সূর্যাক্ষ কি শাপমুক্ত করতে তার জীবনে উদয় হয়েছে? রঘুনাথের সংশয় তখনও কাটে না। সে ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে আছে মীনাক্ষীর মুখের দিকে। এমন সুন্দর মেয়েমানুষ সে কালীগঞ্জে কালীপুজোর সময় দেখেছে। সচরাচর এরা ঘরের বাইরে আসে না, উৎসব পার্বণের কথা আলাদা।
মীনাক্ষী রঘুকে বললেন, তুমি বসো। আমি তোমাদের জন্য জলখাবার করে আনি। রঘুর খিদে পাচ্ছিল তবু সে মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, জলখাবারের দরকার হবে নি। রাতে আমি ভিজে ভাত খাই। মা আলু মাখা দেয়। আলু মাখা আর পেঁয়াজ দিয়ে ভিজে ভাত খেতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। ভিজে ভাতে খিদে মরে।
মীনাক্ষীর ঠোঁটে রঘুর সরলতার সমর্থনে হাসি ফুটল, আজ আর ভিজে ভাত খেতে হবে না, আজ গরম ভাত খেও। আমি তোমাদের জন্য ভাত রেঁধেছি। পুকুরে জাল ফেলা হয়েছিল। পুকুরের রুই মাছের ঝোল রেঁধেছি।
রঘুর জিভে জল এলেও নিজেকে সংযত করল সে। ভালো খাওয়া তার কপালে জোটে কোথায়? বাবুদের ঘরে মোহৎসব থাকলে সেদিনটা ভোজ খাওয়ার দিন। শালপাতায় ভাত, কুমড়োর ঘন্ট আর ডাল খেতে কী যে আনন্দ। টমাটোর চাটনি যদি তার সঙ্গে হয় তাহলে তো আর কথা নেই। রাত্রিকালে মহোৎসব খেতে গেলে টায়ার ধরিয়ে নেয় রঘু, পুরনো টায়ার পোড়ে চড়বড়িয়ে, হালকা লালচে আলোয় পথ দেখতে কোনো অসুবিধা হয় না। সেই খুশির দিন বুঝি সূর্যাক্ষ তাকে ফিরিয়ে দিল। রঘুর চোখ করকরিয়ে ওঠে দুর্বলতায়, তার সামাজিক অবস্থানের কথা বিচার-বিবেচনা করে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। নিজেকে তখন আর ছোট মনে হয় না, মনে হয় সেও এই এলাকার একজন, তারও বেঁচে থাকার অধিকার আছে সবার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে। ফলে আর গুটিয়ে থাকা নয়, এবার থেকে তার নিজেকে মেলে ধরার সময়।
খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকতে রাত্রি হল। রঘুনাথের জীবনে এই প্রথম এত ভালো ভালো খাবার খাওয়া। খাওয়ার সময় দুর্গামণির কথা তার খুব মনে পড়ছিল। বার দুই বেদম কাশিতে কাহিল হয়ে পড়েছিল তার মা, শেষে কালীগঞ্জ হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে সে ভালো হল। হাসপাতালের বড়ো ডাক্তার বলেছিলেন, যা খাবে পেট ভরে খেতে হবে। দিনভর মাঠেঘাটে খাটতে গেলে খাওয়ার দরকার। বুকের রোগ ধরে গেলে তখন আর বাঁচানো যাবে না।
বুকের রোগ মানে যক্ষ্মা। আতঙ্কিত গুয়ারাম সেদিন গালে হাত দিয়ে বসেছিল। দুর্গামণির কিছু হয়ে গেলে সে-ও পঙ্গু। এ সংসার টানবে কে। আর এই বয়সে ফের ঘরের চালে চড়ে বিয়ের নাটক করা যাবে না। সেদিন থেকে দুর্গামণির মাঠে খাটতে যাওয়া বারণ। এমন কী নেশার জিনিস সে কু নজরে দেখবে, সাধ হলেও ছুঁয়েও দেখবে না।
ভালো-মন্দ খাওয়ার সময় রঘুনাথের হাত আর মুখের কাছে উঠতে চায় না। যেন শিরায় খিঁচ ধরেছে হঠাৎ এমনভাব। মনটা কোথায় যেন উড়ে পালায়, কিছুতেই আর স্বাভাবিক হতে চায় না।
মীনাক্ষী বলেন, খেয়ে নাও, কী ভাবছো?
