ফ্যাট-ফ্যাট শব্দে হ্যাজকগুলো লাঠি দিয়ে ভেঙে দিচ্ছে হাবুল চোরের অন্য সাকরেদ। ভাঙা কাচ গেঁথে যাচ্ছে মাটিতে।
বুকে হাত চেপে অসহায় ভাবে মা বুড়োমাকে ডাকে রঘুনাথ।
রক্ষা করো গো, মা বুড়োমা; কমলার যেন কোনো ক্ষতি না হয়। এর কিছু হলে আমি মরে যাব। আমি পাগল হয়ে যাব।
বরবেশী বেথুয়ার ছেলেটাকে থামের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে হাবুল চোর। তার মাথায় খাঁড়ার বাঁট ঠুকে দিয়ে গলার সোনার হারটা ছিনিয়ে নিল সে। গলগল করে রক্তের ধারা নামছে মুখ বেয়ে। কিছুক্ষণ পরে সংজ্ঞা হারাল বর।
ততক্ষণে জেগে গিয়েছে পুরো পাড়া। কাজ শেষ করে ফিরে যাওয়ার সময় হাবুল চোর রঘুর হাত ধরে টানল, পালা। পাড়া জেগে গিয়েছে। পালা! ধরা পড়ে গেলে ছাল ছাড়িয়ে হাতে দেবে।
পালাতে গিয়ে রঘুনাথ মুখ থুবড়ে পড়ল পড়ে থাকা গাছের গুঁড়িতে হুমড়ি খেয়ে। অন্ধকারে কাঠ-ব্যাঙের মতো ঠিকরে পড়ল সে। মাটিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে সে দেখল তাকে লাঠি হাতে ঘিরে দাঁড়িয়েছে জনা দশেক আগুন চোখের মানুষ। ফাঁক গলে পালাতে গিয়ে লাঠির আঘাতে আবার হুমড়ে পড়ল সে। আর তখনই লাঠির বৃষ্টি শুরু হল তার শরীরে।
রঘুনাথের আর্ত চিৎকারে বাতাস ভরে যেতেই ছুটে এল কমলা। আঁচলে মুখ ঢেকে সে কাতর হয়ে বলল, ওকে মেরো না গো, ও নির্দোষ। ও চোর নয়। ও ধাওড়াপাড়ার রঘু। আমি ওকে চিনি গো।
কেউ তার কথা শুনল না।
লাঠির ঘায়ে মাথা ফাটিয়ে দিল রঘুনাথের। তাতেও ক্রোধ শান্ত হল না জনতার। টানতে-টানতে তাকে নিয়ে যাওয়া হল উঠোনে। রঘুনাথের পা কাঁচা ডালের মতো মড়াৎ করে ভেঙে দিল একজন। গাল দিয়ে বলল, এই বয়স থেকে চুরির করার মজা দেখ। এমন করে দিলাম-সারাজীবন মনে থাকবে তোর। আর কোনোদিন কারোর ঘরে ঢুকতে সাহস হবে না।
মুচ্ছিত, রক্তাক্ত রঘুনাথ উঠোনে শুয়ে থাকল থানা থেকে পুলিশ না আসা পর্যন্ত। তার শাস পড়ছিল ধীরে ধীরে। কোনোমতে চোখ খুলে সে দেখল কমলা শ্বশুরবাড়ি চলে যাচ্ছে ভ্যান চেপে। দু-চোখ ভর্তি জল। সে যেন মমতামাখা দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে রঘুর রক্তমাখা শরীরের দিকে। অনুশোচনায় পুড়ে যাচ্ছিল কমলার হৃদয়। বারবার দোষীর কাঠগোড়ায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে সে ভাবছিল আজ তার জন্য রঘুর এই দশা হল। শুধুমাত্র তার জন্য রঘুনাথ আজ চোর সেজে ধরা পড়ে গেল! এই পাপবোধ থেকে কবে যে মুক্তি ঘটবে কমলার সে নিজেও জানে না।
দৃষ্টির বাইরে গিয়েও রঘুনাথ তার শরীর জুড়ে রয়ে গেল।
এক শীতের সকালে শুভকে দেখে গিয়াস বাঁক বোঝাই রসের ঠিলি নামিয়ে শুধাল, তোমার মিতের খবর কী গো? ছেলেটার পেটের ভেতর এত কুবুদ্ধি ছিল কে জানত। আমি তো অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। না হলে আমার কপালে যে কী ছিল কে জানত।
