-কেউ না যাক, আমি যাব। ভিকনাথের গলার দুপাশের শিরা ফুলে উঠল, এ কি মগের মুলুক নাকি–যা খুশি তাই করবে? গুয়াদার মতো মানুষ হয় না। সে কুন দুঃখে পরের খাসি চুরি করতে যাবে? তার কি খাওয়া-পরার অভাব আছে?
অভিযোগ শুনে থ হয়ে গেল রঘুনাথ। বাঁধ ধরে ছুটতে লাগল সে। ধুলো উড়ল তার পায়ের চাপে। ঘাম নেমে এল শরীর চুঁইয়ে।
নিমতলায় ভিড় জমে গেছে শমানুষের। পাকমোড়া দিয়ে মোটা রশিতে গুয়ারামকে বেঁধে ফেলেছে নীলাক্ষবাবুর পেয়াদা। মুখ কাতর করে যীশুখ্রিস্টের মতো দাঁড়িয়ে আছে গুয়ারাম। বিড়বিড় করে সে যেন কিছু বলতে চাইলে লাঠির বাড়ি মেরে তাকে থামিয়ে দিল পেয়াদা, বল, বাবুর খাসি কুথায় রেখেছিস বল?
–আমি কিছু জানি নে বাবু।
-জানিস নে? শালা হারামীর বাচ্চা। এবার লাঠির আঘাতটা তার মাথা ফাটিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের করে ছাড়ল।
কঁকিয়ে উঠল গুয়ারাম, আর মেরো নি গো। মরে যাবো
-মর। ছুটে গিয়ে জোড়া পায়ের লাথি মারলেন নীলাক্ষবাবু। হাঁপাতে হাঁপাতে শুধালেন, আমার সখের খাসিটা কোথায় বেচেছিস বল? নাহলে আজ মেরে-মেরে তোকে কিমা বানিয়ে ছাড়ব।
রাগে ফুঁসছিলেন নীলাক্ষবাবু। গ্রাম ভেঙে মানুষের ঢল নেমেছে গুয়ারামকে দেখার জন্য। ভিড়ের মধ্যে নানা মন্তব্য কান ঝালাপালা করে দিল রঘুনাথের। বড়ো অসহায় দেখাচ্ছিল তাকে। এভাবে তার বাবাকে যে কেউ মারতে পারে এটা তার স্বপ্নে ছিল না। হাতের মুঠি পাকিয়ে ভেতরে ভেতরে সছিল সে। জ্যান্ত সাপের ছাল ছাড়িয়ে নেওয়ার কষ্ট হচ্ছিল তার। বিষ আছে অথচ ঢালতে পারছে না সে। এক অসহ্য যন্ত্রণায় আঙুল কামড়াচ্ছিল রঘুনাথ। শরীরের রক্ত ফুটে উঠছিল টগবগিয়ে। সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ওরা গুয়ারামকে মারছে। এর পিছনে কোনো যুক্তি নেই, প্রমাণ নেই। অনুমানের শিকার হয়ে একটা মানুষকে এভাবে শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া কি উচিত হচ্ছে বাবুদের? দাঁতে দাঁত ঘষে রঘুনাথ উপায় খুঁজছিল বাবাকে বাঁচাবার।
তামাশা দেখার ভিড়টা বাড়ছিল বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। এলোমেলো হাওয়ায় উড়ছিল ধূলিকণা। ধুতি-পাঞ্জাবি পরে শংকর মাছের চাবুক হাতে দাঁড়িয়েছিলেন নীলাক্ষবাবু। তার শরীরে যে অত্যাচারিতের রক্ত প্রবাহিত এবং তা বুনো হাতির জেদের চেয়ে মারাত্মক সেই সুপষ্ট আভা পরিলক্ষিত হচ্ছিল তার হাবভাবে। মাঝে মাঝে তিনি হুঙ্কার দিয়ে উঠছিলেন, মার হারামীটাকে মেরে শেষ করে ফেল। তারপর যা হয় আমি তা সামলাব।
তার কথাগুলো যজ্ঞের জ্বলন্ত কাঠে ঘি ঢালার চেয়েও অগ্নি উৎপন্নকারী। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে গুয়ারাম কেঁদে উঠল বাতাস কাঁপিয়ে, ছেড়ে দাও গো, আর মেরো না। আমি কুনো দোষ করিনি গোর ছেড়ে দাও গো, তুমাদের পায়ে ধরি।
