-চলো পালাই। রঘুনাথ কমলার হাত ধরে টানল।
-কোথায়?
–গাঙ পেরিয়ে রাঢ়ের দিকে চলে যাব। রঘুনাথ উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছিল।
কমলা সতর্ক গলায় বলল, তোমার তো ফুটো কড়িও নেই। আমাকে খাওয়াবে কি? চুপসে গেল রঘু। পরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, খাওয়ার চিন্তা তোমার নয়, আমার।
কমলার ভালো লাগল রঘুনাথকে। কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলল, তাহলে বিয়ের রাতে এসো। বেসপতিবার আমার বিয়ে। খিড়কি দরজা খোলা থাকবে। এসো। আমি তোমার পথ চেয়ে থাকব।
উৎসাহিত রঘু পাগল হাওয়ার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল কমলার শরীরে।
.
সুখ-স্বপ্ন অলকলতার মূল। চোখ মুদে আবেশে হারিয়ে যেতে থাকে রঘু। রাঢ় কোন পথে যাবে সব ঠিক করা আছে। মাত্র তো দুটো নদী, তারপর তো রাঢ় দেশের গাঁ-গঞ্জ। সেখানে মন না ধরলে তারা বর্ধমান শহরে পালিয়ে যাবে। কমলা বুনোদের বউ হয়ে গেলে তাকে আর সুফল ওঝা ঘরে নেবে না। মেয়ে হল তো কী হল? দেশ-সমাজ আছে না। টি-টি পড়ে যাবে চতুর্দিকে। যদি থানা-পুলিশ করে? ভয়ে রক্ত চলকে ওঠে রঘুনাথের। একা একা ঘামতে থাকে সে।
রাত গাঢ় হতেই ভেসে আসে ঝিঁঝির ডাক। মরাগাঙ উগলে দেয় শীত হাওয়া। বাঁধের উপর কুকুর ডাকতে ডাকতে চলে যায় লাখুরিয়ার দিকে। তার ডাক কান্নার মতো কানে বাজে রঘুনাথের। চোখের পাতা নেচে ওঠে ভয়ে।
ঘরছাড়ার সময় হয়ে এল। ঘুমন্ত মাকে দূর থেকে দেখে নিল সে। হঠাৎ করে শুভ সূর্য আর সবুজের মুখটা মনে পড়ে গেল তার। ওরা সত্যিকারের ভালোবাসা দিয়েছে তাকে। এত ভালোবাসা যে মন ভিজে যায়। হাবুল চোর তাকে অভাবের খাদ থেকে টেনে তুলেছে। ঐ লোকটার কাছে সে কৃতজ্ঞ। হাবুল চোর তার জীবনের ধ্রুবতারা। তাকে অশ্রদ্ধা বা অমান্য করা যাবে না কোনদিন।
হাওয়া শনশনিয়ে চলে যায় গাছের পাতা কাঁপিয়ে। শুধু পাতা কাঁপে না, কেঁপে ওঠে রঘুর গায়ের রক্ত। কমলাকে উদ্ধার করতে হবে তাকে। শেষ লগ্নে মালাবদল হবে ওদের। তার আগে যাওয়া দরকার।
রঘুনাথ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। যে অন্ধকার তার প্রিয় সেই অন্ধকারকে ভীষণ ভয় পেল সে। ছমছমিয়ে উঠল গা-গতর। কাচ-টিপ্পির মতো চোখে দ্যুতি ছড়িয়ে বসে আছে কুলগাছের পেঁচাটা। রোজই বসে। আজ অন্যরকম মনে হচ্ছে রঘুর।
পা টিপে টিপে বাঁধের গোড়ায় আসতেই রঘুনাথ দেখল সাইকেল থেকে নামল হাবুল চোর। সাইকেলটা খেজুর গাছে হেলান দিয়ে হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেল বাঁধের নীচে। ফিসফিসিয়ে বলল, আজ তোদের গায়ে কাজ সারতে হবে। সুফল ওঝার মেয়ের বিয়ে। আমার পুরনা শত্রু। আজ মওকা। এ সুযোগ ছাড়লে হবে না।
রঘুনাথ থমথমে চোখে তাকাল। ঠোক গিলে বলল, কমলার বিয়ে, আজ ছেড়ে দাও ওস্তাদ। মেয়ের বিয়ে বলে কথা। আজকের দিনটা বাদ দাও।