জিরেন-কাট রস খেতে এসে রসের মজাটাই হারিয়ে ফেলেছে শুভ। এর পরে রঘুনাথের সাথে মেলামেশা করাটা তার পক্ষে শোভনীয় হবে কী না ভেবে ভেবে অস্থির হচ্ছিল সে।
গিয়াস তাকে বড়ো গাছের আধ-ঠিলি রস দিয়ে বলল, একেবারে চিনির মতো মিঠা ঠ্যাঙা গাছের রস। খেয়ে বড়ো মজা পাবা।
শুভকে একা দেখে গিয়াস শুধোল, তুমি আজ একা এসেচ, তোমার বন্ধু কোথায়? শুভ বলল, ও ভোরে ঘুম থেকে উঠতে পারে নি। যা শীত পড়ছে কদিন থেকে বাইরে বেরলে কনকন করে গা হাত পা। তখনই যেন শীত এসে জড়িয়ে ধরল ওকে।
-তা যা বলেচ। গিয়াস শীতে ঠকঠক করে কাঁপছিল। এক সময় বাঁকটা কাঁধের উপর উঠিয়ে নিয়ে সে বলল, গুড়শালে যাবা নাকি? এখন চুলা ধরাব। গা-গতর গরম করে ঘর যেওক্ষণ—মজা পাবে।
চারিদিকে ছেঁড়া মশারির মতো উড়ছিল কুয়াশা। গুঁড়িগুঁড়ি কুয়াশা-দানায় বাতাস গর্ভবতী মেয়ের মতো গা-গতরে ভারী হয়ে আছে। সামান্য দূরের কোনো কিছুই দেখা যায় না স্পষ্ট। এত কুয়াশার ভেতর শীত ডিম ছেড়েছে সহস্র।
হাঁটতে হাঁটতে গিয়াস খুশিতে টগবগিয়ে বলল, যত শীত পড়বে পাটালিও জমবে ভালো। রস কাচের মতো দেখতে হলে পাটালিও বড়ো ঘরের বউয়ের মতো খোলতাই রঙ বুড়ে। শীত পড়ুক, আরো শীত পড়ুক। জমিয়ে শীত না পড়লে গাছির যে মাথায় হাত।
এ সময় গিয়াসকে বড়ো স্বার্থপর মনে হল শুভর। এত হাজার হাজার মানুষ যখন শীতে কষ্ট পাচ্ছে তখন তীব্র হাড়-কাঁপানো শীতের প্রার্থনায় গিয়াসের এই আকুলতা কানে বেঁধে বই কি! তবু নিরুত্তর শুভ গিয়াসের পাশাপাশি হাঁটছিল। রস বোরার কাজ মেহনতের কাজ। এ কাজে শরীর মাটি হয়, গাদ তোলা রসের মতো ঘোলাটে হয় চোখ। রাতের ঘুম যায়, দিনের স্বস্তি হারায়। এত কিছু ত্যাগ স্বীকার করে যে মানুষটা হাসপাতালে খেজুর-ঝোপে পড়ে আছে তাকে কোনোমতে এড়িয়ে যেতে পারে না শুভ। এই লোকটার সঙ্গে অবনীর বড় ভাব। দুপুরে সময় পেলেই অবনী চলে আসে গিয়াসের ডেরায়।
কুয়াশা ঢাকা পথ তবু হাঁটতে কোনো কষ্ট হচ্ছিল না গিয়াসের। রসের কলসী নিয়ে হাঁটতে তার কোনো কালেই কষ্ট হয় না। এ যেন খেজুরের রস নয়, তার রাতজাগা শরীরের পরিশ্রমের কষ।
বাঁক বয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিল গিয়াস। হঠাৎ চাপ বাঁধা কুয়াশার ভেতর তার কানে ভেসে এল শিশুর চিৎকার। ফাঁকা মাঠেকাদের বাচ্চা কাঁদে গো?মা বুঝি জলকাজ সারতে গিয়েছে ঝোপে-ঝাড়ে, কাঁখের বাচ্চা বসিয়ে গেছে মাঠে। তাই অভিমানে গলা ফাড়িয়ে কাঁদছে দুধের শিশু। আজকালকার মা গুলো যেন সব কেমন। বড়ো বেশি দয়া-মায়াহীন। কনকনে শীত হাওয়ায় কান্নার তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল ক্রমশ। থাকতে না পেরে বাঁক নামিয়ে গিয়াস চলে গেল বাচ্চাটার কাছে। ভূত দেখার মতো চমকে উঠল সে।
