–এক বস্তা কাঁসা-পেতল কোথায় নিয়ে গিয়ে রাখবা গো? ভয়ে চোখ ছোট হয়ে আসে রঘুনাথের। হাবুল চোর ভ্রূক্ষেপহীন, ঝোপে-ঝাড়ে রাখার কি জো আছে বাপ! আগে ঝোপে-ঝাড়ে রাখতাম। এখন পুকুরে ডুবিয়ে রাখি। পুলিশের বাবাও টের পাবে না। সময়-সুযোগ মতো মাল বেচে দিই। ঝামেলা মিটে যায়। তা তোর কি একটা কাঁসার গেলাস লাগবে জল খাওয়ার জন্য? লাগে তো বল। বোরা খুলে দিয়ে দিচ্চি। ওই অত শীতে কুলকুল করে ঘামতে থাকে রঘুনাথ। গলা শুকিয়ে যায় ভয়ে।
রঘুনাথের হাতটা শক্তভাবে চেপে ধরে হাবুল চোর বলে, ছোটবেলায় তোর মতন আমার গা-গতর ছিল। বয়সে এখন ভাঙন ধরেছে। কী ভেবে সে বলল, তোর ঘর কুথায়? বাপের নাম কি? বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল হাবুল চোর। তার মনে কোনো ভয়-ডরের চিহ্ন নেই।
–আমার ঘর হলদিপোঁতা ধাওড়ায়। বাপের নাম গুয়ারাম।
রঘুনাথের জবাব শুনে হাবুল চোর জোর গলায় বলল, তোর দ্বারা হবে। তুই আমার কাছ থেকে মন্ত্র লিবি? জীবনে ভাত-কাপড়ের কুনোদিনও অভাব হবিনি। মাথা উঁচু করে বাঁচবি। কুঁইকুই করে বাঁচতে হবে না।
তার মানে? আগ্রহ প্রকাশ পেল রঘুনাথের কথায়।
হাবুল চোর বলল, এসব গুরুবিদ্যে শিখতে হয়। শিখতে গেলে গুরু ধরতে হয়। গুরু বিনা কিছু হয় না রে! তা যাকে-তাকে তো সব কিছু দেওয়া যায় না! তাহলে কচুবনে মুক্তো ছড়ানো হয়। যদি তুই রাজি থাকিস, কাল এই সময় বাঁশতলায় আসিস। কাল অমাবস্যা আচে। কাল দীক্ষা দিয়ে তোর হাতেখড়ি হয়ে যাবে। সঙ্গে পাঁচ সিকে পয়সা আর কিছু ফল আনিস। কাল থিকে আমি তোর গুরু হয়ে যাবো। তুই গুয়ারামের ব্যাটা। তোর রক্তে জোস আছে। তুই অনেক দূর যাবি, বাপ।
রঘুনাথ সারাদিন অনেক ভেবেছে। অন্যমনস্ক হয়ে গেছে কাজে। শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে হাবুল চোরের। পাঁচ সিকে পয়সা আর দুটো গাঁদা ফুল নিয়ে বাঁশতলায় হাজির হয়েছে রঘুনাথ যথাসময়ে।
গাঁজার কলকে হাতে হাবুল চোর অনেক আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিল সেখানে। রঘুনাথ কাছে যেতেই সে বলল, যা পুকুর থেকে হাত-পা ধুয়ে আয়। এট্টা পাতায় করে এই গুঁড়ো সিঁদুরটা গুলে নিয়ে আসবি। তিলক কাটতে হবে। কাঁটা ফুটিয়ে রক্ত দিতে হবে মা ডাকাত কালীকে। তবেই তোর দীক্ষা নেওয়া সার্থক হবে। আজ দিনটা বড়ো ভালরে। আজ ছাই মুঠালে নির্দেশ মতো সব কিছু সোনা হয়ে যাওয়ার দিন রে। রঘুনাথ বুকের রক্ত দিয়ে বলল, যতই বিপদে পড়ি, কোনোদিন কোনো অবস্থাতে গুরুনিন্দে করব না। গুরুনিন্দে করলে আমার জিভ যেন খসে পড়ে। গুরুনিন্দে মহাপাপ। মা ডাকাতকালী, তোমার শ্রীচরণে আমাকে আশ্রয় দাও। তুমি আমাকে সন্তান ভেবে রক্ষা করো। তুমি আমাকে শেয়ালের বুদ্ধি দাও, হাঁসের মতো স্বভাব দাও। আমি যেন গুরুর মুখ রক্ষা করতে পারি। হাবুল চোরের পা ছুঁয়ে ধুলো নিল রঘুনাথ। মাথায় খড়খড়ে হাত রেখে তাকে আশীর্বাদ করল হাবুল চোর, বড়ো হঅ বাপ, বড়ো হয়। ধানমাঠের ইঁদুরের চেয়েও চালাক হজ।
