নূপুর হাঁ-করে তাকিয়ে ছিল কিছু শোনার জন্য, রঘুনাথ এড়িয়ে যাবার জন্য বলল, ঠিক আছে, তুই এখুন যা। কমলার সঙ্গে পরে আমি দেখা করে নেব।
–দেখা করো কিন্তু। নপুর নিশ্চিত হতে চাইল।
টগরী হাসতে হাসতে বলল, দাদা, আমাদের ঘরে কবে যাবা?
রঘুনাথ হাসতেগিয়েও পারল না, কষ্ট হল, কোনোমতে বলল, বেঁচে থাকলে ঠিক যাব। তোরা এখন যা
বাঁধের গা বেয়ে ঢালু পথটা গ্রামের ভেতর ঢুকে গেছে। গাছগাছালির ছায়ায় শান্ত পথ যেন ঘুমিয়ে আছে। নুয়ে পড়া বাঁশঝাড়ের সাথে পথের কি সখ্যতা রঘুনাথ জানে না তবু তার মনে হল এই চিরন্তন সম্পর্ক বুঝি মা আর সন্তানের মতো স্নিগ্ধময়।
একা হাঁটলে নিজের সঙ্গে কথা বলে মানুষ। নিজের সঙ্গে কথা বলে এখন ক্লান্তবোধ করে রঘুনাথ। বারবার করে তার মনে ভাসছে দুর্গামণির মুখ। সুখের বদলে দীর্ঘ মন্থনে উঠে আসছে দুঃখ। মা কি তার পর হয়ে গেল? দাদু? এত ঠুনকো এসব দীর্ঘকালীন সম্পর্ক? কে জানে। মানুষ অনেক কিছুই জানে না, বোঝে না।
রঘুনাথ সূর্যাক্ষের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ডাকল, সূর্য, সূর্য।
মীনাক্ষী বাইরে এসে দেখলেন তাকে। কিন্তু কোনো উত্তর দিলেন না। মুখ ঘুরিয়ে নিঃশব্দে ঘরের ভিতর ঢুকে গেলেন তিনি। রঘুনাথ দূর থেকে দেখতে চাইল–ওই মুখে তার জন্য কতটুকু ঘৃণা জমেছে এতদিনে?
মন খারাপ করার আরও অনেক কিছু রসদ লুকিয়েছিল রঘুনাথের জন্য। দ্বীপীদের বাড়িতে এসে সে জানতে পারল সূর্যাক্ষ পরীক্ষা দেবার জন্য কালীগঞ্জে চলে গিয়েছে। পরীক্ষা দেবার কদিন ওরা ওখানেই থাকবে। এতে সুবিধে অনেক, যাওয়া-আসায় সময় নষ্ট হয় কম। পড়াশোনায় মনোনিবেশ করা আরও সহজ হবে। ঝড়-জলের আশঙ্কা প্রায়দিনই লেগে আছে, এখানকার বর্ষাঋতু কারও ধার ধারে না।
দ্বীপীদের বাড়িতে অদ্ভুত এক মৌনতা লক্ষ্য করল রঘুনাথ। মন খুলে কেউ তার সঙ্গে কথা বলল না। ঠিক এড়িয়ে যাওয়া নয়, অথচ অপ্রত্যক্ষভাবে এড়িয়ে যাওয়াটা মর্মে বিধে গেল রঘুনাথের। অন্তর্গত পাপবোধ তাকে মাথা সোজা করে দাঁড়াতে দিল না কিছুতেই।
ঘরে বাইরের এই দংশন রঘুনাথকে খোলা আকাশের নিচে দাঁড় করিয়ে দিল। মনে মনে সে ভাবল তার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এবার সে যাবে কোথায়? শুভর কাছে গেলে ওর মা নিশ্চয়ই তাকে তাড়িয়ে দেবে না। তবু ওখানে যেতে ইচ্ছে হল না তার। বিতাড়িত হবার জ্বালা অনেক। এই জ্বালা থেকে মুক্তির উপায় কি?
