-তোর সাহায্যের আমার দরকার নেই। অভিমানে কণ্ঠস্বর বুজে এল শুভর, তোকে আমি খুব ভালো ছেলে বলে জানতাম। এখন দেখছি তুই পুরোপুরি পাল্টে গেছিস! হাবুল চোরের সঙ্গে তোর এখন ওঠা-বসা। তুই এখন আমাদের খোঁজ কেন নিবি?
চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো মুখ করে তাকাল রঘুনাথ, ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বলল, হাবুল চোরকে তুই চিনিস? সে আমার গুরু হয়। সে আমার চোখে আলো জ্বেলে দিয়েছে। তার জন্যি আজ আমার জীবনটা বড়োগাঙের চেয়েও ঢেউ ভরা।
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল শুভ, রঘুনাথ তার হাত ধরে ঝাঁকিয়ে দিল, আমি আর অভাবকে ভয় পাইনে। বাবাকে সদরে নিয়ে গিয়ে বড়ো ডাক্তার দেখিয়ে এনেছি। পয়সা থাকলে ওষুধ-ডাক্তার সব হাতের মুঠোয় এসে যায়। বুঝলি?
-তুই কি লটারীর টিকিট পেয়েছিস? শুভর প্রশ্নে রঘুনাথ হা-হা করে হাসল, নেশায় চোখ কুঁচকে বলল, লটারী ছাড়া কি ভাগ্য ফেরানো যায় না? মানুষ কর্মের দ্বারা তার ভাগ্যকে বদলে দিতে পারে। আমি এখন যে কাজ করি, সেই কাজে ঝুঁকি আছে ঠিকই কিন্তু টাকাও আছে মুঠো মুঠো। যেখানে টাকা আছে, সেখানে এই রঘু আচে।
শুভ অবাক হয়ে শুনল রঘুনাথের কথাগুলো, তারপর তীক্ষ্ণ গলায় বলল, তুই কি কাজ করিস আমাকে বলবি কি?
-তা আমি আজ তোকে বলব না। সময় হলে একদিন বলব।
হাঁটতে হাঁটতে ওরা বাজারে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়াল। রঘুনাথ পকেটে হাত দিয়ে বলল, বাড়ির জন্য মিষ্টি কিনে দিচ্ছি তুই নিয়ে যা।
-তোর মিষ্টি আমি ছোঁব না। শুভ শক্ত গলায় বলল।
রঘুনাথ হাসল, আমি তোর মিতে হই না? মিতে মানে বন্ধু। বন্ধুর সাথে কেউ অমন করে?
-মিতে যখন, তখন মদ খেলি কেন? বল, তোকে বলতেই হবে। শুভ জেদ করল।
রঘুনাথ অসহায় চোখ করে তাকাল, মদ না খেলে শরীরে তাগদ আসে না। আমার বাপ-ঠাকুর্দা খায়। আমিও খাই। আমার গুরুও খায়।
–দাঁড়া, তোর শুরুর সাথে একবার দেখা যোক তারপর তাকেই শুধাব–মদ খাওয়ার আসল কারণটা কি? শুভ রীতিমত বিরক্ত, এত পয়সা তুই কোথায় পাস? কে তোকে মদ খাওয়ার টাকা দেয়? তোর এই হঠাৎ বদলে যাওয়া আমার খুব অবাক লাগছে।
–টাকা আবার কেউ দেয় নাকি, টাকা আয় করতে হয়। রঘুনাথ ঠোঁট টিপে হেসে উঠল। ওর কথায় আরও আশ্চর্য হল শুভ। দু-দিন আগেও যাব ভাত জুটত না, সে এখন মদের নেশায় পাগল। কী যাদুতে এমনটা সম্ভব হল শুভ বুঝতে পারল না কিছুতেই।
মিষ্টি খাবি না তো? রঘুনাথের জিজ্ঞাসায় কোনো সাড়া দিল না শুভ। অভিমানে তার ভেতরটা গুমরে গুমরে উঠছে। মনে মনে সে ভাবল রঘুর সাথে এসময় দেখা না হলে ভালো হত। রঘু তার প্রিয় বন্ধু। তার এই অধঃপতনে মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল।
