শিশির ভেজা ঘাসে অনাথের মতো শুয়ে আছে নাফিজার কাঁখের শিশু মেহের। মেহেরকে বুকে তুলে নিয়ে গিয়াস পাগলের মতো ডাকল, নাফিজা-আ-আ-আ। এ-না- ফিজা–আ-আ-আ। কুথা গেলি রে…।
বাঁশবাগানে প্রতিধ্বনি ফিরে এল গিয়াসের। পাগলের মতো গিয়াস মেহেরকে আঁকড়ে ধরেছে বুকে। আর ঠিক তখনই ওর ছোট্ট পকেট থেকে ঠিকরে পড়ল একটা হাত-চিঠি। তাতে লেখা আছে, বদলা নিলাম। আমার নাম মকবুল। বদলা নিতে আমার কোনোদিন ভুল হয় না। তোর সুন্দরী বউ নাফিজাকে নিয়ে ঘর বাঁধতে আমি কলকাতায় চললাম। আর এ গাঁয়ে আসবো নি। তোর ছেলেটাকে তোর কাছে দিয়ে গেলাম। ও কাছে থাকলে নাফিজা কোনোদিনও আমার হত না। টা-টা বাই-বাই!
আবছা আলোয় চিঠিটা পড়ছিল শুভ। গিয়াসের মুখের টু শব্দটিও নেই। সে পাথর হয়ে গেছে পাপ-হাওয়ায়।
.
৪৪.
রসের হাঁড়ি ফেলে নাফিজার খোঁজে গ্রামে ফিরে এল গিয়াস।
পুরনো সাইকেলটা যত জোরে চালান যায় তার চেয়েও জোরে চালাচ্ছিল সে। ভাবছিল দ্রুত গেলে বুঝি নাফিজার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। আর একবার দেখা হয়ে গেলে বুঝিয়ে শুনিয়ে ফিরিয়ে আনতে পারবে তাকে। ভুল তো মানুষেরই হয়। মানুষই আবার ভুল শুধরে নেয়। মকবুলের দ্বিচারিতায় ফাঁদে পা দিয়েছে নাফিজা। সেই কঠিন ফাঁদ কেটে তাকে মুক্ত করে আনতে হবে। কিছুটা আসার পরে গিয়াসের মনে হল হাসপাতালে গাছ ঝুড়তে না এলে তার জীবনে বুঝি এত দুর্যোগ নেমে আসত না। মকবুল সুযোগের অপেক্ষায় ঘুরঘুর করছিল শিয়ালের মতো। সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে সে। তার সাথে একবার মুখোমুখি হলে হিসাবটা বুঝে নিতে পারত সে। এক আকাশে দুটো সূর্য উঠত না, যাইহোক একটা এপার ওপার হয়ে যেত।
মেহের সাইকেলের ঝাঁকুনিতে ঝাঁকিয়ে উঠল। চিন্তার খেই হারিয়ে গেল গিয়াসের। বুক ভেঙে যাওয়া কষ্টে সে তার ছেলের মুখের দিকে তাকাল। অমনি হু-হু করে উঠল তার শূন্য হৃদয়। চোখের জল তাকে পরাস্ত করে নেমে এল চিবুক বেয়ে। মেহেরের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে গিয়াস বলল, আর একটু বস। এই তো এসে গেলাম…! কথাগুলো বলতে গিয়ে অস্বাভাবিক ভাবে কেঁপে উঠল তার ঠোঁট জোড়া। তেঁতুলতলা পেরিয়ে বাঁক নিলেই গিয়াসের মাটির ঘরখানা চোখে পড়ে। সাইকেল নিয়ে ধুলো পায়ে গিয়াস গিয়ে দাঁড়াল ঘরের সামনে। সবখানে নাফিজার স্মৃতিচিহ্ন ধুলোর রেণু হয়ে উড়ছে। কত কথা মনে পড়ছে গিয়াসের। বড়োই গরীব ঘরের মেয়ে ছিল নাফিজা। গিয়াসের আব্বা মেয়েটাকে একনজর দেখেই তার ছেলের সাথে শাদীর প্রস্তাব দেয়। নাফিজার বাবা ছিল না, মা-ই তার সর্বময় কী। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায় সে। পাকা কথা বলতে এসে গ্রামসাক্ষী খরিস সাপের ছোবলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল গিয়াসের বাবা। শোকে কাহিল হয়ে গেল সে। সেই দুঃসময়ে নাফিজাই তার পাশে ছিল।
