তিনদিন হল গা ছেড়েছে লুলারাম। তার গা ছাড়ার কারণ এখনও কেউ জানতে পারেনি। নূপুর কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসেছিল ঝারির কাছে। সব শুনে মুখে কুলুপ এঁটেছিল ঝারি। নূপুর কান্নাকাটি করতেই ঝারি তাকে বুঝিয়ে বলল, মা শীতলাবুড়িকে মন দিয়ে ডাক। তুর বাবা ঠিক ফিরে আসবে। সে মানুষ হারাবার নয়। যে মানুষটা সবাইকে হারিয়ে দেয় সে কেন লোকের কাচে হারবে?
–গাঁয়ে তার শত্রু কম নেই। বুঝিয়ে বলেছিল নূপুর। ঝারি কিছুটা নিষ্ঠুর হয়ে বলেছিল, আগুন খেলে অঙ্গার তো হাগতে হবেই। তবে তুর বাপের কথা আলাদা। গত পাঁচ মাসে সে এদিকপানে একবারও আসেনি।
কথা না বাড়িয়ে নূপুর ফিরে গিয়েছিল ঘরে। নিজের বাপকে সে ভালো চেনে। মানুষটা তড়বড়ে লাট্টুর মতন, এক জায়গায় স্থিতু হতে জানে না।
রঘুনাথ ভরসা জুগিয়ে বলল, ভাবিস নে বুন, সে ঠিক ফিরে আসবে। তার মতন চালাক চতুর মানুষ এ গাঁয়ে আর কটা আচে।
তবু মন সুস্থির করতে পারে নি নূপুর। বাপ চলে গেলে তার চারধার আঁধার। মুনিরাম থেকেও না থাকার মতো। তার কথা এখন কেউ শোনে না। মোলকও ঝিম ধরে আছে খবরটা শোনার পর থেকে। এমনিতে সে কম কথার মেয়ে। খবরটা শুনে আরও গম্ভীর হয়ে গিয়েছে সে। কিছু ভালো লাগছে না তার।
চুরি বিদ্যে পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছে রঘুনাথ। ওপথে হেঁটে কোনো শান্তি নেই উল্টে থানা এসে ঢুকে যায় ঘরের ভেতর। রঘুনাথ মাচায় বসে পা দোলাতে দোলাতে তার প্রথম চুরির কথাগুলো ভাবছিল। দীনু খোঁড়ার দোকানের তালা ভেঙে আঁধারে দাঁড়িয়ে সে চুরি করবে কি, থরথরিয়ে কাঁপছিল। দীনু খোঁড়ার উপর তার প্রথম থেকে রাগ। বরাবরই ওজনে কম দিত সে। দাড়িপাল্লার একদিকে চুম্বক আটকে রাখত সে। কেজিতে শ দুশ গ্রাম কম দিতে তার হাত কাঁপত না। নীলাক্ষ কতবার ধরেছেন তাকে। তবু দীনু খোঁড়ার কোনো লজ্জা শরমের বালাই ছিল না। তোক ঠকিয়ে তার খুব বড়োলোক হওয়ার ইচ্ছে। সেই ইচ্ছের গুড়ে বালি ছিটিয়ে দেবে রঘুনাথ। লজেন্সের দাম বেশি নেওয়ার হিসাব বুঝে নেবে সে। ভগবান তাকে শাস্তি দিয়েছে, তাতে তার মন ভরেনি, শিক্ষা হয়নি। পিঁপড়ের পেছন টিপে খাওয়া মানুষকে উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার। পেতলের ডাবর ভর্তি খুচরো পয়সাগুলো তাকে প্রলুব্ধ করে। ডাবর সমেত খুচরো পয়সাগুলো নিজের ভেবে চটের থলিতে পুরে নেয় রঘুনাথ। এত পয়সা, নির্ঘাৎ দুশ টাকার উপরে হবে। এ বাজারে দুশ টাকার অনেক দাম। রঘুনাথের চোখ চকচকিয়ে ওঠে। পা দিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে সে একদলা মিছরি মুখের ভেতর পুরে নেয়। কুড়মুড় করে চেবায়। পরের ধনকে নিজের ভাবার অনুভূতিতে চনমনিয়ে ওঠে মন। ডাল, গুড়, সাবু, মিছরি, মশলাপাতিতে থলি ভরে নিঃসাড় পায়ে বেরিয়ে আসে দোকান থেকে। আগু পিছু দেখে। অন্ধকার ছাড়া কেউ নেই। অন্ধকার ছুঁয়ে বোঝার চেষ্টা করে রাত কটা। বড়ো জোর দশটা এগারটা। এর মধ্যে ঘুমে অসাড় গ্রামখানা। গাছপালার সব মুছিত দশা।
