কীভাবে নাতির মুখোমুখি দাঁড়াবে সে-কী বলবে তাকে–এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল চুনারামের মাথার ভেতর। তবু দাঁড়াতে হয়, না দাঁড়ালে কি পারা যায়? অনেক দিন পরে চুনারামের মনে হল সে নিজেই যেন কোনো জঘন্য অপরাধ করে ঘরে এসেছে, তার এতদিনের জমিয়ে রাখা অহঙ্কার সব মিশে যাচ্ছে ধুলোয়।
রঘুনাথকে পাশ কাটিয়ে তক্তপোষের দিকে যেতে গেলেই একটা ডাক ভেসে আসে তার কানে, দাদু!
এবার দাঁড়িয়ে পড়ল চুনারাম। যান্ত্রিকভাবে মাথাটা বেঁকিয়ে শুধোল, কি?
-কেমুন আচো গো দাদু? রঘুনাথের গলায় আবেগ কচুপাতার জলের মতো টলমল করছিল।
চুনারাম কিছুটা নীরসভাবে বলল, না মরে বেঁচে আছি। গরীবের আর থাকা না থাকা।
অবস্থা সুবিধার নয় বুঝে রঘুনাথ বলল, বড়ো ভুল করে ফেলেচি, ইবারের মতুন মাপ। চুনারাম কিছুটা উত্তেজিত, সব কাজের কি মাপ হয় রে?
এবার কি জবাব দেবে শরীর হাতড়েও খুঁজে পেল না রঘুনাথ। এ বাড়ির সবাই এত নিষ্ঠুর হবে ভাবতে পারেনি সে। নিজের ঘর এ কমাসে পর হয়ে গেছে তার কাছে। সে ভেবেছিল অন্তত মা তাকে সব ভুলে গিয়ে আবার আগের মতো কাছে টেনে নেবে। ভুল। মার ভেতরের পাথরটাকে সে আর এ জীবনে গলিয়ে নরম করতে পারবে না। এত কাছের দাদুও তার পর হয়ে গেল। ভালোভাবে কথাও বলতে চাইছে না ওরা। এই মানুষগুলো এতদিন কোথায় লুকিয়ে ছিল? রঘুনাথ ভাবত-এরা এলেবেলে, খড়কুটো। এরা শুধু পেটে খেয়ে বাঁচার জন্য প্রাণপাত করে। এদের কোনো আদর্শ নেই, ধর্ম নেই। এতদিন ভুল বুঝেছে রঘুনাথ। চোখের দুকোল মুছে নিয়ে বাইরে এল সে।
খাঁ-খাঁ করছে দুনিয়া। আজ যেন বুড়িগাঙও তার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে না। বুকটা পাথর হয়ে এল তার। জমাটবাঁধা দুঃখগুলো কান্না হয়ে ঝরে পড়তে চাইল পথের ধুলোয়।
যে ঘরে তার জন্য এত ঘৃণা এত অবজ্ঞা জমে আছে–সেখানে কি তার থেকে যাওয়া উচিত হবে–একথা বারবার করে ভাবল রঘুনাথ। আকাশ আর এই ধুলোপথ ছাড়া আর কোনো কিছুকেই তার আপন বলে মনে হয় না।
টগরী কিতকিত খেলছিল, নুপূর ছককাটা ঘরের পাশে দাঁড়িতে অপেক্ষা করছিল দান পাওয়ার। ওর হুঁশিয়ার চোখ সতর্ক মাছরাঙার মতো দেখছিল টগরী দাগে পা দেয় কী না।
তখনই রঘুনাথকে ছন্নছাড়াভাবে যেতে দেখে টগরী উৎসাহ নিয়ে লাফিয়ে উঠল রঘুদা, কবে এলে গো?
খেলা থেমে গেল টগরীর। পা দুটো ফাঁক করে অদ্ভুত কায়দায় সে দাঁড়িয়ে আছে। নূপুর দৃষ্টি ঘুরিয়ে রঘুনাথকে দেখে থ। দান-দেখা ভূলে সে দৌড়ে গিয়ে রঘুনাথের মুখোমুখি দাঁড়াল, দাদা, কখন এলি রে?
