাকাগুলো লুকিয়ে বাবাকে দিয়ে দিবি। মা যেন না দেখে। মা দেখলে আমার ছোঁয়া লাগা টাকা ছিঁড়ে কুচি কুচি করে উড়িয়ে দেবে।
নূপুর ঘাড় নেড়ে বাঁধের গোড়া বেয়ে নেমে গেল।
বর্ষায় বৃষ্টির দেখা নেই অথচ শরৎ ঋতুতে হড়হড়িয়ে ঢালল মেঘ। টানা সাতদিনের বৃষ্টিতে হাঁপিয়ে উঠেছিল দুর্গামণি, ঘরে চাল বাড়ন্ত অথচ খিদের জন্য গুয়ারামের বুকের ব্যথাটা আরও চাগিয়ে ওঠে। সে ভ্যালভেলিয়ে আশেপাশে তাকায়। কাউকে দেখতে না পেয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এই দুর্দিনে ছেলেটা একবার ঘরে এলে ভালো হত। ওর কি মন কাঁদে না বাপ-মার জন্য? আজকালকার ছেলেমেয়েদের মতিগতি বোঝা দায়। ওরা আষাঢ়ের মেঘের চেয়েও হড়বড়ে, তড়বড়ে–এক জায়গায় তিষ্ট্রতে জানে না।
রঘুনাথের চিন্তায় গুয়ারামের রাতের ঘুম ছুটে গিয়েছে, চোখে ঘুম না এলে দল বেঁধে ব্যথা আসে। ওরা খাবলায়, খুবলায়। আছড়ে-পাছড়ে ঘুম চটকে পালায়। তখন বিছানা আঁকড়ে বাকি রাতটুকু আবোল-তাবোল ভাবা। ভাবনার কি শেষ আছে? ভাবনা তো স্বর্ণলতার মূল। ওর মুড়ো খুঁজে পাওয়া ভার।
পেছল পথে লাঠি ছাড়া হাঁটতে কষ্ট হয় গুয়ারামের। বাপের আগে তাকে লাঠি ধরতে হল বলে মাঝে মাঝে তার মনে খেদ জন্মায়। খেদ থেকে সৃষ্টি হয় ঘৃণার। নীলাক্ষবাবুকে সে ক্ষমা করতে পারে না। যদি কোনোদিন আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে ওই মানুষটাকে সে ছেড়ে কথা বলবে না।
খুব সতর্কতায় লাঠি ঠুকতে ঠুকতে বাঁধের গোড়া অবধি এল গুয়ারাম। নুয়ে পড়া বাঁশগাছের ছায়ায আঁধার হয়ে আছে পথ। একদল সাতভায়া পাখি কাদার উপর খপর খপর করে হাঁটছে। ওদের শিস দেওয়া বন্ধ নেই। ঝগড়া করার মতো অনর্গল বকে যাচ্ছে ওরা। গুয়ারামের সহ্য হচ্ছিল না সেই চিৎকার। লাঠি উঁচিয়ে পাখিগুলোকে সে তাড়াতে গেলে ভারসাম্য হারিয়ে শরীরটা টলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তখনই কচু শাকের বোঝা নামিয়ে ঝারি তাকে ধরে ফেলল, সাবধানে চলাফেরা করো গো, পড়ে গেলে এঁটেল কাদা গায়ে জড়িয়ে যেত যে