রঘুনাথ হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল বড়ো গঙ্গার শ্মশানের কাছে। জায়গাটা নির্জন, জল সেই নির্জনতাকে প্রকট করেছে। এখানে এলে একটা ভেজা গন্ধ টের পায় রঘুনাথ। পা ছুঁয়ে থাকা মাটি যেন একাকীত্বের কথা বলে।
বয়ে যাওয়া গঙ্গার দিকে তাকিয়ে রঘুনাথের মনে হল তার এই জীবনের কি দাম আছে? গ্রামসমাজে একবার সম্মান হারালে সহজে তা ফিরে আসে না। পুকুরের জলে হারিয়ে যাওয়া সঁচ খুঁজে পাওয়া সহজ, কিন্তু ডাঙায় হারানো সম্মান ফিরে পাওয়া আরও কঠিন। নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেই যেন ভয়ে কুঁকড়ে গেল রঘুনাথ। সূর্যাক্ষ, শুভ, সবুজ… সবার সঙ্গে মেশার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে সে।এ কালিলেপা মুখ নিয়ে সে কোন ভরসায় ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। এমন ভাবনায় কেঁপে গেল রঘুনাথের দুর্বল হৃদয়। সব হারিয়ে গেলে দুঃখ নেই, কিন্তু বন্ধু হারিয়ে গেলে সেই দুঃখভার সে কি বইতে পারবে?
হরনাথ দূর থেকে দেখেই চিনতে পেরেছিল রঘুনাথকে। অমন মুখ ঝুঁকিয়ে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে এল সে। লাল-লাল চোখ, মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল, ফোলা গোলাকার মুখ নিয়ে সামনে এসে সঁড়াল হরনাথ, খুব নিবিষ্ট চোখে রঘুনাথকে জরিপ করে বলল, কি রে কবে এলি?
মনে মনে আঁতকে উঠল রঘুনাথ, তার জেল যাওয়ার খবরটা শ্মশানের ছাইভূমিতেও এসে পড়েছে, এবার কোথায় পালাবে সে, কোথায়? মুক্তির রাস্তাগুলো কেন্নো হয়ে শুয়ে আছে জড়োসড়ো। এই গুটিয়ে থাকা জীবনের উপর তার কোনো আগ্রহ নেই।
হরনাথ সহজে ছাড়ার পাত্র নয়, রঘুনাথের পাশে বসে শুধোল, কী হয়েছে তুর? ঘর থিকে পেলিয়ে এয়েচিস বুঝি?
ঘাড় নাড়ল রঘুনাথ, পেলিয়ে আসব কেন? পেলিয়ে পেলিয়ে কদিন আর বাঁচা যাবে বলো?
-তা ঠিক। কোমরে লাল গামছাটা জড়িয়ে নিল রঘুনাথ। চোখ রগড়ে নিয়ে সে হরনাথের দিকে তাকাল, তুমি তো শ্মশানে থাকো রাতদিন, তুমার কাচে নেশার কিছু হবে নাকি?
–তুই নেশা করিস? হরনাথ জটা ধরা চুলগুলো আঙুলে জড়াতে জড়াতে প্রশ্ন করল।
সশব্দে হাসল না রঘুনাথ, শুধু ঠোঁটে হালকা হাসি মাখিয়ে বলল, নেশা না করলে এসব কুকাজ কি করা যায় গো?
–ছেড়ে দে বাপ। নেশায় কিছু নেই রে
-যারে ধরেচি, তারে ছেড়ে দিলে লোকে আমাকে বেইমান ভাববে। রঘুনাথ গোল গোল চোখ মেলে তাকাল।
কপাল কুঁচকে হরনাথ আক্ষেপের সঙ্গে বলল, তুর বাবা আমার সাথে মদ খায়।
-বাপ খায় যখন, ছেলে খেলে বুঝি দোষের হয়।
–না তা নয়। হরনাথ অবাক হয়ে শুনছিল।
রঘুনাথ বলল, আজ আমি জেল থিকে ছাড়া পেয়েচি। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ভাবলাম-যাক আমি আজ বেঁচে গেলাম। আমি যা ভেবেচি–তা ভুল গো। জেল শুধু কেসনগরে নেই, জেল গায়ে-গঞ্জে সবখানেতে আচে।
–তুর হেঁয়ালি কথা রাখ, বাপ। নেশা করতে মন চায় তো চ। হরনাথ ওর হাত ধরে টানল।
