মনে মনে দুঃখ পেয়েছে গুয়ারাম। দশ বছর আগেও মানুষ তাদের বিশ্বাস করত। লুলারামের কীর্তিকলাপ সেই বিশ্বাসের দেওয়ালে ফাটল ধরাল ধীরে ধীরে। রঘুনাথ সেই ফাটলের ভেতর লুকিয়ে থাকা একটা বিষধর সাপ। আজকের এই ভয়াবহ, শোচনীয় পরিস্থিতির জন্য গুয়ারাম ওদের দায়ী করে।
রেশন-দোকানীর পাঠাটা ফিরে এল তিন দিন পরে। একটা পাঠী ছাগলের সঙ্গে মুখে স্বজাতীয় কামধ্বনি তুলে পাঁঠাটা চলে গিয়েছিল তার প্রেমিকার বাড়ি। প্রেমিকার আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে তিন দিন সময় তার ঘোর কাটতে লেগেছিল।
পাঁঠাটা ফিরে আসার পর হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন জগতবাবু। কিন্তু গুয়ারামকে একবার জানানোর প্রয়োজন বোধ করেন নি তিনি। কেন খবর দেবেন? গরীবগুরবো ছোটলোকদের এত মাথায় তুলতে নেই। কুকুরকে লাই দিলে, মাথায় তুললে আঁচড়াতে আসে। মাথার চুল আর পায়ের লোমের ফারাক থাকা দরকার।
হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল গুয়ারামের তবু এসব কষ্ট যেন তার ভেতরের দুঃখটাকে শতগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই মাঝ বয়সে এমন বুনো মার শরীর যেন সইতে পারে না। থেতলে যাওয়া ঠোঁটটা চিনচিন করে জ্বলছে এখনও। হাত দিতেও ভয়। বাঁ চোখের কাছটায় ঝুলে আছে মাংস। টনটন করছে চোখের চারপাশ। মাথার রক্ত চুঁইয়ে পুরো মুখটাকে করে দিয়েছে বীভত্স। এক ঝলক কেউ দেখলেই আঁতকে উঠবে। গা গতরের ব্যথাটা নিয়ে জোরে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল গুয়ারামের। কিছুটা হেঁটে এসে সে পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে থমকে গেল। রঘুনাথ মাত্র দশ হাত দূরে। তার হাতে একটা রাঙচিতের ডাল, মাঝে মাঝে সেই সরু লিকলিকে ডালটা বাতাসে চিতেসাপের মতো হিলহিল করে নাড়ছে।
ভিকনাথ কিছুটা অবাক হয়ে বলল, গুয়াদা, পেঁড়িয়ে পড়লে যে–চলো।
-হ্যাঁ, যাবো রে ভাই। আড়মোড়া ভেঙে কেমন বিপন্ন চোখে তাকাল গুয়ারাম, বড় মেরেচে রে, হাঁটতে পারচি নে।
-জানি, সব জানি। দাঁতে দাঁত ঘষে তাকাল ভিকনাথ। তারপর উত্তেজনা চেপে রাখতে পেরে বলল, মনে দুখ লিয়ো না, সব আমাদের ফোপরা ভাগ্য গো। তবে মনে রেখো গুয়াদা, এক মাঘে শীত যাবে না। তুমার ছেলে রঘু এর বদলা নেবেই নেবে। ওর জিদ আমি জানি। মন করলে ও জলে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।
গুয়ারাম চুপ করে শুনল, তারপর যন্ত্রণা হজম করে বলল,ওর ওই জিদটাকেই তো আমি ভয় পাই। ছেলেটার যে কুথায় গতি হবে কে জানে। গায়ে থাকলে বাবুদের হাতে মার খেতে খেতে ওর জেবনটা শেষ হয়ে যাবে।
-অত মাগনা নয়। ভিকনাথ তীব্র প্রতিবাদ করল, যুগ বদলেচে গো। যুগ যে বদলেছে তা তো তুমি নিজের চোখে দেখলে। কপোবাবু নিজের মায়ের পেটের ভাইকেও ছেড়ে কথা বলল না। সত্যি মাইরি, অমন মানুষ আমি দেখিনি গো! ইবার পঞ্চাত ভোটে বাবুরে আমরা জেতাব।
গুয়ারামের ভিতর থেকে এবার কথার উজান ঠেলে উঠল, এক গাছে দু-রকম ফুল হয় কি করে বুঝে পাইনে! একজন হয়েচে অসুর, তো অন্যজন হয়েচে দেবতা। এত দুঃখের মাঝেও ভিকনাথ হালকা করে হাসল, এ তো ভবের লীলা গো! এর ব্যাখ্যা কি আমাদের ছোটমাথায় হবে?
