হাজার চেষ্টা করেও জেলবাস রোখা গেল না রঘুনাথের। কোর্ট-চত্বরে দাঁড়িয়ে লুলারাম আশাহত গলায় বলল, চল দাদা, গাঁয়ে ফিরে যাই। জেল যখন হল তখন তো আর কিছু করা যাবে না। মনকে বোঝাতে হবে। তবে আমরা মাঝে মাঝে এসে রঘুকে দেখে যাবো।
গুয়ারাম প্রতিক্রিয়াহীন গলায় বলল, তাতে আর কি লাভ হবে বল? দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটেরে!
কথাটা সত্যি হলেও লুলারাম পুরোপুরি মেনে নিতে পারে না। রঘুনাথ যা করেছে ভালোই করেছে, এতে তার পূর্ণ সমর্থন আছে। ভাই পারেনি, অন্তত ভাইয়ের ছেলে এসেছে রাস্তায়। এটাই বা কম কি। তাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিলে সে-ই একদিন এ লাইনে সাবালক হয়ে উঠবে।
তিনমাস সময় দেখতে-দেখতে কেটে গেল। খড়ো নদীর জল একপ্রান্ত থেকে গড়িয়ে গেল অন্যপ্রান্তে। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে রঘুনাথ প্রথমে তার বাবার দিকে তাকাল। ওই মানুষটার মুখের দিকে সে তাকাতে পারছে না লজ্জায়।
ধরা পড়ার পর শুয়ারাম শুধু থানায় এসে একটা কথা বলেছিল। মুখে চুনকালি লেপার আগে মরতে পারলি না বাপ! তুই মরে গেলে আমি সব চাইতে খুশি হতাম। ভাবতাম আমার কেউ নেই, আমি দেবদারু গাছের মতো একা। আটকুঁড়া।
পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে পা কাঁপছিল রঘুনাথের। গুয়ারামকে মনে হচ্ছিল থানার বড়ো দারোগা। সময় মতো খেতে পায় না, হাতে টাকা-পয়সা নেই তবু তার তেজ খরিস সাপের চেয়েও কম নয়। ধাওড়াপাড়ায় থেকে এত সাহস কোথা থেকে পায় মানুষটা!
বাস জলঙ্গী নদীর কাছে আসতেই ঠাণ্ডা বাতাস এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল রঘুনাথের বুকের উপর। এখন দিব্যি আরামের আবহাওয়া, রোব্দুর রঙ এবং স্বভাব বদল করে নিজেকে ভাবছে অঘোষিত রাজা। লোহার ব্রিজে পিছলে যাচ্ছে সেই রোদ, জলের উপর রোদের ক্রমাগত সোহাগ মনকে পৌঁছে দেয় অনেক দূর দেশে।
এত কিছুর পরেও কমলা একদিন ওর স্বামীকে নিয়ে জেলে এসেছিল দেখা করতে। অনেক হ্যাপা সামলে শেষ পর্যন্ত কমলা দেখা করতে পেরেছিল রঘুনাথের সঙ্গে। এক পলক দেখেই কান্নাকে আটকাতে পারেনি কমলা। সমস্ত স্মৃতি এসে গলা টিপে ধরছিল ওর। কান্না থামিয়ে কমলা বলেছিল, এত রোগা হয়ে গেছ তুমি। তোমার দিকে তাকানোই যায় না।
একথার কোনো উত্তর দেয়নি রঘুনাথ। উত্তর দেওয়ার মতো ভাষা ছিল না তার। কমলা এক টুকরো কাগজ রঘুনাথকে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এখান থেকে ছাড়া পেলে আমাদের বাড়িতে যেও। ওখানে তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। আমার ঘরের মানুষটা তোমার মতো, নিজে যা বুঝবে তাই করবে, পরের কথায় নাচে না।
