-তার জন্য ওই মানুষটাকে কেন বেঁধে রেখেছো?
–ওকে আমার সন্দেহ হচ্ছে।
–কাউকে সন্দেহের জেরে ওভাবে বেঁধে রাখা যায় কি? কপোতাক্ষর কণ্ঠস্বর গুরুগম্ভীর মেঘের মতো শোনাল, স্বাধীন সভ্য দেশে তোমার এই বর্বর ব্যবহারের সাজা কি জানো?
-থাক আর জ্ঞান দিস না।
-জ্ঞান নয় দাদা, যা ঘটনা আমি তাই তোমাকে শোনাচ্ছি। নিজেকে বদলাও। তোমার এই বুর্জোয়া সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব ত্যাগ করো। না হলে সব হারাবে। দিকে দিকে মানুষ জাগছে। কপোতাক্ষর কথাগুলো বক্তৃতার মতো শোনাল।
-যা তো, মেলা ফ্যাচফ্যাচ করিস না। বিরক্তি আর চেপে রাখতে পারলেন না নীলাক্ষ, ঠেলে ওঠা গ্যাস অম্বলের মতো ছিটকে এল বাইরে, তোর মতন মানুষগুলো এসব ছোটলোকদের মাথায় উঠিয়েছে। তোদের জন্য এদের এত বাড়বাড়ন্ত। যা, নিজের কাজ কর। আমাকে বাধা দিস নে।
–ভালো চাও তো, ওর বাঁধন খুলে দাও।
–যদি না খুলি?
তাহলে আমি নিজে গিয়ে ওর বাঁধন খুলে দেব।
-তোর এত সাহস?
-এতে সাহসের কি দেখলে? যাকে তুমি সাহস বলছ–সেটা হল সত্য। কপোতাক্ষ থামলেন, তারপর তর্জনী তুলে বললেন, ওই দেখ, প্রতিবাদ কেমন তোমার মোটা দাড়িকে আঁকড়ে ধরেছে। পেয়াদা আর লেঠেল দিয়ে সব কাজ কি হয়? কিছু কাজ মগজ খাটিয়ে করতে হয়। তুমি আমার দাদা হও–সেই জন্য তোমাকে আমি অনুরোধ করছি, অন্য কেউ হলে আমি নিজে গিয়ে বাঁধন খুলে দিতাম। কেননা আমাদের লড়াইটা এই তোমাদের মতো গোঁড়া সামন্ততান্ত্রিক মানুষগুলোর বিরুদ্ধে। ওদের চোখে প্রতিবাদের ভাষা যতদিন না আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ছে–ততদিন আমাদের এই লড়াই থামবে না।
-যা তো, পাগলের মতো বকিস না।
–আমি পাগল নই, দাদা। আমি শুধু তোমাকে সতর্ক করছি। কপোতাক্ষ কিছু সময় গম্ভীর হয়ে গেলেন, তুমি রুদ্রর কথা ভাবো। সে তো তোমার ছেলে। তোমার ওই সোনার টুকরো ছেলে আজ তোমার বিরুদ্ধে, কেন? এসব কথা একবার ভাববে না? নিজের জেদ নিয়ে থাকা ভালো কিন্তু জেদের বশে অন্ধ হয়ে যাওয়া ভালো নয়। যাও দাদা, গুয়ারামকে ছেড়ে দাও। আর ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও।
ক্ষমা! ওর মতন ছোটলোকের কাছে ক্ষমা চাইব আমি? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? গরম তেলে জলের ছিটে পড়ার মতো চড়বড়িয়ে উঠলেন নীলা।
তোমার এত কিসের অহঙ্কার, দাদা? মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শেখো নাহলে শ্রদ্ধা হারাবে। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হল কপোতাক্ষর।
ধাওড়া পাড়া থেকে জগৎখালি বাঁধের মাটি কাঁপিয়ে পিলপিল করে ছুটে আসছে সশস্ত্র মানুষ। অস্ত্র হাতে মানুষগুলো যেন এক একটা যোদ্ধা। তাদের ক্রোধিত হুঙ্কার বাতাসকে ধর্ষিতা রমনীর চেয়েও অসহায় করে দেয়। চোখ কুঁকড়ে ওই স্রোতের দিকে অসহায় দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকেন নীলাক্ষ। তার দর্পের অট্টালিকার ফাটলটা সহজে দৃষ্টিগোচর হয়।
কপোতাক্ষর ভেতর থেকে আবেগটা ধূপের গন্ধ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল, দেখলে দাদা, মানুষ যে জাগছে–আর বুঝি তোমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। জাগরণের সময়, প্রভাতবেলায় কেউ ঘুমিয়ে থাকে না। শুধু তুমি ঘুমিয়ে আছে। তোমার এই স্বৈরাচারী মনোভাব পাড়ায় পাড়ায় দাঙ্গা লাগিয়ে দেবে। ওই দেখো দাঙ্গা আগুন ধেয়ে আসছে।
ভিকনাথ সাতগুণ উৎসাহ নিয়ে ছুটে গেল ভিড় ঠেলে। রঘুনাথকে সরিয়ে সে ব্যস্ত আর মরিয়া হাতে গিট খুলে দিল মোটা রশির। গুয়ারামের কষ আর মাথার রক্ত হাতের তালুতে জেবড়ে নিয়ে বলল, তুমার এই অক্তো জল হবেনি। তুমার ঘরের রঘু এর বদলা নিবে। কেঁদো না গুয়াদা, চোখ মুছছে। ঘর চলো। আমাদের পোকাড়ে ভাগ্য, সেই জন্যি তুমাকে এই বয়সে, এমনধারা মার খেতে হল!
