–অন্য পথ দেখো। ঝারি মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
–তুমি আমার ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো। লুলারাম জোর করে হাসে, আজ সাঁঝবেলায় পাটের খেতে এসোক্ষণ।
-আমি আর তুমার কথা শুনব না।
-না শুনলে চলবে না। গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নিলে চলবে? ধীরে ধীরে তেতে উঠছিল লুলারাম।
ঝারি ততোধিক শান্ত হয়ে বলল, এই শরীল নিয়ে আমি পাটের ভূঁইয়ে যেতে পারব নি, জানগুরু
-ও শালারে আমি খুন করব। তুমি যদি না আসো কাল শুনবা জানগুরুর কেউ টুঁটি কেটে দিয়েচে। লুলারাম চিবিয়ে চিবিয়ে হাসল।
ভয় পেয়ে মুখটা মলিন হয়ে গেল ঝারির, খবরদার ও কাজ করো না। ওই মানুষটা না থাকলি পরে আজ আমি কুথায় তলিয়ে যেতাম। তুমরাই সবাই মিলে আমাকে মেরে ফেলতে।
এ তুমার মন গড়া কথা। লুলারাম চোখে চোখে হেসে উঠল, কেউ কারোর জন্যি বাঁচে না। যে যার আয়ুর জোরে বাঁচে। তুমাকে আমি অসময়ে দেখেচি। ঘর-সনসার ফেলে তুমাকে দেখেচি। আমার অসময়ে তুমি আমাকে দেখবা না?
–আমি পোয়াতি।
-সারা গাঁ চষে বেড়াচ্ছে, শুধু পাটভুঁইয়ে গেলে দোষ? লুলারাম লোভী চোখে তাকাল, আমার সোনার হার ছড়া খুলে দাও। আমার হার পরে পরের মন ভরাবে তা হয় না।
গলায় হাত দিয়ে সোনার হার ছড়াটার ছোঁয়া পেল না ঝারি, আফসোসের সঙ্গে বলল, তুমার জিনিস আমি তুমায় ঘুরোণ দেব। ঠিক আছে পাটভুঁইয়ে এসো। ঘর থেকে নিয়ে তোমায় দিয়ে দেব।
-সেই ভালো। লুলারাম আর দাঁড়াল না।
হালকা হবার নাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ঝারি। দূর থেকে ভিকনাথ তাকে দেখতে পেলে। মনে সন্দেহ খরানীকালের কাতলামাছের মতো ঘাই দিয়ে ওঠে। পাকা বাঁশের লাঠি নিয়ে ঘর থেকে সে বেরিয়ে যায়। আজ এসপার ওসপার করে ছাড়বে। রোজ রোজ ডালভাত আর ভালো লাগে না।
ঝারি এগিয়ে গিয়ে আবছা আঁধারে আলের উপর দাঁড়াল। লুলারাম আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিল।ঝারির হাত ধরে সে পাটখেতের দিকে টেনে নিয়ে যেতে গেলেঝারি তাকে বাধা দিল–থামো। হাত ছেড়ে দাও। তুমাকে বলেচি না আমি পোয়াতি।
-তুমার কুনো ক্ষতি হবে না।
হাত ছাড়ো বলছি। ঝারি রাগে অপমানে ফুঁসে উঠল, তুমার চোখে কি মানুষের চামড়া নেই? এই নাও তুমার হারছড়া। এবার আমাকে ছাড়ো। আমাকে যেতে দাও। সোনার হারটা মুখে পুরে লুলারাম বলল, সেই বিকেল থিকে দেঁড়িয়ে আছি, এখুন চলে গেলে হবে?
তুমার সে গুড়ে বালি। কোমর দুলিয়ে ঝারি ফিরে যেতে চাইলে লুলারাম তার খড়খড়ে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল ঝারির কোমর। বুকের কাছে টেনে এনে লেপটে নিতে চাইল শরীরে। ঝারি নুন দেওয়া জোঁকের ঢঙে নড়ে উঠল শরীরে মোচড় দিয়ে, তুমি এই সাঁঝবেলায় মদ গিলেচ?