শুভর ঘাড়টা ঝাঁকিয়ে দিয়ে রঘুনাথ আর দাঁড়াল না। কমলা এসময় আখের খেতে আসবে। কী সব কথা আছে। সুফল ওঝার মেয়েটা ঘাসফুলের চাইতেও নরম। ওর মুখের দিকে তাকালে রঘুর মাথাটা কেমন ঘুরে যায়, বুকের ভেতর ভরা গাঙ্গের জোয়ার আসে। একটা টান অনুভব করে সে, আর সেই টানের জন্য সে পাগলের মতো ছুটতে থাকে বাঁধ ধরে।
লাখুরিয়া হাই স্কুলের কাছে এসে দম নেয় রঘুনাথ। শুভর ব্যবহারে সে দুঃখ পেয়েছে। এমন দুঃখ তার মা-ও পায়। মদ খেলে মানুষ কেন দুঃখ পায়? দুধ খাওয়া আর মদ খাওয়া তো একই কথা। দুটোতেই পেট ভরে। একটাতে গন্ধ নেই, অন্যটায় গন্ধ আছে। দুটোই তরল।
হঠাৎ হুঁশ এল রঘুর। এ কী ভাবছে সে? এমন ভাবনার কি কোনো দরকার আছে এখন? এখন কমলার কাঁপা চোখের তারা তাকে টানছে আগুনের দিকে ধেয়ে যাওয়া পোকার মতো। রঘুর গোঁফের নিচে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠছে উত্তেজনায়। তার হাঁপ ধরা ভাবটা আরও বেড়ে যায়। পাগলের মতো ছুটতে গেলে পায়ে পা বেঁধে পড়ে যায় সে। হাতে পায়ের ধুলো ঝেড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। সুফল ওঝার মেয়ের আঘো কথাগুলো একতারার সুরের মতো বাজে। জুরানপুরের মেলায় কমলার হাত ধরেছিল সে। ভিড়ে হাত ছাড়িয়ে নেয়নি কমলা। ঘেমো হাতটা শরীরের শিশিরে ভিজে যাচ্ছিল হঠাৎ। সেদিন থেকে রঘুর মনে হয়েছে কমলা আর কারোর নয় তার একার। সময় সুযোগ মতো কমলাকে সে বউ সাজিয়ে ঘরে তুলবে।
আখখেতের আলো আঁধারী পরিবেশে স্বপ্নের মতো ছোট ছোট ছায়া দৌড় ঝাঁপ খেলছিল। দুপুরের নির্জনতায় একটা কাক-পক্ষীও নেই চারপাশে। ঘন জমাট বাঁধা আখখেতের ভেতর ঢুকে গিয়ে রঘুনাথ ডাকল, কমলা।
শুকনো আখ পাতা মাড়ানোর শব্দ হল, যেন কোনো ভীতু কিশোরী হরিণী সতর্ক পায়ে এগিয়ে এল সামনে। পরনে তার সবুজ রঙের ডুরে শাড়ি, পিঠের উপর আছাড় খেয়ে পড়েছে ছাড়া চুল। টানা মোটা ভুরুর নীচে চোখ দুটো তার ভীষণ চকচকে। কমলার গায়ের রঙ কাঁঠালপাতার মতো। ষোল বছরের শরীরে কেউ যেন তেলের শিশি ঢেলে দিয়েছে এমন দুত্যিময় আভা। ঘোলাটে চোখে কম্পমান সেই সুষনিপাতা দেহের দিকে হা-করে চেয়েছিল রঘুনাথ। সুফল ওঝার মেয়েকে সে তো এই প্রথম দেখছে না। যতবার দেখে ততবার মনে হয় কলাগাছের নতুন পাতা, জোর করলে ছিঁড়ে ফারফাই হয়ে যাবে। এত সাহসী রঘুনাথের বুক কেঁপে গেল ভয়ে। কী ভাবে কথা শুরু করবে বুঝে পেল না সে। কমলাও নিথর, নীরব। স্তব্ধা ঢেউহীন দিঘি।
এক সময় হঠাৎ মাটিতে ভর দিয়ে উঠে বসা কমলা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল রঘুনাথকে জড়িয়ে, কাল বাদে পরশু আমার বিয়ে গো। ছেলের বেথুয়াতে ভূষিমালের দোকান আছে। বড়োলোক। তুমি কি তার সাথে পারবে গো?
