মেহেরকে ছেড়ে আসতে নিদারুণ কষ্ট হয় গিয়াসের। ফ্যালফ্যাল করে দেখছিল মেহের। তার কোনো কিছু বোঝার শক্তি নেই। যদি বোঝার শক্তি থাকত তাহলে সে উচ্চস্বরে কাঁদত।
সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে রাস্তায় উঠে এল গিয়াস। শরীর আর চলছিল না তার। দিনভর ধকল গিয়েছে গাছ ঝোড়ায়। পরিশ্রমের কাজে ফাঁকি দেওয়া চলে না। জিরেন কাট রস পেতে গেলে খেজুরগাছের তোয়াজ দরকার। বিবিকে পোষ মানানো বুঝি সেই জিরেনকাট রস বের করার মতো। শক্ত গাছের শরীর কেটে রস বের করা কি মুখের কথা। কাঁটা বোঝাই খেজুরগাছ তার হাতের যাদুতে বশ মেনেছে অথচ নাফিজাকে সে পোষ মানাতে পারল না। কেন পারল না-এই ব্যাখ্যার উত্তর খুঁজতে গেলে তার কানের পাশটা ব্যথায় টনটনিয়ে ওঠে। বুক ভেঙে যায় সুখে-দুঃখে। তার বারবার মনে হয় মাটির ঘরে নাফিজা কি সুখী ছিল না? তার অসুখী মুখের ছায়া একদিনও দেখতে পায় নি গিয়াস। যদি দেখতে পেত তাহলে নাফিজাকে সে হাতছাড়া হতে দিত না। বুক ঠেলে উঠে আসা দুঃখ কুরেকুরে খায় তার হৃদয়, মন। ক্রমশ ভার হয়ে আসছে মাথা এবং শরীর। সকাল থেকে ঝামেলার অন্ত নেই। পঞ্চাশটা গাছের ঠিলি নামিয়ে সাতসকালে হাঁপসে উঠেছিল সে। তবু মনে একটা আশা ছিল। রসটুকু জ্বাল দিলে যা গুড় হবে তা ফুৎকারে উড়ে যাবে চড়া দামে। নলেন লাভ করেছে গিয়াস, গুড় বেচার টাকায় চার কাঠা জায়গা কিনেছে বিলের ধারে। কানপাশা গড়িয়ে দিয়েছে নাফিজাকে। বাহারী দেখে একটা শাড়ি কিনে দিয়েছে দেবগ্রামের হাট থেকে। সেই শাড়ি নাফিজাই পছন্দ করে কিনেছে রোববারের হাটে। সেদিনের সেই হাসিমাখা মুখখানা আজও তো মনে পড়ছে গিয়াসের। মন বুঝি সেই এঁটেল মাটির কাদার মত, হাত রাখলে তার চাপে ছাপ পড়ে যায়। দেবগ্রামের হাটে লাল মিঠা বরফ কিনে খেয়েছিল নাফিজা। এক মুখ হাসতে হাসতে বলেছিল, লাল বরফ খেতে আমার ভেষণ ভালো লাগে। জানো, ছোটবেলায় এই বরফ খাওয়ার জন্যি কত জেদ ধরতাম।
ছোটবেলার দিনগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে উঠত নাফিজার। ছোটবেলাটা তার বেশ দুঃখেই কেটেছে। এ সব খবর জানত গিয়াস। তাই সে চেষ্টা করত নাফিজাকে সুখে রাখার। তার সেই চেষ্টা ঠুনকো কাচের গ্লাসের মতো ভেঙে গেল! এই দুঃখের কথা সে কার কাছে বলবে? যে শুনবে সে-ই তো হাসবে মনে মনে। ভাববে–বউকে সুখ দিতে পারে নি, বউ পালাবে না তো কি ঘর আগলে বসে থাকবে? এখন আর কেউ ধ্বজভঙ্গ বরের মুখ চেয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে রাজি নয়। এখন সবার এক জোড়া করে পাখনা আছে। অসুবিধা কিংবা মনের মিল না হলে তারা উড়ে পালাবে। কে তাদের আটকে রাখবে?
