ওর সঙ্গে এসেছিল নূপুর। সে বলল, কেঁদো না কাকি। চলো, বাসে উঠে দাদার সঙ্গে দেখা করে আসি।
–খবরদার, ও কথা বলবিনে। রাগে জ্বলে উঠল দুর্গামণি, চোখের জল মুছে নিয়ে সে চেষ্টা করল স্বাভাবিক হবার, কিন্তু পারল না। মন চাইল একবার গিয়ে দেখা করে আসতে কিন্তু ভেতর থেকে কে যেন বলল–যেও না। যে ছেলে পরের ঘরে চুরি করে মা হয়ে সে ছেলের মুখ না দেখাই ভালো। মনটা বিক্ষিপ্ত হতেই ভেতরটা ছটফটিয়ে উঠল তার। পৃথিবীর আর কোনো কিছু ভালো লাগছিল না তার। মুখ নিচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল সে। তবু চোখ দুটো বারবার চলে গেল বাসের জানলায়। একসময় ঝাপসা হয়ে এল তার দৃষ্টি।
রঘুনাথ কুলগাছের ভাঙা ডালের মতো মুখ ঝুঁকিয়ে বসেছিল। চোখ তুলে তাকাবার ক্ষমতা নেই তার। চুরি করতে যাওয়ার বিবেক দংশন বুঝি বা তাকে ঠুকরাচ্ছিল বারবার। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজটা তার করা উচিত হয়নি, ভাবল সে। হাবুল চোরকে কোনমতে বোঝাতে পারল না সে। মানুষটা তখন একটা শুকনো গাছ। তার কাছে কেঁদেকেটে কি লাভ?
থানায় লুলারাম এসেছিল দেখা করতে। সে এসে আরও তাতিয়ে দিয়ে গেল, ভয় পাবিনে, যা হবার তা হয়েছে। চোর বদনাম একবার রটলে চট করে তা যায় না। তবে যা হয়েছে, ভালো হয়েছে। এতদিন পরে তুর বুদ্ধিশুদ্ধি খুলেচে। তোর বাপকে তো এ লাইনে আনতে পারি নি। তুই এসে আমার দল ভারী হল।
লুলারামকে কী বলবে কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিল না রঘুনাথ। বারবার করে তার শুধু কমলার মুখটা মনে পড়ছিল। যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে কি এভাবে কষ্ট দেওয়া যায়? অথচ কমলা তাকে বাঁচাবার জন্য কত চেষ্টাই না করল। এমনকী সুফল ওঝার পায়ে ধরে কেঁদে উঠেছিল সে। তার নতুন বর ভ্যালভ্যাল করে দেখছিল, জীবনে এমন নাটক বুঝি সে দেখেনি এমন তার হাবভাব। ঘিরে ধরা লোকজনের মধ্যে কাশীনাথকে চিনতে ভুল হয়নি তার। বদলা নেবার জন্য কাশীনাথ ফুটছিল। এই সুযোগ সে হাতছাড়া করল না। তারই নির্দেশে ডান পাটা মুচড়ে ভেঙে দিল মারমুখী মানুষগুলো। তবু বাঁচাবার শেষ চেষ্টা করেছিল কমলা। সে হেরে গেল। তার প্রেম হেরে গেল। ডুকরে ওঠা বধূবেশী কমলার অসহায় চাহনিই বলে দিচ্ছিল এসব কথা।
এখন সেই বিস্ময় মাখানো, কান্নাকাতর চাহনিটাই বড়ো অসহায় আর কোণঠাসা করে তুলছে রঘুনাথের থেতলে যাওয়া সত্তা। একটা প্রশ্ন তার মনে বারবার ঘুরে ফিরে আসছে–সে কি কমলাকে ভালোবাসত না? ভালোবাসলে কি এমন নিষ্ঠুর কাজ করা যায়? বাসটা কঁকুনি দিয়ে নড়ে উঠতেই দৌড়ে এল নূপুর, দাদা, জেঠি এসেছে, তুই ওর দিকে তাকাবি না? নুপুরের কথায় আন্দোলিত হল রঘুনাথ। নিজের ভেতরে তছনছের শব্দ শুনতে পেল সে। লললুলা মাটি দিয়ে তৈরি খেলাঘরের মতো বারবার ভেঙে যেতে লাগল তার মনের জোর।
