পুকুর থেকে উঠে আসার সময় মণিরুলের গা থেকে জল ঝরছিল কাল বাউশ মাছের আঁশ থেকে জল ঝরার মতো। তার পেটা, খাজ খাঁজ শরীর স্বাস্থ্য দেখে হাঁ হয়ে গিয়েছিল রঘুনাথ। হাবুল চোর সেলাম দিয়ে কথা শুরু করল নিজস্ব ভঙ্গিতে।
সব শুনে মণিরুল বলল, কাফেরের সাজা কায়দা করে দিতে হয়। জালিলদের বেশি বাড়তে দিতে নেই। রসে ভেসে যাওয়ার আগে রস শুকিয়ে খরার মাঠ করে দাও। দেখবা সব ঠিক হয়ে যাবে, আপসেই সাইজে এসে যাবে।
-সে ভার তুমাকে নিতে হবে মনিরুল ভাই।
-ঘর যাও। আর ভেবো নি। তাতি কিভাবে তাঁত বুনবে সেটা তার উপর ছেড়ে দাও। মনিরুল গামছা নিংড়ে গা মুছতে মুছতে তাকাল, আমার লোক যাবে, তারে সব পথ ঘাট দেখিয়ে দিও। আমি শেষবেলায় গিয়ে সব ছকে আসব। তবে তিনটে নৌকো ঘাটে বেঁধে রেখো। তেমন বুঝলে আমরা জলে-জলে কাটোয়া পেলিয়ে যাব।
হাবুল চোর ঘাড় নাড়ল, ওসব নিয়ে ভেবো নি। তুমাদের রাস্তায় না তুলে দিয়ে আমি ঘর ধরবোনি। কথা দিলাম–
অমাবস্যার রাত্রিতে মণিরুল তার দলবল নিয়ে চড়াও হয়েছিল নীলাক্ষবাবুর বাড়িতে। সব মিলিয়ে তার দলে ছিল ছাব্বিশজন। অতর্কিত হামলায় কেঁপে উঠেছিল সারা গ্রাম। নীলাক্ষবাবুকে থামে বেঁধে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক একনাগাড়ে পিটিয়ে গেল মণিরুল। সিন্দুকের চাবি দিতে অস্বীকার করায় প্রহারের মাত্রা বেড়ে হল দ্বিগুণ। মারের চোটে ভূত পালায় কথাটা সত্যি। নীলাক্ষবাবুর উঁচু মাথা মারের চোটে নেতিয়ে ভূমি নিল এক সময়। ঘর ছাড়ার আগে মণিরুলের ঝোলায় তখন পঁচিশ ভরি সোনা, দুসের রূপো, নগদ ছহাজার টাকা। গোলা ভর্তি ধান যাওয়ার আগে পুকুরের জল ঢেলে দিয়ে গেল জনা দশেক ডাকাত। সেই সঙ্গে আগুন ধরিয়ে দিল দোতলা বাড়ি সমান উঁচু খড়গাদায়। নীলাক্ষবাবুর স্ত্রী তুঙ্গভদ্রার কপাল ফাটিয়ে দিল ওরা। একমাত্র মেয়ে ক্ষমাঞ্জলিকেও এরা ক্ষমা করল না। ওর গলায় এক ভরির সোনার চেনটা খুলে দিতে দেরি হচ্ছিল বলে হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়ে দিল। শুধু রক্ষা পেয়ে গেল কমলাক্ষ। সেদিন সে ঘরে ছিল না, পাশের গ্রামের কুটুমঘর গিয়েছিল।
বোমা ফাটাতে ফাটাতে মণিরুলের দল চলে গেল বাঁধ ধরে। এক দল মানুষ থ হয়ে দেখল খড়পোড়া আগুন। তাদের চোখে আগুন আতঙ্কের পদাবলী।
