দূর থেকে মুখ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গিয়াসকে দেখে এগিয়ে এল সে। সাইকেলটা গাছে হলান দিয়ে সে সন্দেহঘন চোখে গিয়াসের দিকে তাকাল, তা, অবেলায় এই বটতলায় কি করছো হে! হাসল নুর মহম্মদ। আর তাতেই পিত্তি চটকে গেল গিয়াসের। কথা বলার ইচ্ছে হল না, তবু তিতকুড়ো ঢোঁক গিলে তাকে বলতে হল, গাঁয়ে এসেছিলাম। এবার কালীগঞ্জে ফিরব
–তা তো ফিরতেই হবে। নুর মহম্মদ চুরুক দাড়িতে হাত বুলিয়ে হাসল, তার পান খাওয়া দাঁত বিকশিত হল নিমেষে, চিবিয়ে-চিবিয়ে সে বলল, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার কেউ মারা গিয়েছে! তা কিসের এত শোক গো তোমার?
গিয়াস আঁতকে উঠল কথা শুনে। শুকনো হাসি ফোঁটাবার চেষ্টা করল ঠোঁটের ডগায়। কিন্তু বাসি ফুলের পাপড়ির মতো ঝরে গেল সেই হাসি। মুখ কাঁচুমাচু করে সে আড়াল করতে চাইল সত্য, তুমি ঠিকই ধরেচো, মন আমার ভালো নেই। গাছ ঝোড়ার কাজে ডাহা লস চলছে।
তোমার কথা মানতে পারলাম না। নুর মহম্মদ বিজ্ঞের হাসি হাসল, এ বছর তো সিজিন ভালো চলছে। যা শীত পড়েছে, তাতে লস খাবার তো কথা নয়।
গলা শুকিয়ে খড়খড়িয়ে উঠল গিয়াসের কণ্ঠস্বর, কাল ঠিলিগুলোকে ফুটা করে দিয়ে পালাল। মেলা টাকার লস হয়ে গেল গো। শুধু পয়সা নয়, রসও ঝরে গেল মাটিতে। লোক যদি শত্রুতা করে তাহলে আমার কি সাধ্য আছে তা ঠেকাব।
-তা তো ঠিক। নুর মহম্মদ হাত বাড়িয়ে দিল একটা বিড়ির জন্য।
ঝামেলা এড়াতে ডিবা খুলে একটা বিড়ি দিল গিয়াস। নুর মহম্মদ বিড়ির মুখে জোরসে ফুঁ দিয়ে আগুন ধরাল। এক মুখ ধোয়া ছেড়ে সে রহস্যময় চোখে গিয়াসের দিকে তাকাল। রসিকতা করার গলায় বলল, তোমার গাঁয়ে গেছিলাম। তোমার গাঁয়ে ব্যবসা আমার মন্দ হয় না। তা তোমার ঘরে টিপ তালা ঝুলছে দেখলাম। ঘরে বুঝি কেউ নেই?
এ প্রশ্নের কি জবাব দেবে গিয়াস। লোকটা সব জেনে-শুনে বোকা সাজতে চাইছে। গিয়াসের মুখ থেকে শুনতে চাইছে কেচ্ছা-কাহিনী। সব শোনার পরে এ-ও এক বিকৃত উন্মাদনা। ভাবনার নীল হয়ে আসে গিয়াসের মুখমণ্ডল। উদভ্রান্ত চোখে সে আকাশের দিকে তাকায়, মনে মনে সে বলে, হে আল্লা, তুমি আমাকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করো।
নুর মহম্মদের তর সইছিল না, কী হল, কথা আটকে গেল যে! এবার সে শব্দ করে সবজান্তার হাসি হেসে উঠল, গা-হাত-পা ঝাঁকিয়ে একটা খিস্তি দিয়ে বলল, আমার কাছে গোপন করে আর কি হবে? তোমার বউ পালিয়ে যাবার খপর আমি শুনেছি। কথাগুলো বলেই চুপ করে গেল নুর মহম্মদ। তারপর লুঙ্গি উঠিয়ে দাপনা চুলকে বলল, মরদের কমজোরী হলে বউ পালাবে না তো কি ধরে বসে থাকবে? তোমার যদি অসুবিধে ছিল তাহলে হাকিমের কাছে যেতে পারতে। শেকড়-বাকড় বেঁটে এমন ওষুধ বানিয়ে দিত বা খেয়ে গায়ে হাতির বল পেয়ে যেতে।
–যা ভাবছ, তা নয়। মিনমিনে গলায় গিয়াস কিছু বলতে চাইল।
নুর মহম্মদ তার মাধে চাপড়া মেরে বলল, শাক দিয়ে আর মাছ ঢাকতে যেও নি-ধরা পড়ে যাবে। নাফিজা যে পালিয়েছে তার এই একটাই কারণ। গিয়াস তবু অস্পষ্ট গলায় বলল, যে থাকার নয় সে তো পালাবেই। আমি তাকে আটকে রাখলেও সে পালাবে। সব ঠিক করা যায় কিন্তু রক্তের দোষ ঠিক করা যায় না।
নুর মহম্মদ চুরুক দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, যা হবার তা তো হয়েছে। এখন কি ভাবছ তুমি?