পাটের ভুঁইয়ে লুলারামের সাথে সেই যে দেখা হয়েছিল ভিকনাথের তারপর থেকে তার আর টিকি দেখতে পায়নি ভিকনাথ। মনের দুঃখে গাঁ ছেড়েছে লুলারাম। ঝারি তার মাথাটা আরও খারাপ করে দিয়েছে। মেয়েমানুষের উপেক্ষা অনেকের বুকে তীরের মতো বেঁধে, অনেকে আবার সেই আঘাতকে ভাবে বিচুটির জ্বলন। ঘন্টাখানিক কুটকুটিয়ে সে জ্বলন থেমে যায়, আবার স্বাভাবিক হয়ে যায় জীবনযাপন। সবাই যা পারে লুলারাম তা পারেনি। মনে মনে সে দন্ধে দন্ধে মরেছে। অপমানে কালসিটে মেরে গিয়েছে তার মুখ। এ পোড়ার মুখ গ্রামসমাজে সে দেখাবে কী ভাবে? কেউ না জানলে অন্তর তো জানবে। বিবেক মিছে কথা বলে না। বিবেকের ঘা কোনো মলমে সারে না। বিশেষ করে ঝারির কাছে তার মুখ দেখানো দায়। এক সময়ের দুর্ধর্ষ ডাকাত সময়ের ফসে পড়ে সিঁদেল চোরের মতো দিন কাটাতে পারে না। এর চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভালো। লুলারাম আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়নি। রাতের আঁধারে সে গা ঢাকা দিয়ে পালিয়েছে। বিবেকের দংশন না জুড়ালে সে গাঁয়ে ফিরতে পারবে না। এ ঘটনায় ভিকনাথের মনে কোনো দুঃখ বা অনুশোচনা নেই। যেমন কর্ম করবে তেমন তো ফল পাবে। বরং তার পথের কাঁটা সরে গেল বিনা বাধায়। এ তো মেঘ না চাইতে জল পাওয়ার মতন।
ভিকনাথের নুয়ানো মনটা ডগা ধাপানো বাঁশ গাছের মতো হঠাৎ সিধা হয়ে গিয়েছে। মানসিক শান্তি দুনিয়ার সব চাইতে দামী টনিক। ঝারি এখন পোষা বেড়াল হয়ে তার সংসারে ঘোরাফেরা করে। ছেলে কোলে ঝারিকে মনে হয় গেরস্থঘরের তুলতুলে বউ। তার চোখেও সকালের নরম রোদের মতো গড়িয়ে নামে সুখ।
জানগুরুর পায়ের ধুলোয় কি যাদু ছিল ভিকনাথের সংসারের সব অসুখ ব্যাধি সেরে গেল। ঝারিকে এত সুখী, এত হাসিখুশি জীবনে সে দেখেনি। এখন আর ঝারিকে মনে হয় না সে দূর আকাশের তারা। ঝারি এখন বেড়ার উপর লতিয়ে যাওয়া চালকুমড়োর ফুল। সেই ফুলের ম-ম করা গন্ধ নেই, কিন্তু সৌন্দর্য আছে। তাকে ছোঁয়া যায়, নিজের করা যায়। সে ফুলের মালা হয় না, কিন্তু মালা গাঁথলে দোষ কোথায়?
ডিভিসির ছাড়া জলে যৌবন কইমাছের মতো ছড়ছড়িয়ে উঠছে বুড়িগাঙের। কোথা থেকে উড়ে এসেছে দুটো শামখোল পাখি, ওদের সাদা ডানায় জড়িয়ে আছে শ্রাবণের বুনো মেঘ। এ বছর বর্ষার ছিচকাঁদুনী স্বভাব বদলে গিয়ে অঝোর ধারায় ঢালছে। জগৎখালির গোড়ায় ঘোলা জল ক্ষুর নিয়ে প্রতিবার চেঁচে নিয়ে যাচ্ছে মাটি।