এই থলি নিয়ে রঘুনাথ কোনোদিন ঘরে ফিরতে পারবে না। দুর্গামণির হাজার প্রশ্নে কেঁচো হয়ে যাবে সে, কথা বলার ইচ্ছেটাই ফুরিয়ে যাবে চোখের পলকে। দুর্গামণিকে বোঝাবার ক্ষমতা তার আর কোনোদিন হবে না।
চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা। ধরা পড়লে পিঠ হতে হবে কাছিমের খোল। মাটির সরা হলে পিঠ ফাটবে, ঝরবে রক্ত। বদনাম বদবু হয়ে ছুটবে চারধারে। রঘুনাথ এসব আর চায় na। সে চায় দুর্গামণির মুখে হাসি ফুটুক। আগের সেই প্রাণোচ্ছল হাবভাব ফিরে আসুক। মাকে সে আর দুঃখ দিতে চায় না। মাকে দুঃখ দেওয়ার আগে না খেয়ে শুকিয়ে মরা ঢের ভালো।
হাড়মটমটির ঝোপে ভর্তি থলিটা লুকিয়ে রেখে ঘরে ফিরে গিয়েছিল রঘুনাথ। দুর্গামণি তখনও ভাত নিয়ে বসে আছে। ওর চোখের কোণে কালি, দুঃশ্চিন্তা। কতদিন হাসেনি সে। একদিন আক্ষেপ করে বলল, রঘুরে, তুর জন্যি আমাদের মরণ হবে। আর কাদাসনে বাপ। নিজেরে সামলা।
নিজেকে সামলায়নি শুধু, পুরোপুরি বদলে ফেলেছে নিজেকে রঘুনাথ। হাবুল চোর এসেছিল তাকে কুলবেড়িয়ায় নিয়ে যাবে বলে। রঘুনাথ শরীরের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে গেছে।
হাবুল চোর তার মনোভাব বুঝতে পেরে বলেছে, তোরে বিবেকের সাপটা দংশাচ্ছে। মনে রাখিস, ও সাপের বিষ নেই। যার বিষ নেই, তার অমৃতও নেই। দুদিন পরে ঠোকা খেয়ে সেই আমার কাছে তোকে আসতে হবে। কথাটা মনে রাখিস।
হাবুল চোর চলে যাওয়ার পরেও রঘুনাথের কোনো আফসোস হয়নি। ওর সাপের গল্পটা তার বিশ্বাস হয়নি। মন যা বলে তা না করাই ভালো, বিবেক যা বলে সেটাই তো আসল আলোর পথ। সে কেন আলোর পথে হাঁটবে না? মনটাকে লোহার শিকের চাইতে শক্ত করল রঘুনাথ।
তখনই হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এল ভিকনাথ, কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, তুর বাপরে নীলাক্ষবাবুর পেয়াদা এসে ধরে গিয়ে গিয়েছে। খপখপ চল, নাহলে তুর বাপকে ওরা মেরে ফেলবে।
কথাগুলো শুনে সারা শরীর কেঁপে উঠল রঘুনাথের। শুধু ভয় নয়, এক অন্যধরনের উত্তেজনায় টনটনিয়ে উঠল তার শিরা-উপশিরা। টান ধরল স্নায়ুতন্ত্রে। কমুহূর্ত বাকরুদ্ধ চোখে তাকাল সে।
ভিকনাথ তাড়া দিল তাকে, চল, আর দেরি করা যাবে না। আমি যাই–পাড়ার সবাইকে খপর দিয়ে আসি।
রঘুনাথের ঠোঁট বেঁকে উঠল, খপর দিয়ে কুনো কাজ হবে না। ওঁরা ইঁদুরের চেয়েও ডরপুক।