তার আর্তি, আবেদন শোনার মতো মানুষ জামতলায় কেউ ছিল না। শুধু রঘুনাথ ফুঁসছিল। ভিকনাথ পাশে দাঁড়িয়ে চাপা রাগে ফুঁসে উঠে বলল, ওদের ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে না রঘু। যা করার কিছু কর। ওরা যে তুর বাপকে মেরে ফেলবে।
ভিকনাথের কথায় তীব্র ভূমিকম্পের প্রকোপে কেঁপে ওঠা কাচের ইমারতের মতো কেঁপে উঠল রঘুনাথ, হাতের পেশি ফুলিয়ে ছুটে গিয়ে সে তার বাপকে বুক দিয়ে আগলে দাঁড়াল। খবরদার কেউ এর গায়ে আর এট্টা ঘাও দেবা না। দিলে ভালো হবেনি বলে দিচ্ছি। আমার বাপ চোর নয়। আমরা কেউ চোর নই। রঘুনাথের কথার তেজে বাতাস বারুদে ভরে উঠল। আচমকা ঢেউ আর গুঞ্জন উঠল সমবেত ভিড়ে।
নীলাক্ষবাবু ধুতির কোঁচা ফুলিয়ে এগিয়ে এলেন রঘুর কাছে, ঝাঁঝাল সুরে মুখ তুলে বললেন, তোর সাহস তো কম নয়। আমার এলাকায় এসে আমাকেই শাসানো। সর, সরে যা বলছি।
সরব না। রঘুনাথ বুড়ো আঙুলে পা আঁকড়ে নিজেকে বটগাছের চেয়েও দৃঢ়ভাবে দাঁড় করাল।
নীলাক্ষবাবুর নির্দেশে দু-জন পেয়াদা এগিয়ে গিয়ে রঘুনাথের হাত চেপে ধরল প্রাণপণে। রঘুনাথও অনড়, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ঝড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভূমিলগ্ন বটগাছ সে, তাকে উপড়ে ফেলা কার সাধ্যি! ততক্ষণে ভিকনাথ এসে ওদের মাঝখানে দাঁড়াল। গর্জন করে বলল, কাজটা ভালো হচ্ছে না, বাবু। আমরা গরীবগুবরো মানুষ মানচি কিন্তু আমরা চোর নই। গুয়াদা যে খাসি চুরি করেছে তার কুনো প্রমাণ আচে? প্রমাণ ছাড়া কাউকে কি সাজা দেওয়া যায়? আমরা ধাওড়াপাড়ার মানুষরা বাবুসমাজের একচোখি রায় মানব না।
ভিকনাথের চেঁচিয়ে বলা কথাগুলোয় আগুনের ঢেলা ছিল যা আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ভাসিয়ে দিল আগুনের হলকা। ভিড় আবার পিঠে ছ্যাঁকা খাওয়া অসাড় সাপের মতো নড়ে উঠল, সত্যিই তো সাক্ষী প্রমাণ ছাড়া একটা মানুষকে এভাবে পশুর মতো জঘন্যভাবে মারা যায় না। নীলাক্ষবাবু যা করছেন, সেটা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। সভ্য সমাজ তার এই কর্মকে কখনও সমর্থন করবে না। স্পষ্টত দুটি মত মাথা চাড়া দিয়ে উঠল সেই সময়। ভিড় দেখে জামতলায় সাইকেল নিয়ে হাজির হলেন কপোতাক্ষ। কোন একটি গ্রামে মিটিং সেরে ফিরছিলেন তিনি। তাঁকে দেখে বিরক্ত নীলাক্ষ কপাল কুঁচকে এগিয়ে গেলেন সামনে, তুই এখানে দাঁড়ালি যে, বাড়ি যা।
কি হয়েছে দাদা?
–কি হয়নি বল? নীলাক্ষ উত্তেজনায় কি ভাবে শুরু করবেন কথা হাতড়ালেন, আমার বড়ো খাসিটাকে কাল থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। ধাওড়াপাড়ার ধারের মাঠটাতে চড়ছিল। সন্ধেবেলায় ঘর আসেনি।