.
৪৭.
মাজা ধাপিয়ে কুঁজো হয়ে হাঁটছিল গুয়ারাম। এই বয়সে এমন আঘাত সহ্য করার শারীরিক ক্ষমতা তার নেই। শরীর থরথর করে কাঁপছিল ভয়ে। বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়া ভয়টা পণ্ডিত বিলের পুরনো মাছের মতো শরীরের রক্তে, মাংস-কোষে ঘাপটি মেরে পড়ে আছে এখনও। একে সহজে কাবু করা যাবে না। বুকের কাছ থেকে একটা চিনচিনে শুলোনী উঠে কলজের কাছে এসে থেমে যাচ্ছে। বাবুর জোড়া পায়ের লাথিটা এই হাড়ের খাঁচায় লেগেছে, পাকাটির বেড়ার মতো মড়মড়িয়ে উঠেছে খাঁচাটা। আর একটু হলে ভেঙে যেত। যে কোনো যন্ত্রণার একটা নিজস্ব বেগ আছে। গুয়ারাম সেই যন্ত্রণাকে নিজের দেহে লুকিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছিল। বারবার করে ছোট ভাইয়ের কথা তার মনে পড়ছিল। লুলারাম এতদিন যা করেছে তা বুঝি ঠিক করেছে। রঘুনাথকে ভুল বোঝা তার উচিত হয়নি। সবাই যে যার মতো বাঁচে।
পেয়াদাগুলো ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় বলছিল, লুলারাম থাকলে তোকে আজ ধরতামনি। সে শালা কুথায় পেলুলো কে জানে। বড় চালাক মানুষ সে, পাঁকাল মাছের মতো কুথায় সিঁদিয়ে যায় শিবের বাপও টের পায় না। চুরি বিদ্যায় লুলারামের খ্যাতি এ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। গেরস্থরা তাকে দেখলে মনেমনে ভয় পায়। মুখ ফুটিয়ে কারোর কোনো কথা বলার ক্ষমতা নেই। লুলারামের সঙ্গে থানার যা দহরম-মহরম তা প্রত্যক্ষ করে অবাক হয়ে যায় গুয়ারাম।
রেশন-দোকানী জগতবাবুর পাঁঠাটা হারিয়ে গিয়েছিল কদিন আগে, পাঁঠার শোকে কাতর জগতবাবু বারবার আসতেন তাদের দোরে। বিমর্ষ মুখ ঝাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন আর হাঁ-করে দেখতেন গুয়ারামকে। কাকুতি-মিনতি করে বলতেন, গুয়ারে, তোরে আমি খুশ করে দেব। আমার পাঁঠাটা ঘুরোন দে। ওটা আমার জান রে। ওরে আমি রেশনের গম-চাল সব খাওয়াতাম। ওই অবলা জীবটা পোর পর থেকে আমার যত রমরমা। গুয়ারাম শত চেষ্টা করেও রেশন দোকানীকে বোঝাতে পারেনি যে পাঁঠাটা সে নেয়নি এমন কী এধার-ওধার ঘুরতেও দেখেনি। এত বলেও মানুষটার বিশ্বাস অর্জন করতে সমর্থ হয়নি সে।