-শরীরে এত দয়া-মায়া থাকলে এ বিদ্যের ধার কমে যায়। রঘুনাথকে ধমকে উঠল হাবুল। মুখ নীচু করে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে রঘুনাথ। এ কী বিপদ মাথার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার ঠোঁটের উপর চুলবুল করল কত কথা। কিন্তু হাবুল চোরের ব্যক্তিত্বের কাছে সে সব কথা পানসে হয়ে গেল নিমেষে। অন্ধকারে তার রক্তহীন মুখের ছবি দেখতে পেল না হাবুল চোর। শুধু হাত ধরে টানল, চল, রাত বাড়ছে। আর দেরী করা যাবে না। সাথে আরও তিনজন আছে। ওরা মোকামপাড়ার কাছে অপেক্ষা করছে। ওদের নিয়ে বিলের পাড় ধরে চলে যাব।
রঘুনাথের গা-হাত-পা ঝনঝনিয়ে উঠছে রাগে। তবু তার মুখে কোনো প্রতিবাদের ভাষা নেই। শুধু মনের ভেতর দলা পাকিয়ে উঠছে ভয়। কমলা যদি তাকে দেখে ফেলে হ্যাজাকের আলোয় চুরি করতে তাহলে দিনের আলোয় কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াবে সে। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে রঘুনাথ ভাবল–মনের কথা সব খোলসা করে বলে দিতে হাবুল চোরকে। শেষ পর্যন্ত ভয়ে ঠোঁট দিয়ে কোনো শব্দ বেরল না তার। হাবুল চোরের স্বভাব সে জানে। মতের মিল না হলে সে পথের কাঁটা সরিয়ে দেয়। তার শরীরে ক্ষমা কম।
কমলাদের বাড়ির পেছনের ঝোপটাতে ওরা লুকিয়ে থাকল পাঁচজন। পুরোহিতের মন্ত্র পড়া শেষ। সিঁদুর দান মালাবদল সাতপাকে ঘোরা সব শেষ হল একে একে।
খোলা খিড়কি দরজা দিয়ে সবার আগে দা-হাতে ঢুকে এল রঘুনাথ। মুখে সে তেল-কালি মেখে নিয়েছে যাতে তোক চিনতে না পারে।
মাঝের ঘরে ঘুমে ঢুলছিল কমলা। কী সুন্দর সেজেছে সে! জ্বলজ্বল করছে সিথির সিঁদুর। লাল বেনারসীতে কমলাকে যেন চিনতেই পারে না রঘুনাথ। হাতের দা-আড়াল করে সে থামের পেছনে দাঁড়ায়। হাবুল চোর চাপা গলায় ধমকায়, হাঁ-করে মেয়েছেলে দেখলে হবে? যা হাতে টাইম নেই। যা নেবার সব কেড়ে নে। গায়ে যা দেখছিস্ সব সোনার। আমি নিজের চোখে স্যাকরা দোকান থেকে নিতে দেখেছি।
পায়ে যেন পেরেক পোঁতা, রঘুনাথ নড়তে-চড়তে পারে না। কাঁপা কাঁপা গলায় সে শুধু বলে, ওস্তাদ, আমার ভেষণ ভয় করছে। এ কাজ আমার দ্বারা হবে নি। কমলা আমারে দেখলে চিনে ফেলবে। এক গাঁয়ের মেয়ে তো! ওর চোখকে ফাঁকি দেওয়া সহজ হবে না।
দরকার হলে বুকে দাওলি ঢুকিয়ে দিবি। হুকুম করল হাবুল চোর। তবু থাম ঘেঁষে দাঁড়াল রঘুনাথ।
হাবুল চোর আর কাল বিলম্ব না করে একটা মোক্ষম খিস্তি আউড়ে এক ছুটে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল কমলার কাছে, হাতের খাড়াটা মাথার কাছে ঠেকিয়ে বলল, বাঁচতে চাস তো সব খুলে দে। তাড়াতাড়ি কর। না হলে দু টুকরো করে চলে যাব। রক্তগঙ্গা বইয়ে দেব। কারোর বাপেরও সাধ্য নেই যে বাধা দেবে।
