গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল রঘুনাথ। ক্লান্তিতে নুয়ে আসছে শরীর। তবু কষ্ট করে বেশ কয়েক কদম হেঁটে এল সে। চ্যাটচেটে পরিবেশে কাঁচা মদের ঘ্রাণ ভালো লাগে তার। গন্ধটা গাঢ় কুয়াশার মতো জড়িয়ে যাচ্ছে গায়ে।
পরপর তিন গেলাস খেয়ে ঢেকুর তুলে হরনাথের দিকে তাকাল রঘুনাথ, আর এট্টু দাও। নেশাটা জমচে না।
–আর খাস নে, মরে যাবি। যা, এবার ঘর যা। হরনাথ রঘুনাথকে বোঝাতে চাইলে গলা ফাড়িয়ে হেসে উঠল সে, আমাকে বোঝাতে এসো না গো। সকাল থিকে অনেক বুঝেচি। মাথা আর নিতে পারছে না। জোর করে বোঝাতে গেলে মাথা ফেটে ঘিলু বেরিয়ে যাবে-বুঝলে?
হরনাথ বুঝল নেশাটা গাঢ় হয়েছে রঘুনাথের। হাঁটা-চলার ক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে সে। একসময় সাট পাট হয়ে সে শুয়ে পড়ল বালির বিছানায়। তাকে আর সহজে ওঠাতে পারল না হরনাথ।
ভোরের দিকে হাবুল চোরের ঠেলা খেয়ে ঘুম ভাঙল রঘুনাথের। জড়ানো স্বরে শুধোল, কে, কে তুমি?
–চিনতে পারছিস নে ব্যাটা? আমি তোর…
-ও বুঝেচি, বুঝেচি। রঘুনাথ বালিতে ভর দিয়ে উঠে বসল। চোখ রগড়ে নিয়ে বলল, গুরু দক্ষিণা এভাবে কেনে নিলে ওস্তাদ? তুমাকে কতো করে মানা করলাম আমি যাবো নি, তবু তুমি আমার কথা শুনলে নি। ভালোবাসা অভিশাপ দেয় গো, সে অভিশাপ বড়ো মারাত্মক।
-ঘর চল। আমি তোরে ঘরে দিয়ে আসি।
-না। ওটি করো না। তাহলে আমার আঃ-ও যাবে, ফু-ও যাবে। রঘুনাথের স্বরে ব্যাকুলতা ঝরে পড়ল। হাবুল চোর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, পুলিশে ছুঁলে বাঘের চেয়েও বিষ বেশি হয়। মাস কয়েক সমঝে চল। তারপর তোকে আমি সময় মতো ডেকে নেব।
-তুমার ডাকে আমি আর যাব না। তুমি হলে গিয়ে মরণফাঁদ।
কাকে কি বলছিস? হাবুল চোর রঘুনাথের দুকাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে দিল, তোর নেশা এখনো কাটেনি। নেশা কাটলে পেছন থাবড়াবি বলে দিচ্ছি।
–আর জ্ঞান দিও না, ঢের হয়েছে। রঘুনাথ জ্বলে উঠল, তুমার জন্যি আমার সব গেল! মা ছিল,মা-ও পর হয়ে গেল!
দূর বোকা, মা কুনোদিন পর হয় রে?
-হয় গো হয়। নাহলে আমার ঘরে গিয়ে দেখে আসো। রঘুনাথ ডুকরে উঠল, দাদুও আমার সাথে কথা বলছে না। আমাকে ঘেন্না করচে যেন আমার গায়ে কুঠ ফুটেছে।
–এতে আমার দোষ কুথায়?
