প্রভাত মজা করে বলল, বিড়িকে বিড়ি বললে অপমান করা হয় দাদা। লাখুরিয়া গিয়ে শুনে এলাম–ওরা বিড়ির এট্টা আলাদা নাম দিয়েছে। শুনবা? মাজায় দড়ি, খাকি চেহারা। মেজাজ কড়া। সাদা কাঠি ওর কাছে পাত্তা পায় না। বিড়ি হলে গিয়ে গাঁ-ঘরের বুনো বাউরির বিটি, আর সাদা কাঠি মানে সিগারেট হলো গিয়ে বাবুঘরের ঝিউড়ি, দেখতে ভালো, কিন্তু খাটতে পারে না। আর স্বাদেও মন ভরে না। নেশা হওয়া তো দূরে থাক নেশা চটকে যায়। তোমরা এ ব্যাপারে কি বলো হে?
নিমতলার মাচায় গবেষণার শেষ নেই। এ বছর ফলন মেন হবে, কার মেয়ে কার সাথে পালাল, পেট ধসাল সব। তবু এই নিমতলা সূর্যাক্ষর বুকের মধ্যে কাঁপুনি তোলে। এখান দিয়ে যাওয়া-আসার সময় ওর চোখ চলে যায় পুরনো, ছিরিছাঁদ হীন, নোনাধরা ঘরখানার দিকে। ওই হুমড়ে পড়া জরাজীর্ণ পাকা ঘরটাকে তার মনে হয় তাজমহলের চেয়েও সুন্দর। ওখানে যে দ্বীপী থাকে। দ্বীপীর কথা রঘুকে বলা হয়নি তার। সেই সুযোগও আসে নি। তবে সময় করে সব বলতে হবে ওকে।
নিমতলার বাঁক পেরিয়ে এলে সূর্যাক্ষদের পাকা দোতলা বাড়িটা চোখে পড়বে। দোতলা অবধি লতিয়ে উঠেছে মাধবীলতার গাছ, থোকা থোকা ফুল বছরের সব সময় ফুটে থাকে, বিশেষ করে রাতের দিকে সুগন্ধ উজাড় করে ঢেলে দেয়, ঘরের পরিবেশ পুরোপুরি পাল্টে যায়, মনের অন্তঃস্থলে ভালোলাগার সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো টান টান হয়ে ওঠে। মাধবীলতার গাছটা ছাড়া ওদের ঘরের সামনের বাগানটায় শোভা পাচ্ছে হাসনুহানা গাছটা। হাসনুহানার সবুজ সংসারটা বেশ গোছানো। কাতার দড়ি দিয়ে ছড়িয়ে যাওয়া ডালপালাকে বেঁধে দিয়েছে সূর্যাক্ষ, বেঁধে না দিলে ওরা মাটিতে লুটায়, যেন ওদের কেউ দেখার নেই এ সংসারে। গরমের সময় গাছটাতে কুঁড়ি ভরে যায়, রাতে ফুলগুলো ওদের ছোট্ট শরীর দেখিয়ে হেসে ওঠে, অমন সাদা হাসি ফুল আর শিশু ছাড়া আর কেউ হাসতে পারে না। হাসনুহানার উগ্র সুবাস বাতাসকে মাতাল করে তোলে। দ্বীপী বেড়াতে এলে গাছটার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে, অমন একাগ্র দৃষ্টিতে ও কী যে দেখে তা অনুমান করা যায় না। সূর্যাক্ষ কোনো প্রশ্ন করলে নিরুত্তর হাসে। দ্বীপীর এই হাসি সূর্যাক্ষকে পাগল করে দেয়। সে দ্বীপীর কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওর শরীর থেকে হাসনুহানার সুবাস চুরি করে নেয়। টোকা মেরে বলে, গাছটা তোর পছন্দ? নিবি?
দ্বীপীর ডাগর ভাসা চোখের দৃষ্টি থেকে হাসির রেশ মেলায় না, তুই আমাকে এই গাছটার চারা এনে দিবি, কোথায় পাবি?
-সে যেখানেই পাই, তুই নিবি কিনা বল?
–নেব তো বললাম।
-রোজ জল দিতে হবে কিন্তু। সূর্যাক্ষর কণ্ঠস্বর নিচু হয়ে এল, আর একটা কথা। গাছটা আমরা দুজনে মিলে লাগাব। কি রাজি আছিস তো?