পুরুষ মানুষ মদ খাবে নাকি দুধ খাবে? লুলারাম ক্রমশ সাহসী হয়ে উঠছিল। ঝারি দুহাত দিয়ে ঠেলে দিল তাকে। টাল সামলাতে না পেরে আলের উপর হুমড়ে পড়ল লুলারাম।
কাছিমের মতো চোখ পিটপিটিয়ে লুলারাম এক বিচিত্র ভঙ্গিতে বলল, মাগী, আমাকে ফেলে দিলি? দাঁড়া দেখাচ্চি তুর মজা! লাথ মেরে তুর পেট ধসিয়ে দেব। ভার হয়ে যাওয়া গতর নিয়ে ঝারি দেীড়াচ্ছিল বুড়িগাঙের দিকে। ওখানে পৌঁছাতে পারলে তার বিপদ কেটে যাবে। অন্তত চেঁচিয়ে ডাকলে বাঁধ থেকে যে কেউ শুনতে পাবে তার ডাক। ঝারি টলমল পায়ে ছুটছিল। তার পেছন পেছন গ্যাড়া মোষের মতো ছুটছিল কামে থরথর লুলারাম।
পুরুষের কাছে নারী অনেক সময় অসহায়। লুলারাম লালসার হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল ঝারির আঁচল। হ্যাঁচকা টান দিয়ে পড়পড় করে খুলে ফেলল তার শাড়ি। শায়া নেই, ব্লাউজ নেই। আঁধারে ঝারি মা কালী। ওর খণ্ডিত শরীরের একখণ্ড অঞ্চল জুড়ে আলোর চাষআবাদ। সেই আলোর উৎসকে সমূলে উৎখাত করতে মরিয়া লুলারাম তার দানবীয় হাত দুটোকে সাঁড়াশি বানিয়ে ঝারির কণ্ঠনালীর কাছাকাছি নিয়ে গেল। ঝারি মাগো! আর্তনাদ করে দুহাত পেটে চেপে বসে পড়ল মাটিতে। দুই হাঁটুতে ঠোকা খেল তার নিম্নাভিমুখী মাতৃত্বের আধার। অন্ধকারে চিৎকার করে কেঁপে উঠল সে।
ভিকনাথ আর ধৈর্য ধরতে পারল না। লাঠি উর্ধ্বে তুলে সজোরে কষিয়ে দিল লুলারামের মাথায়, ঘরে কি তুর মা-বুন নেই, ছাগল কুথাকার?
অন্ধকারে ভিকনাথের গলাটা চিনতে পারে লুলারাম। নিজেকে সামলে নেবার আগে আর একটি বেদম আঘাত তাকে থেতলে দেয়, মাটি নেওয়ার আগে সে শুনতে পায় ভিকনাথ গলার রগ ফুলিয়ে বলছে, এখুনো সময় আছে পালা, নাহলে মরবি। বাপ হবার আগে আমি খুনী হলে কুনো পাপ লাগবে না।
লুলারাম অন্ধকার ফুঁড়ে হাপড়ে সাপড়ে ছুটছে। তার পায়ের শব্দে রাতের পাখি সচকিত হয়। ঝারিকে বুকে টেনে নেয় ভিকনাথ, কেঁদো না চোখের জল মুছে নাও।
হাত বাড়িয়ে শাড়িটা টেনে নিয়ে গায়ে চাপা দেয় ঝারি। শীত শীত ভাবটা উড়ে এসে তার শরীর দখল নেয়। শরীর ঘিরে বাড়তে থাকে ভয়। ভয়ের আয়ু কম। তবু অজানা এক ভয় কাবু করে দেয় ঝারিকে। ফুঁপিয়ে উঠে সে বলে, ওরে আমি বিশ্বেস করি নে। সুযোগ পেলে ও আমার পেটেরটাকে খতম করে দিবে।
–অত সস্তা নয়। ভিকনাথ ঝারিকে ঝাঁকুনি দিল, চুপ করো। ঘর চলো। আলের উপর মা লক্ষ্মীর মতো ধীরে ধীরে পদচিহ্ন এঁকে ঘরের পথ ধরে ঝারি। অন্ধকার তার পিছু ছাড়ে না আলোর প্রার্থনায়।
.
বুড়িগাঙের জলে রোদ পড়লে আকাশের সহস্র তারা বুঝি ঝিলিক দিয়ে ওঠে জলের শরীরের বৈভব দেখিয়ে। মন ভালো না লাগলে পাকুড়তলায় মাচায় চুপচাপ পা ঝুলিয়ে বসে থাকে রঘুনাথ।