–ভাবার মনটাই মরে গেছে।
-অত ভেঙে পড়লে চলবে, শক্ত হও। নুর মহম্মদ চোখে চোখ ফেলে তাকাল, সে যখন ধোকা দিয়েছে তুমি তাকে গরম লোহার সেঁক দাও। সে একজনের হাত ধরে পালাল, তুমিও একজনের হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসো। ভাত ছড়ালে কাক-পক্ষীর অভাব হবে নি। তোমার যদি ইচ্ছে থাকে আমাকে খপর দিও। আমার হাতে ভালো মেয়ে আছে।
গিয়াস ঘামছিল, গামছায় মুখ মুছে সে বলল, এবার আমাকে যেতে হবে আঁধার নামছে।
-হ্যাঁ হ্যাঁ, যাও। তবে আমার কথাটা মনে রেখো। নুর মহম্মদ জোর গলায় বলল, যে তোমাকে কঁদিয়েছে, তুমি আর তার জন্যি কেঁদো না। এ দুনিয়ায় সব সম্পর্কই খোলামকুচি। ধুলোর যা জান আছে, সম্পর্কের তা নেই গো। গিয়াস সাইকেলটা টেনে নিল নিজের কাছে। যেন সাইকেল নয়, নাফিজাকে সে যেন নিয়ে এল নিজের নিঃশ্বাসের আওতায়। বউটা পালিয়ে গিয়ে তার মুখে চুনকালি লেপে দিয়েছে যা হাজার সাবান ঘষেও উঠবে না। গ্রাম সমাজে এখন কদিন দাপিয়ে বেড়াবে এই সংবাদ। গুজবের হাজার ডালপালা। তার ঝাঁপটা খেতে খেতে গিয়াস যে কোথায় ছিটকে পড়বে–তা তার জানা নেই। এই মুহূর্তে গিয়াসের মনে হল–হ্যাঁসপাতালের মাঠটাই তার জন্য নিরাপদ জায়গা। কাজের মধ্যে ডুবে গেলে সে নিশ্চয় নাফিজাকে ভুলে থাকতে পারবে।
.
৪৫.
থানা থেকে চালান গেল রঘুনাথ।
দুর্গামণি বাস-স্ট্যান্ড অবধি এসেছিল কাঁদতে কাঁদতে। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে রঘুনাথ এমন কাজ করতে পারে। কমলার সঙ্গে ছেলেটার ঘনিষ্ঠতার খবর বানানো নয়। তারপরেও এসব কাজ করার প্রবৃত্তি হল কি করে? হিসাব ভুল হয়ে যাওয়া মানুষের মতো উদভ্রান্ত দেখাচ্ছিল তাকে।
থানার দু-জন পুলিশ রঘুনাথের মাজায় মোটা দড়ি বেঁধে বাসে ওঠাল। ওর হাতে হ্যান্ড-ক্যাপ। দূরে দাঁড়িয়ে দুর্গামণি হাপুস নয়নে দেখল। চোখের জল আটকে রাখা তার পক্ষে আর সম্ভব হল না। ফুঁপিয়ে নয়, আঁচলে মুখ ঢেকে শরীর ঝাঁকিয়ে কেঁদে উঠল সে।