-হঠাৎ এমন শখ? দ্বীপী তরল করে হাসল।
-না, তেমন কিছু নয়। মনে হল তাই বললাম। অবশ্য রাজি হওয়া না হওয়া সব তোর উপর নির্ভর করছে। এ তো জোর করার জিনিস নয়। সূর্যাক্ষ কথাগুলো যেন দ্বীপীকে নয়, নিজেকে শোনাল।
দ্বীপী অবাক হল না, সে স্বতঃস্ফূর্ত স্বরে বলল, এতে রাজি না হওয়ার কি আছে। সমরবাবু আমাদের গাছ লাগাতে বলেছেন। গাছ লাগালে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা পাবে। ছায়ায় ভরে যাবে আমাদের গ্রাম।
সমরবাবু যে গাছ লাগানোর কথা বলেছেন সে তো ফুলগাছ নয়। তাছাড়া ফুলগাছের আয়ু কম। একটা হাসনুহানা গাছ আর কত বছর বাঁচে। সূর্যাক্ষর এ সম্বন্ধে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করতে সংকোচ হয়, মা যদি পাল্টা কোনো প্রশ্ন করে।
একটা হ্যারিকেন টানা বারান্দার মাঝখানে বসানো থাকে। হলদেটে আলো ঢেকে দেয় বারান্দার অন্ধকার। এদিকটায় এখনো বিদ্যুৎ আসেনি। আগামী বিশ বছরে আসবে কিনা সন্দেহ আছে কপোতাক্ষ’র। এ বিষয়ে গ্রামের মানুষকে সচেতন করা দরকার। গম পেষাতে এখানকার মানুষকে যেতে হয় লাখুরিয়া কালীগঞ্জ। ওখানে ডায়নোমো চলে, গলগল ধোঁয়া আর বিকট ভট ভট শব্দ। সেই ডাইনোমো আটাকলের মেসিন ঘোরায়, গম পিষে গিয়ে সাদা আটা বাতাসে ওড়ে। সের প্রতি পেষাই খরচ গুণে নেয় চাকির মালিক।
সূর্যাক্ষ বাইরে দাঁড়িয়ে মা’ বলে ডাকতেই ভেতর থেকে সাড়া দিলেন মীনাক্ষী। ব্যস্ত পায়ে তিনি দরজা খুলে শুধোলেন, এত দেরি হলো যে। আমি তো ভাবছিলাম কি হল আবার।
-কী আবার হবে, রঘুর জন্য দেরি হয়ে গেল। সূর্যাক্ষ বলল, ওর আসার কোনো ঠিক ছিল না। বল খেলার পর ও বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। আমি ওর মাকে বলে জোর করে নিয়ে এলাম।
মীনাক্ষী হ্যারিকেনের বাতিটা উসকে দিলেন, সামান্য উঁচুতে হ্যারিকেনটা উঠিয়ে ধরে তিনি রঘুর দিকে নিবিষ্ট চোখে তাকালেন, ঘরে এসো বাবা। সূর্যের মুখে আমি তোমার অনেক গল্প শুনেছি। আজ আসতে পেরেছ, বেশ ভালো হল। আসা-যাওয়া না থাকলে সম্পর্ক স্থায়ী হয় না।
রঘুনাথ কি বলবে ভাবছিল, তার ভেতরে অস্বস্তির আস্তরণটা ক্রমশ মোটা হচ্ছিল। এমন পরিবেশে আসা তার জীবনে এই প্রথম। এরা কি জানে না তার বুনোপাড়ায় ঘর, ছোট জাত বলে গ্রামের অনেকেই তাদের ঘৃণার চোখে দেখে। সব জেনে শুনেও এমন আদর আপ্যায়ন তাকে বিস্মিত করল। ঘটনাটা সে ঘরে গিয়ে চুনারামকে বললে সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইবে না। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে মোচ নাচাবে, ওসব হল গিয়ে বাবু ভদ্দর লোকদের ভান। ও ফাঁদে পা দিস নে দাদুরে, ভুসভুসিয়ে সার গাদার মতো তলিয়ে যাবি, শ্বাস নিতে পারবি নে। এই অবিশ্বাস এক দিনের নয়, বহু জন্মের। এ এক অভিশাপ।
