জল দেখবে বলে নূপুর আর মোলক দৌড়ে এসেছে বাঁধ অব্দি। ওরা যে বড়ো হচ্ছে সে খেয়াল ওদের নেই। রঘুনাথ কদমগাছের গোড়ায় বিড়ি টানছিল একমনে। এখন দিনে তার দু তাড়া বিড়ি লাগে না হলে সময় কাটতে চায় না। দু বান্ডিল বিড়িতেও অনেক সময় কম পড়ে তখন চেয়ে-চিন্তে নেশা জুড়োয়।
সব ঠিকঠাক থাকলেও মনটা ঠিক নেই রঘুনাথের। মার খাওয়ার পর থেকে গুয়ারামের বুকে বড়ো ব্যথা হয়। বারো বছরের পুরনা ঘি তার বুকে ভাপ দিয়ে ডলে দেয় দুর্গামণি। তাতেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
চুনারাম কদবেলতলা ধাওড়া থেকে শুনে এসেছে পুরনো শুয়োরের চর্বি ডলতে পারলে বুকের ব্যথা নাকি সেরে যায়। হাঁড়িপাড়ায় গিয়ে পুরনো চর্বির খোঁজ করেছিল সে কিন্তু সেখানেও পেল না। শুয়োরের চর্বি ডালডা ঘিয়ের মতো জমে গেলে অনেকেই ওষুধ কার কাজে কিনে নিয়ে যায়। হাজরা পাড়ার বুড়োটাই বলল, অতো ভেবো না তো। শুয়োরের চর্বি তুমি বসন্তপুর ধাওড়ায় গেলি পরে পেয়ে যাবে। আমি জানি, শ্রীকান্ত রাজোয়ারের ঘরে অনেক দিনের পুরনো চর্বি আছে। আগে ওদের শুয়োরের পাল ছিল। এখন অবশ্যি শুয়োরের পাল নেই কিন্তু চর্বি রয়ে গিয়েছে শিশি ভর্তি।
ছেলের জন্য বসন্তপুর ধাওড়া কেন হেঁটে হেঁটে সে মাটিয়ারি অবধি চলে যাবে। ছেলে তার প্রাণভোমরা। ছেলের জন্য সে পারে না হেন কাজ দুনিয়াতে নেই।
কিন্তু সব শোনার পর রঘুনাথ তাকে যেতে দিল না। জোর করে বলল, তুমার পায়ে বেথা, দাদু। তুমি ঘরে থাকো। আমি যেচি, চর্বি তুমাকে এনে দেবই দেব।
শুয়োরের চর্বি নিয়ে ফিরতে বেলা চড়ে গিয়েছিল টিকলিতে। চান-খাওয়া করে একটু গড়িয়ে নিতে গিয়ে যত ঝামেলা। তালাই পেতে শুয়েছিল গুয়ারাম। একটু ধরে এসেছিল চোখ, আর ঠিক তখনিই শুরু হল হাড়ের গোড়ায় গোড়ায় শুলোনী ব্যথা। বাপ রে, মা-রে বলে বাতাস কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল গুয়ারাম। তার সেই চেঁচানিতে চোয়াল চাগিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছিল রঘুনাথ, তারপর এক ছুটে চলে গিয়েছিল গুয়ারামের কাছে, কি হল গো, অমনি ধারা করছো কেনে?