রঘুনাথ কোনো কথা না বলে গম্ভীর হয়ে দাঁড়াল।
টগরী আপন মনেই বলল, তুই চলে যাবার পর জেঠি কত কানছিল।
কথাগুলো যেন লিকলিকে চাবুক হয়ে আছড়ে পড়ল রঘুনাথের পিঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে সে কিছু বলতে গেলেই নূপুর তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, কুথায় চললি ঘর চল। আমি আর খেলব না।
রঘুনাথ এবার বাধ্য হল মুখ খুলতে, আমি ঘর যাবো না, মাঝের গাঁ যাবো।
-মাঝের গাঁ পরে যাস। এখন ঘর চল তো, কথা আছে। নূপুরের ঠোঁটে হাসি এক রহস্যময়তার গন্ধ দিল রঘুনাথকে। এসব এড়িয়ে সে টগরীর মাথার হাত রাখল স্নেহের, এখন কেমুন আছিস রে টগরী?
টগরী মুখ ফাঁক করে বলল, খু-উ-ব ভালো। কেসনগরের ডাক্তার দেখেছিলো, ওষুধ দিয়েছিলো তাতে ভালো হয়ে গিয়েচি, দাদা। এখুন আর পেটে কুনো বিদনা হয় না। এখুন আমি রোজ কিতকিত খেলি।
সূর্যের কিরণের চেয়েও ঝকমকে হাসছিল টগরী, হাসতে হাসতে সে কেমন উদাস হয়ে গেল, রঘুনাথের ডান হাতটা চেপে ধরে বলল, দাদা গো, তুমাকে যেদিন পুলিশ ধরে নিয়ে গেল–সেদিন আমি কত কালাম। মা শীতলাবুড়িকে বললাম–আমার দাদাকে যেন পুলিশ না মারে। দাদা, তুমাকে কি পুলিশ মেরেছিল? কুথায় মেরেছে গো? আর কুনোদিন খারাপ কাজ করো না দাদা।
আবার দু-চোখ বর্ষার মেঘের মতো ভারী হয়ে উঠছিল রঘুনাথের, কোনো মতে টগরীর হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সে বলল, তুই ভালো আছিস শুনে আমারও খুব ভালো লাগল। তোর অসুখে আমি ভীষণ ঘাবড়ে গেছিলাম।
-তুমার কি মন বলছিল আমি মরে যাব?
না রে পাগলি, তা কেনে হবে?
টগরী বিষণ্ণ হয়ে বলল, আমার কাচে লুকিয়ো না। আমি সব বুঝি গো। এ পাড়ার কেউ ভাবতে পারেনি, আমি আবার বেঁচে ফিরব। তবে দাদা, আমি জানতাম–আমি মরব না। কষ্ট পাবো, কিন্তু মরব না। হাসপাতালে রোজ শীতলাবুড়ির সাথে আমার কথা হত। আমি বেছানায় শুয়ে-শুয়ে তারে ডাকতাম যে!
টগরী আর নূপুরকে এড়িয়ে যাওয়া রঘুনাথের পক্ষে সম্ভব নয়। ওরা ফুলগাছের মতো ডালপালা দিয়ে ঘিরে ধরেছে ওকে। সুগন্ধ এড়িয়ে মানুষ কতদূর যেতে পারে?
নূপুর রঘুনাথের হাতে ইঙ্গিতপূর্ণ চিমটি কেটে হাসল, দাদা, কমলাদির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। অনেক কথা আছে, তুই কখন আসবি বল?
যে সম্পর্ক শুকিয়ে গিয়েছে, সেই সম্পর্কে কিভাবে ফিরে আসে বিদ্যুৎ-এর শিহরণ। রঘুনাথ শুধু চমকে উঠল না, অবাকও হল কিছুটা। নূপুরের মুখের দিকে তাকিয়ে সে কিছুসময় বাক্যহারা হয়ে রইল।
নূপুর বলল, দাদা, কমলাদি ঘরে এয়েচে। ওর বরও সাথে এয়েছে। আমাকে বলল–তুমাকে খবরটা দিয়ে দিতে।
রঘুনাথের ভেতরটা তছনছ হয়ে গেলেও সে যথাসম্ভব প্রতিক্রিয়াহীন থাকার চেষ্টা করল নুপুরের সামনে। কমলার কোনো কথাই সে রাখতে পারেনি। জন্মগত সংকোচ তাকে পা বাড়াতে দেয়নি। পদে পদে বাধা এসে আগলে দিয়েছে পথ। সাহস করে কমলার হাত সে চেপে ধরতে পারেনি–এটা তার অক্ষমতা। উল্টে হাবুল চোরের কথা শুনে সে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল যার কোনো ক্ষমা নেই। এই আফসোস কবে যে শেষ হবে কে জানে।