শীতের হাওয়ার চাবুক এসে সপাং করে লেপটে যাচ্ছে গিয়াসের দুবলা-পাতলা শরীরে। তবু কোন তেজে ঘাম ফুটে বেরয় তার গতরময়। এ ঘাম রাগের ঘাম, পরাজয়ের ঘাম। নাফিজা সত্যি তাকে হারিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছে। সারা গায়ে ঢিঢি পড়েছে। পাড়ার দোকানটাতে আলোচনা হচ্ছিল, তার ছিটেফোঁটা কথা কানে এসেছে গিয়াসের। চাপা গলার কথাগুলো সাপের বিষের চেয়েও ভয়ংকর। এক হাতে তালি বাজে না। নিশ্চয়ই গিয়াসের কোনো দোষ আছে। মেয়েমানুষকে খেতে দাও কিন্তু গাদনটা নিয়ম করে দিতে হবে। শরীরের সুখ না পেলে ওরা সোনার সংসার ভেঙে পালিয়ে যাবে।
ছুটে আসা কানাকানি কথাগুলো গিয়াসের গায়ের নোম চাগিয়ে দেয়। সে যেন চোখ তুলে ধুলোর দিকে তাকাতে পারছেনা।নাফিজা যেন তার মুখ ধুলোয় ঠুসে ধরেছে।দম আটকেআসছেগিয়াসের। বিষ কথাগুলো বুঝি না শুনলে ভালো হত। কার মুখে সে আর হাত চাপা দেবে? লোক যা বলে সব সত্য নয়। গিয়াস নিজের দিকে তাকাল। তার শরীরে অক্ষমতার কোনো বীজ নেই। আর দশটা সবল সুস্থ পুরুষের মতো সে-ও। ফলে এই অপবাদ মন থেকে মেনে নিতে পারে না সে। বউটা মান-সম্মান নিয়ে গেল, সেই সঙ্গে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে গেল একটা মানুষকে। গ্রাম সমাজে এসব নিয়ে বোলান গান বাঁধা হবে। রসিয়ে-টরিয়ে গাইবে মানুষ। হাঁ-করে সব শুনতে হবে তাকে। কোনো প্রতিবাদ করা চলবে না। যারা বোলান গায় তারা যা বলবে সেটাই সত্যি।
সাইকেলটা ঠেলতে-ঠেলতে গিয়াস একটা চারা বটগাছের নীচে গিয়ে দাঁড়াল। তার মনে হল–গাছের কোনো স্ত্রী নেই। গাছকে কেউ কথা শোনায় না।
কপাল কুঁচকে গিয়াস পকেট থেকে বিড়ির ডিবাটা বের করে আনল। মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায় তবু মগজে ধোঁয়া ঢোকান দরকার। ধোঁয়ার মতো যদি হালকা ভাবতে পারে নিজেকে-এই ভেবে দেশলাই জ্বেলে বিড়ি ধরাল সে। এক বুক ধোঁয়া টেনে সে হালকা বোধ করতে চাইল নিজেকে। কিন্তু পাথর চাপা বুক ফুড়ে তো শীতল জল ওঠে না। শুধু দুঃখ বুজকুড়ি কাটে ফুসি কঁকড়ার শ্বাস নেবার মতো। এ সময় পৃথিবীতে সে একা হলে ভালো হত। তাকে কারোর কাছে কৈফিয়ৎ দিতে হত না। কেউ দেখতে পেত না তার ক্ষত-জ্বালা। আঁধার নেমে এলে সেই আঁধারে ভীতু ইঁদুরের মতো নিজেকে সিঁধিয়ে নিতে পারত সে। কিন্তু মানুষ যা চায় তা কি চট করে হয়?
নুর মহম্মদ লোহালক্কড়ের ব্যবসা করে। লোহা ভাঙা, পেতল ভাঙা, সংসারের ফেলে দেওয়া জিনিস নিয়ে তার যত কারবার। সাইকেলের পেছনে বাঁশের বড়ো ঝুড়িটায় সব সময় ঘটর মটর শব্দ। বিস্কুট, খেলনা কখনও বা নাগাদ পয়সা দিয়ে ভাঙা জিনিস পত্তর কজা করে সে। এ সব জিনিস শহরে চালান হয়। গলিয়ে আবার নতুন হয়ে ফেরত আসে গাঁয়ে। ব্যবসাটা মন্দ নয়। অনেকদিন ধরে এতেই মজে আছে সে।