ঠিকানাটা মুঠোর মধ্যে নিয়ে রঘুনাথ ভাবছিল ওর সাহসের কথা। সত্যি কমলার যা সাহস আছে তা হয়ত ওর নেই। সেই সাহসে ভর করে কমলা বলল, আমি জানি–তোমার দ্বারা চুরি করার মতন কঠিন কাজ কোনোদিন হবে না। যে একটা ফড়িং মারতে পারে না, সে যাবে পরের দোরে সিঁদ কাটতে! যে বিশ্বাস করে করুক–আমি এসব বিশ্বাস করি না।
কমলার এই জোর, দৃঢ়তা বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা স্থলপদ্ম। স্থলপদ্মফুল তো দূরের কথা রঘুনাথের বুকের মধ্যে সেই ভরসার চারাগাছটা বেড়ে উঠল না আজও। রঘুনাথ সংকোচে কুঁকড়ে গেল, তুমি এত কষ্ট করে এলে কেনে, খপর পাঠালেই তো হত। আমি গিয়ে হাজির হতাম।
–আমি মেসিন নই, রক্তমাংসের মানুষ। কমলার চোখ ধকধকিয়ে উঠল উত্তেজনায়, মনে রেখো, তুমি যা পারো–একটা মেয়ে তা পারবে না। আসলে মনের সাহসটাই বড়ো কথা।
কেমন কুঁকড়ে গিয়েছিল রঘুনাথ, কমলার মুখের দিকে তাকাতে পারেনি সাহস করে। সংকোচের পাঁচিলটা বাড়ছিল ক্রমশ। সেই পাঁচিল সে ভাঙতে পারেনি, এই জড়তা রঘুনাথের জন্মগত অসুখের মতো।
জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সবার আগে কমলার মুখটাই মনে পড়ছিল রঘুনাথের। কোথায় যেন অপরাধবোধের সূক্ষ্ম একটা খোঁচা তার মনের ভেতর বিঁধছিল। এর থেকে কিছুতেই সে নিষ্কৃতি পাচ্ছিল না।
বাস থেকে নামতেই লুলারাম তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছিল, সাবাস রঘু, তুই যা করেছিস এর জন্যি আমার মনে কুনো খিচখিচানি নেই। তুর জন্যি আমার ছাতি ফুলে যায়। তুর বাপ যা পারেনি, তুই তা পেরেচিস। বাঁচার জন্যি সব কিছু রসদ তুর আচে। ইবার শুধু বুদ্ধি খাটিয়ে চলতে হবে। দেখবি তুর জীবনের গোরুর গাড়িটা হড়হড়িয়ে চলছে।
কাকার কথা শুনে মোটেই উৎসাহিত হয়নি রঘুনাথ, বরং মনে মনে সে দগ্ধে মরছিল। এ যন্ত্রণার কথা সে কাউকেই বলে বোঝাতে পারবে না। কমলা অকে ভুল বোঝেনি এই যা রক্ষে। বাঁধের উপর পাশাপাশি হাঁটছিল লুলারাম আর রঘুনাথ। কথা বলার ইচ্ছে ছিল না ওর। লুলারাম পিটুলিগাছের মাথা থেকে চোখ ফিরিয়ে বলল, মনটারে শক্ত কর।
রঘুনাথ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, এ কাজ আমার জন্যি নয় কাকা! প্রথমেই বাধা পেয়ে গেলাম, পরে কি হবে কে জানে।
–অতো ভাবিস নে, সব ঠিক হয়ে যাবে। লুলারাম মন পাওয়ার জন্য বলল, হাবুল চোরের তুকে দিয়ে এ কাজ করানো উচিত হয়নি।
কেন উচিত হয়নি-চমকে উঠল রঘুনাথ। কাকা কি কমলার ব্যাপারটা সব জেনে গেছে। দুর্বলতার কথা বেশিক্ষণ চাপা থাকে না। আর প্রেম-ভালোবাসার সংবাদ তো পাখি হয়ে ওড়ে। নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে রঘুনাথ অস্বস্তিভরা দৃষ্টি মেলে তাকাল, আমি মানা করেছিলাম, সে আমার কথা শোনে নি।
-ওর মতন বোকা মানুষ আমি আর দুটি দেখিনি।