–সব দোষ তুমার। তুমি আমাকে হাতে ধরে বেলাইনে নিয়ে এলে। আমি তুমার ছেলের মতো। ছেলেকে কেউ হাড়িকাঠে গলা দিতে ঠেলে দেয়। মাথার চুল মুঠো করে আর্তনাদে ভেঙে পড়ল রঘুনাথ।
হাবুল চোর আর দাঁড়াল, পেছনের ভেজা বালি ঝেড়ে বলল, গুয়ে শালিখের মতো তোর জন্ম। কত আর ভালো হবি বাপ। আমি চললাম। এবার তুই নিজের পেছন নিজে চাপড়া।
কথাগুলো শেষ না করেই হনহনিয়ে হেঁটে গেল হাবুল চোর। ভোরের আলো ফোটার আগে থানায় তাকে হাজিরা দিতে হবে। যা কড়া বড়োবাবু এসেছে হাজিরায় দেরি হলে মেরে মাজা ভেঙে ঘরে শুইয়ে রাখবে মাসের পর মাস। চুরি বিদ্যে তখন শিকেয় ভোলা ফুলের মতো শুকিয়ে ঝরঝরে হয়ে যাবে। শুকনো ফুলের এক পয়সাও দাম নেই–এটা হাবুল চোরের চাইতে ভালো করে আর কেউ জানে না।
১০. প্রকৃতির ধর্ম
৪৬.
পাল্টে যাওয়াই প্রকৃতির ধর্ম।
মাত্র এক বছরে অনেকটাই বদলে গিয়েছে হলদিপোঁতা। পিটুলি গাছের পাতাগুলো টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে কদিন হল। ঝারির কোল ভরেছে মাস কয়েক আগে।
ভূষণী বুড়ি ধার পাত্তিতে ওর নাড়ি কেটে বলল, তুর বেটা হয়েচে রে, বউ! নাড়ি শুকোলে আমাকে নিদেন পক্ষে সোনা দিবি। ইবার আর কাঁসা পেতলে মন ভরবে না। তুর বাঁজাগাছের ফল, শুকনা হাতে বিদেয় আমি লিবো নি।
কোঁত পাড়তে গিয়ে ঘেরা দাওয়ায় চোখে জল এসে গিয়েছিল ঝারির। প্রসব বেদনায় যে এত সুখ স্বপ্নেও ভাবেনি সে। কাঁচা খোকার মুখের দিকে তাকিয়ে তার চোখের তারা স্থির হয়ে গেল।
ভূষণী বুড়ি বলেছিল, আর কাঁদিস নে বউ। পেট হালকা হলে মনও হালকা হয়। হালকা মন কেঁদে কেঁদে আর ভার করিস নে। মেঘলা দিন কার আর ভাল লাগে বল?
দেখতে দেখতে চাঁদের টুকরো ছেলেটা এখন কোল ভরিয়ে হাসে। মনে হয় যেন বুড়িগাঙের জলে কোজাগরী চাঁদ খেলছে, সাঁতরে ডুব দিয়ে আবার ভেসে উঠছে। তখন বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কাঁপুনি টের পায় ঝারি। ভিকনাথ পাশে বসে ছেলের চুকচুকিয়ে দুধ খাওয়া দেখতে দেখতে বলে, দুধ দেওয়ার সময় এত কি ভাবো বলোদিনি?
ঝারির হুঁশ ফেরে, ভাবার আর সময় পাই কখুন? মায়ের দুটা সময় ভাবনা বেশি। ছেলেকে দুধ খাওয়ানোর সময় আর উকুন মারার সময়। এছাড়া ভাবার আর সময় কুথায়।
ঝারির চোখে দেওয়ালির তারাবাতির ঝিলিক। তার সারা শরীরে মাতৃত্বের রেণু দুধের সরের মতো কোমল হয়ে জড়িয়ে আছে। ভিকনাথ চোখ ফেরাতে পারে না। এ ঝারি তার চেনা নয়, একে যেন সে প্রথম দেখছে।
মা হলে যে কোনো মেয়ে আকাশের চেয়েও সুন্দর। পাকুড়গাছের নতুন পাতা গজানোর মতো তার লাবণ্য-আভা। মাতৃত্বের আলোটাই আলাদা। তবু এই অলৌকিক আলোর মধ্যে অন্ধকারের সাপটি ঘাপটি মেরে বসে থাকে। সেই সাপটাই মাঝে মধ্যে ফণা তোলে। বিষ ঢেলে দিতে চায়।
লুলারামের ব্যবহার এখন ঝারির কাছে পাগলের মতো মনে হয়। ওর আব্দার মেটাতে ঝারি অপারগ। লুলারাম তাকে দোষারোপ করে বলে, তুমার জন্যি আমার বউ মরল। এখুন আমাকে এড়িয়ে গেলে চলবে? আমার এটাও তো শরীল। আমারও তো খিদে পায়।