-সেই বিদনা আবার তালভুসের মতন ঠেলে উঠচে। গুয়ারামের চোখের কোণে থেতো হয়ে গেল জল।
আর সেই জেবড়ে যাওয়া চোখের জলের দিকে তাকিয়ে রঘুনাথের সারা শরীর টগবগিয়ে ফুটে উঠল রাগে। এক অসুরজেদ তাকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াল। ছুটে গিয়ে জোড়া পায়ের লাথি কষিয়ে দিচ্ছেন নীলাক্ষবাবু, এই দৃশ্য বায়োস্কোপের মতন বারবার ঘুরতে থাকে তার মনের পর্দায়। ফাঁকা মাঠে তাকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় বুনো মোষ। ছুটতে ছুটতে জিভ বের করে হাঁপায় রঘুনাথ। কোয়াশের দুপাশে জমে ওঠে লতলতে ফেনা। বদলা, হা বদলা তাকে নিতেই হবে। গুয়ারামের প্রতিটি চিৎকার যেন ধারালো বর্শা হয়ে তার মনের আকড়া জমিতে গেঁথে যায়।
বদলা নেওয়ার নেশায় সে পালবাড়ির গোরু চরানোর কাজটা এক কথাতে ছেড়ে দিল। ভদ্রভাবে তার আর বাঁচা চলবে না। শয়তানের সঙ্গে মালাম লড়াতে গেলে তাকেও শয়তান হতে হবে। ইটের জবাব দিতে হবে পাটকেলে।
জামতলা থেকে ফিরে এসে পুরোপুরি পাল্টে গিয়েছে রঘুনাথ। সে এখন কম কথা বলে, হাসেও কম। তার ভেতরে এখন লুকিয়ে আছে একটা আগুনপাহাড়। ফলে হাবুল চোরের বাড়ি গিয়ে যেচে সে সন্ধি করে এসেছে। সব শুনে খুশি হয়ে হাবুল চোর বলেছে, আমি তুর পাশে আচি। ভয় কি। মনে রাখিস, সাপের ছাল ছড়িয়ে নিলে সে সাপের তেজ কমে যায় মানুষের তো ছাল ছাড়ানো যায় না, কিন্তু দাপটে মানুষ ধরাকে সরা ভাবে সেটা আমরা বেলুন-চুপসা করে দিতে পারি। পেটের টান জব্বর টান। পেটে লাথ মার, দেখবি জোড়া পা কেন, জোড়া হাতও ছোট হয়ে গিয়েছে।
হাবুল চোরের কথাগুলো মাথায় ঘুরছিল রঘুনাথের। নীলাক্ষকে উচিত শিক্ষা না দিলে তার ঘুম আসবে না ভালোভাবে। বাপের রাত কাঁপান চিৎকার তাকে অসহায় করে তোলে। অথচ নীলাক্ষ দিব্যি মাঠে ঘাটে ঘুরছে বুক ফুলিয়ে। অর্থের অহঙ্কারে তার পায়ের ভার সইতে পারছে না মাটি।
হাবুল চোরের সাইকেলের পেছনে বসে ছোট কুলবেড়িয়ায় মণিরুলের ঘরে গিয়েছিল রঘুনাথ। মণিরুল শুধু কালীগঞ্জ থানায় নয়, আশে পাশের সাতটা থানার ত্রাস। আর হবেই বা নয় কেন? হাফিজ ডাকাতের রক্ত তার শরীরে বয়ে যাচ্ছে।
গণ ধোলাইয়ে হাফিজ ডাকাতের নৃশংস মৃত্যুটা মেনে নিতে পারেনি মণিরুল। সে তখন বছর কুড়ির যুবক! রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে গোরু-চোরের মতো অসহায় চোখ নিয়ে শুধু দেখেছে হাফিজ ডাকাতের মৃত্যু যন্ত্রণা। ওই পথ থেকেই তার মনে উঠে এসেছে ডাকাত হবার সুতীব্র বাসনা। পড়ালেখা জানা মনিরুলের দল গড়তে বেশি সময় লাগেনি। হাফিজ ডাকাতের বউ মোতিবিবি তাকে পথ দেখিয়েছে, চেনা-জানা চোর ডাকাতের নাম ঠিকানা সে সব বাতলে দিয়েছে। শুধু তাই নয়-হাফিজ ডাকাতের লুকিয়ে রাখা অস্ত্রশস্ত্র পোশাক আশাক সব দিয়ে দিয়েছে বিনা পয়সায়। মণিরুলের মধ্যে তার ঘরের মানুষটা জ্যান্ত হয়ে উঠুক এই তার বাসনা।
পুকুড়পাড়ে হেলে পড়া বাঁশের ছায়ায় মণিরুলের দেখা পেয়েছিল ওরা। মণিরুলের দেখা পাওয়া মানে পীরবাবার দেখা পাওয়া। চড়া গরমে বড়ো পুকুরের জলে গলা ডুবিয়ে পড়েছিল মণিরুল, ওর দুজন সাদা পোষাকের সাকরেদ দূর থেকে লক্ষ্য রাখছিল নিরাপত্তার দিকগুলো। গাঁয়ে এখন সাদা পোষাকের পুলিশ ঘুরছে মণিরুলকে ধরবার জন্য। সরকার ওর মাথার দাম রেখেছে পঁচিশ হাজার। হাইটেনশন লাইনের তার কেটে মণিরুল হইচই বাঁধিয়ে দিয়েছে জেলা-সদরে। দুকিলোমিটার তার কেটে নিয়ে যাওয়া মুখের কথা নয়। সঙ্গে একটা বিশাল মাপের ট্রান্সফরমার। এত মাল কোথায় সে চালান করে দিল পুলিশ তার টিকিও ধরতে পারল না। তবে পাশের জেলা মুর্শিদাবাদ-বর্ধমানে তার নিয়মিত ওঠা-বসা আছে। জেলা পেরিয়ে সীমান্তবর্তী জেলায় লুকিয়ে যাওয়া মনিরুলের কাছে এমন কোনো কঠিন কাজ নয়।