ডুবে যাওয়া সংসারটাকে ধীরে ধীরে টেনে তুলছিল গিয়াস। নাফিজা হাসি মুখে বলত, আমি মরবনি গো, না মরা পর্যন্ত আমি তোমার পিছু ছাড়ব নি। চাম এঁটুলির মতো এটকে থাকব গায়ে। নাফিজা মিথ্যে কথা বলেছে। বনের পাখির মতো পোষ না মেনে সে উড়ে গিয়েছে। তাকে ফেরানো কি এ জীবনে সম্ভব হবে তার? শুনশান ঘরে ঢুকতে আর মন করে না গিয়াসের। বুক ঠেলে কান্না উঠে আসে। তাড়াহুড়োতে অনেক কিছুই নিতে ভুলে গিয়েছে নাফিজা। সেই সব স্মৃতিচিহ্ন আঁকড়ে গিয়াস আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না। দাওয়ার খুঁটি ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।
কান্নার আবেগ থামতে সময় লাগে বেশ কিছুটা। পাশের ঘরের বউটা এসে বলল, কার জন্য কাঁদছো? সে কোনদিনও তোমার ছিল না। সে আমার কাছে কথায়-কথায় বলেছে–তুমি নাকি টোড়া সাপ। খরিস সাপের খোঁজ পেলে সে চলে যাবে।
কথাগুলো যেন গরম তেলের মতো কানে ঢেলে দিচ্ছিল বউটা। অসহ্য লাগতে সে ব্যাকুল হয়ে বলল, যা হবার তা হয়েছে। ওর কথা বলে আর আমাকে কষ্ট দিও না। ওর মনের কথা আমি কিছু বুঝতাম না। ও ছিল বুনো পাখি। আমি ওকে বশে রাখতে পারিনি সেটা আমার দুর্বলতা।
বউটি সব শুনে দুম করে বলে বসল, মেহেরকে দেখবে কে? ওর কপালটা খারাপ। একটা কথা বলি শোন। দুটো ভাত ফুটিয়ে দেবার তো মানুষ দরকার। আমার বুন্ আছে। বলো তো তার সাথে কথা পাড়ি।
–তোবা তোবা। জিভ কাটে গিয়াস, বিয়ে-শাদী মানুষের কবার হয়? যে পারে পারুক। আমি আর ওসব পারব না!
-তাহলে মেহেরকে দেখবে কে?
–ওর জন্য আল্লা আছে। অভিমানে গলা বুজে এল গিয়াসের, আমার কথা বাদ দাও। দুধের শিশুকে ফেলে কোনো মা যে এভাবে পালিয়ে যায় আমার তা জানা ছিল না।
-যে যুগের যা ধর্ম! বউটা ফ্যাকাসে হাসল। তারপর করুণ দৃষ্টিতে গিয়াসের দিকে তাকিয়ে সে চলে গেল তার নিজের ঘরে।
একটা টিপ তালা দরজার আংটায় লাগাল গিয়াস। কঁকা ঘরে থাকলে দুঃখ পাথরের মতো চেপে বসবে বুকে। এর থেকে নিস্তার পাওয়া দরকার। সে ভাবল মেহেরকে তার বোনের ঘরে রেখে কাজে ফিরে যাবে।
না খাটলে তার-ই বা পেটের ভাতের যোগাড় হবে কী ভাবে? মেহেরকে পাশের গ্রামে বোনের বাড়িতে রেখে ফিরে এল গিয়াস। ওখানে ওর কোনো কষ্ট হবে না। মায়ের যত্ন না পেলেও ফুপুর যত্ন পাবে। আর সময় তো কারোর জন্য থেমে থাকবে না। দেখতে দেখতে মেহের একদিন বড় হবে। ভুলে যাবে তার মায়ের কথা। শুধু মেহের নয়, গিয়াসের স্মৃতিও দিন বদলের সাথে সাথে ঝাপসা হয়ে আসবে। সময় কাকে কোথায় টেনে নিয়ে দাঁড় করাবে সে নিজেও জানে না।