ক্রমে ক্রমে ভরে উঠছে বাসটা। একজন পুলিশের হাতে ধরা আছে মোটা দড়িটা। নূপুরের ভালো লাগছিল না দেখতে, এমনটা দেখতে সে অভ্যস্ত নয়, ফলে চোখ ঘুরিয়ে নিল সে। বাস ছেড়ে দেওয়ার আগে নূপুর বলল, তুই ভাবিস নে দাদা, বাবা আর জেঠা পরের বাসে যাচ্চে। ওরা কেসনগরে কোর্টে গিয়ে তোর সঙ্গে দেখা করবে। বাবা বলছিল–আজই তোর জামিন হয়ে যেতে পারে।
জামিন না হলেও রঘুনাথের কিছু করার নেই। কাশীনাথের নির্দেশে লাঠিয়াল মানুষগুলো ওর পাটাকে জখম করে দিয়েছে। কালীগঞ্জ হাসপাতালের ডাক্তার বলেছেন, মনে হয় পাটা ভেঙেছে। যদি ভাঙে তাহলে সারতে সময় লাগবে। যেভাবে ফুলে আছে ডান পাটা তাতে ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছে না কেউ। থানার গাড়িতে চেপে রঘুনাথ হাসপাতালে গিয়েছিল মেডিকেল চেক আপ-এর জন্য। ব্যাণ্ডেজ জড়িয়ে ব্যথার ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন ডাক্তার। থানায় হাজতে কাল সারারাত ঘুমাতে পারেনি রঘুনাথ। বারবার করে মনে পড়েছে কমলার কথা। কমলার সঙ্গে তার বুঝি বিশ্বাসঘাতকতা করা হল। কোন মুখ নিয়ে সে কমলার কাছে দাঁড়াবে?
বাস ছেড়ে দিতেই মন খারাপ করে নেমে এল নূপুর। যত দূর বাসটাকে দেখা যায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘাড় টানটান করে দেখছিল দুর্গামণি। বাসটা একসময় পালপাড়ার বাঁকে হারিয়ে গেল। দুর্গামণির মনটা ভরে গেল শূন্যতায়। যেন কোল ফাঁকা হয়ে গেল তার, সম্পর্ক ছিডে হারিয়ে গেল একটা মানুষ যে তার কলিজার টুকরা।
নূপুর পাশে এসে বলল, জেঠি গো, ইবার চলো। রোদ বাড়ছে। আবার অতটা পথ যেতে হবে।
বেলার দিকে কোনো খেয়াল ছিল না দুর্গামণির। এখন তার মাথার কোনো ঠিক নেই। গুয়ারামও ছেলের চিন্তায় অস্থির। টাকার জন্য সে রেশনবাবুর কাছে গিয়েছিল। রেশনবাবু তাকে টাকা দেয়নি, উল্টে দু-চার কথা শুনিয়ে ছেড়ে দিল। মন বেজার করে গাঁ থেকে ফিরে এসেছে গুয়ারাম।
রঘুনাথ থানায় যাওয়ার পর থেকে মন বেজার হয়ে আছে চুনারামের। মুখে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। মন নয়তো যেন নিম্নচাপের গুমোট আকাশ। প্রথমত সে ভাবতে পারছিল না রঘুর দ্বারা এমন পাপ কাজ হল কী ভাবে? তাহলে কি লুলারামের হাত-এর পেছনে লুকিয়ে আছে? বংশের একজন বিপথগামী হলে অন্যজনকে সেইপথ অনুসরণ করতে হবে–এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। তবু ঘটনাটা দুর্ভাগ্যজনক। চুনারাম মন থেকে রঘুনাথের এই অধঃপতন মেনে নিতে পারেনি। মন বারবার বললেও সে থানায় যেতে পারেনি সংকোচে। কোন মুখ নিয়ে সে থানায় যাবে? কী ভাবে রঘুনাথের মুখোমুখি দাঁড়াবে সে? এই বয়সে এত বড়ো আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা নেই তার। তাই বুকে নীরবতার পাথর রেখে সে গাছের মতো বোবা হয়ে গিয়েছে।