-না, কিছু না। রঘুনাথ নিজেকে আড়াল করে নিজের গভীরে। শামুক লুকানো বিদ্যা সে বুঝি শিখে ফেলেছে।
সূর্যাক্ষ তার অস্থিরতা অনুমান করে নিজেই কেমন অস্থির হয়ে উঠল, কী ব্যাপার রঘু, খাচ্ছিস যে! মা’র রান্না বুঝি ভালো হয়নি? সংকোচে রঘুনাথ যেন মাটিতে মিশে যেতে চায়, না, না, তা নয়।
–তাহলে কি?
–মার কথা খুব মনে পড়ছে। মা তো এত ভালো খাবার কুনোদিন খায়নি। রঘুনাথ ছুঁয়ে দেওয়া লাজবন্তী লতার মতো কুঁকড়ে গেল।
–তুই খেয়ে নে। কাল যাওয়ার সময় মাসীমার জন্য পাঠিয়ে দেব। সূর্যাক্ষ ওর মায়ের দিকে তাকাল। মীনাক্ষী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, তুমি কিছু ভেব না বাবা। আমার মাথায় থাকবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। ঘন করে কলাই ডাল মীনাক্ষী রেঁধেছেন নারকেল কোরা দিয়ে। এক হাতা ডাল রঘুনাথের পাতে দিয়ে তিনি বাইরের দিকে তাকালেন, কী আশ্চর্য, এখনও মানুষটা ঘরে ফিরল না!
-বাবা কোথায় গিয়েছে মা? সূর্যাক্ষও অবাক।
মীনাক্ষী গুরুত্ব না দিয়ে বললেন, তোর বাবা কোথায় যায় আমাকে কি বলে যায়? আমাকে বলে যাওয়ার তার সময় কোথায়? দেশোদ্ধারের কাজ করতে গিয়ে ঘরটাকে ভুলতে বসেছে। আমার আর ভালো লাগে না হাঁপিয়ে উঠেছি। সূর্যাক্ষ কার পক্ষ নিয়ে কথা বলবে ভেবে পেল না। এ সময় চুপচাপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলার ঘরে উঠে এল ওরা। আগে থেকে বিছানা পাতাই ছিল। কী সুন্দর ফুলছাপা একটা চাদর ঘরটায়। চেহারাই বদলে দিয়েছে জ্যোৎস্না রাতের মতো। কোথায় একটা পেঁচা ক্রাঁও ক্রাঁও শব্দে ডেকে উঠল। তারপরে চুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল শুকনো বাঁশপাতার উপর। পাশের বাঁশবাগান থেকে ইঁদুর আর কালপেঁচার ঝটপটানির শব্দ এল! শিরদাঁড়া টান টান করে খাটের একপাশে বসে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকল রঘুনাথ। পেঁচা ধাওড়া পাড়াতেও আছে, এখানকার পেঁচাগুলো বুঝি বেশি হিংস্র।
সূর্যাক্ষ নীরবতা ভঙ্গ করল, পান খাবি?
পান আমার ভালো লাগে না। রঘুনাথ ঘাড় নাড়ল।
–তাহলে মৌরি?
–ওসব আমার অভ্যেস নেই। রঘুনাথ উসখুশিয়ে উঠল।
সূর্যাক্ষ দুম করে বলে বসল, তাহলে কী খাবি? আমি তো খাওয়ার পরে একটা নাম্বার টেন সিগারেট খাই। না খেলে আমার ঘুম পেয়ে যায়। পরীক্ষা থাকলে দু-চারটে তো খেতেই হয়, নাহলে পাশ করতে পারব না যে।