সেই আগুন-শপথ পুরোপুরি বদলে দিল রঘুনাথকে। হাবুল চোরের পায়ের কাছে বসে নেশাগ্রস্ত রঘুনাথ প্রতিজ্ঞা করল, হাজার বিপদে পড়লেও এ পথ আমি আর ছাড়বোনি। আজ থিকে আমি হলাম রঘু চোর। তুমার যখন দরকার পড়বে আমাকে ডেকো। আমি এক ডাকে হাজির হবো। সেই থেকে রঘুনাথের বদলে যাওয়া শুরু। সে ঘরের বেড়াল থেকে হয়ে গেল বনের বাঘ। লোকে তাকে রাস্তাঘাটে দেখলে পাশ কাটিয়ে চলে যেত। তাসের আড্ডায়, বাঁশের মাচায়, মদের ঠেকে, সবখানে রঘুনাথের চর্চায় মশগুল হয়ে উঠল গ্রামের বাতাস। সেই হাওয়ায় নড়েচড়ে বসল থানা। পুলিশ থেকে চৌকিদার সবার খোঁজ ছিল রঘুনাথের। কিন্তু রঘুনাথ বুঝি রঙ বদলাতে পারে। গাছে উঠলে সে গাছের পাতা হয়ে যায়, রাতে সে আরও মিশমিশে কালো। দিনের বেলাতেও সে চোখে ধূলো দেওয়াতে মাস্টার। রঘুনাথ তখন স্থিতু হতে জানে না, তার পায়ের তলায় সর্ষে, এখন এপারে তো তখন ভিনপারে।
ছেলের কুকীর্তির কথা শুনতে শুনতে চোখের জলে ভাসে দুর্গামণি। দিনমানে রঘুনাথ গাঁয়ে ঢুকতে পারে না পুলিশের ভয়ে। রাত-বেরাতে সে যখন আসে তখন তীব্র অভিমানে দরজা খোলে না দুর্গামণি। গুয়ারাম ঘুম জড়ানো চোখে কাতর হয়ে বলে, দরজা খুলে দাও গো, ছেলেটারে আসতে দাও। লুলার সাথে আমাদের রঘুর অনেক ফারাক আচে। লুলা যদি তুষের আগুন হয়, আমার ঘরের রঘু হল গনগনে আগুনের টিপি। আমার বাপ-ঠাকুরদা যা পারেনি, রঘু তা হাসতে-হাসতে পেরেছে। ও নীলবাবুরে উচিত শেক্ষা দিয়েছে। বড়ো বাড় বেড়েছিল বাবুটার। ধরাকে সরাজ্ঞান করত। আমার ঘরের রঘু ওর সরা ফেটিয়ে দিয়েছে। রঘুনাথকে ঘরে ঢুকতে দেওয়ার পেছনে গুয়ারামের স্বার্থ ছিল। বুকের ব্যথায় মাঠে খাটতে যেতে পারে না সে। গা রোদ লাগলে চিড়বিড় করে জ্বলে। খরানীতে ঝ্যানঝেনে কাশি ওঠে। অসহ্য বেদনাটা বুকের চারপাশে কুণ্ডলী পাকানো সাপের মতো বিড়া বানিয়ে ছোবল মারার জন্য তৈরি থাকে। এই ভয় আর ব্যথা দিনরাত গিলে খাচ্ছে তাকে।
হাসপাতালের বড়ো ডাক্তার ওষুধ লিখে দিয়েছে সাদা কাগজে। মুখ দেখিয়ে ওষুধ আসবে না। আর ওষুধ না খেলে বাঁচবে না জান। জান বাঁচানোর জন্য রঘুনাথের কাছে হাত পাতা দরকার। ছেলে রোজগেরে হয়েছে। ছেলে দেবে তার চিকিৎসা খরচা।
দুর্গামণি গুয়ারামের এই মনোভাবকে সমর্থন করে না। সে কান্না ভেজা গলায় বলে, আমার কুনো ছেলে নেই। আমার যে ছেলে ছিল সে মরে গিয়েছে গো। তুমরা সেই মরা ছেলের কথা আমাকে আর শুনিয়ো না গো, তার কথা শুনলে আমার কলিজার হাড় মড়মড় করে ভেঙে যায়।
কান্নার বেগকে সামাল দেওয়া যায় না, দুর্গামণি কাঁদে। গুয়ারামের চোখও লেবু চিপায়। চুনারাম আক্ষেপ করে বলে, কাদিস নে গুয়া, কাঁদিস নে। আমি বেঁচে থাকতে তুর কুনো ক্ষতি হবে না। সে বামুন বাচ্চা তুরে জোড়া পায়ের লাথ মেরেছে। তার ওই সোনার বরণ পা শুকিয়ে মরা আখের মতো হয়ে যাবে। নর হচ্ছে নারায়ণ। তার গায়ে কি পা ভোলা ভালো রে! সবুর কর, তার শাস্তি সে পেয়ে যাবে। এখনও যে চাঁদ-সূয্যি ওঠে। এখনও যে আগুন তাপ দেয়।