কুলবেড়িয়ায় গিয়ে প্রথম কাণ্ড করে এল রঘুনাথ।
হাত কাঁপল না, মনও টলল না। একেবারে নিশ্চল গাছের মতো সে। প্রতি পদে তার বুদ্ধি তাক লাগিয়ে দিল হাবুল চোরকে। তার ক্রিয়াকর্ম দেখে বোঝা যায় না এটাই তার জীবনের প্রথম চুরির ঘটনা। পিঠ চাপড়ে দিয়ে হাবুল চোর বলল, ভাগের তিন ভাগ মাল আজ তোর। এক ভাগ নিয়ে আমি ঘর যাবো। তুইও আজ ঘরে চলে যা। ঘরে গিয়ে ঘুমো। দরকার হলে তোকে আমি ডেকে আনব। তখন যেন তোর সাড়া পাই। আর একটা কথা। এসব যেন মুখ ফুটে কারোর কাছে গল্প করবি নে। যতই চাপ আসুক মুখ যেন তোর হাঁ না হয়।
রঘুনাথ ঘর চলে যাচ্ছিল, হাবুল চোর হাতের ইশারায় তাকে ডাকল, শোন, এসব কাজে শরীরই সব। শরীরের যত্ন নিবি। শরীরই সম্পদ।
গিয়াসের কাজ ছেড়ে দিয়েছে রঘু। শুভ আর সূর্যাক্ষর সঙ্গে তার এখন খুব কম দেখা হয়। একদিন স্কুল থেকে ফিরছিল শুভ। হঠাৎ রঘুনাথের সঙ্গে দেখা হল বাঁশবাগানের ধারে।
রঘুনাথ সুস্থ ছিল না, ওর মুখ থেকে কাঁচা মদের গন্ধ বেরচ্ছিল ভুরভুরিয়ে। শুভর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই লজ্জায় পালিয়ে যেতে চাইল সে, কিন্তু শুভ তাকে সে সুযোগ দিল না। দৌড়ে গিয়ে খপ করে চেপে ধরল তার হাত, তুই মদ খেয়েছিস?
রঘুনাথ কোনো উত্তর না দিয়ে মুখ নীচু করে দাঁড়াল।
শুভ বলল, এই বয়স থেকে মদ খেলে পরে তোর কি অবস্থা হবে বুঝতে পারছিস?
এবার রঘুনাথ ঘুরে দাঁড়াল, মদ না খেলে খাবো কি, ভাতে তো তাগদ আসে না। আমাদের ভালো-মন্দ খাওয়ার ভাগ্য হয় কোথায়?
–অনেকেই শাক-ভাত খেয়ে বেঁচে আছে।
–আমি তাদের মতো নই। আমি আলাদা। রঘুনাথের গলার রগ ফুলে উঠল, আমাকে কেউ খেতে না দিলে আমি তার খাবার জোর করে কেড়ে নেব। ভিখারীর মতো বাঁচতে আমি পারব না। আমার কাকা যা করেছে আমি তাই করব। বাপের মতন আমি মিউমিউ করে বাঁচব না।
-তুই কী চাস তাহলে?
–আমি বাঘের মতো বাঁচতে চাই। আমার বাপ-ঠাকুর্দা যেভাবে বেঁচেছে আমি সেভাবে বাঁচব না। রঘুনাথ হাঁপাচ্ছিল। ওর রাত জাগা গতর ওঠা-নামা করছিল যন্ত্রের মত।
-তাহলে লেখা-পড়া করলি না কেন? শুভর জিজ্ঞাসায় থমকে গেল রঘুনাথ তারপর শিশুর মতো দাঁত বের করে হাসল, সবাই কি লেখাপড়া শিখে বড়ো হয় নাকি? অনেকে গায়ের জোরে বড়ো হয়। আমি বুদ্ধির জোরে বড়ো হবে। তখন তোকেও আমি অনেক সাহায্য করব। দেখে নিস!
