নাফিজার এই পরিবর্তন ভালো নজরে নেয়নি মকবুল। সে নোক লাগিয়ে পেরেক দিয়ে মাটির ঠিলি ফুটো করে দিল গিয়াসের। ধরাও পড়ে গেল কিচেন ঘরের সামনের বেঁকা গাছটায়। হাতের বাঁক সেদিন ক্ষমা করেনি গিয়াসের। এক চোটেই ব্যাঙের মতো গাছ থেকে ঠিকরে পড়েছিল মকবুল। কপাল ফেটে রক্ত ঝরছিল ফিনকি দিয়ে। শেষে হাসপাতালের বেডে তার জায়গা হল। ডাক্তারবাবু পরপর সাতটা সেলাই দিলেন তার কপালে।
মকবুল এখন ফাটা কপাল নিয়ে ঘোরে।
নাফিজা গোয়ল পালানো গোরু, বনে-বাদাড়ে গিয়েও দুধ দিয়ে আসে। এর ওর মুখে খবর পায় গিয়াস। যে মেয়েমানুষের স্বভাব কুকুরের লেজের মতো তাকে কোন মন্ত্রে সিধা করবে গিয়াস–তা তার জানা নেই। তার মনে একটাই আক্ষেপ। খোদাতালা তার কপালে সুখ লিখে পাঠায়নি।
গিয়াসের কাছে রস জ্বাল দেবার কাজে লেগেছে রঘুনাথ। শুভই ঠিক করে দিয়েছে কাজটা। কথায় কথায় গিয়াস একদিন বলছিল, ভালো ছেলে পেলে বলো তো। একার দ্বারা দশ দিক দেখা যায় না। সারা রাত জাগি। দুপুরে একটু গড়িয়ে নিলে আরাম হয়। তাহলে রাতটা আবার জাগা যায়। যা চোরের উৎপাত, আর পারচি নে গো।
ফুট-রস খেতে এসে শুভর রঘুনাথের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। সে বলেছিল, কাকা, একটা ভালো ছেলে আছে। আমি তাকে খবর পাঠাব।
-দেখো, যত তাড়াতাড়ি হয়। সিজিন ফুরিয়ে গেলে কাজে লাগিয়ে আর কি লাভ হবে!
সেদিন গুয়ারামকে সাথে করে রঘুনাথ এসেছিল হাসপাতালে। ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার সময় কদবেলতলায় রঘুনাথের সঙ্গে দেখা হল শুভর। শুভ টিউশনি সেরে ঘরে ফিরছিল। রঘুনাথ তাকে দেখতে পেয়ে সাইকেল থেকে নামল। একগাল হেসে বলল, আজ আর তোদের ওখানে যাওয়া হল না। বাবার শরীর খারাপ। জ্বর ছাড়ছে না। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ নিয়ে ঘর ফিরছি।
গুয়ারাম ঘোলাটে চোখে দেখছিল শুভকে। ছেলের বন্ধু বলে নয়, শুভকে তার ভালো লাগে নানা কারণে। কদবেল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে গুয়ারাম বলল, কিছু মনে করো না। পরে আবার কোনো একদিন আসব। আজ আর শরীলটা ভালো লাগছে না। আজ চটপট ঘরে গিয়ে আরাম করব।
রঘুনাথ দুঃখ করে বলল, হাতে আমার কাজ নেই। খুব অভাব চলচে সংসারে। কাজটা যদি হয় তো দেখ।
-তাহলে বিকেলে চলে আয়। আমি তোর সাথে যাবো কথা বলতে। শুভ বলল। বিকেলে সময় করে এসেছিল রঘুনাথ। তার হৃষ্টপুষ্ট চেহারা দেখে পছন্দ হয়েছিল গিয়াসের। খাওয়া-পরা আর মাস গেলে থোক কিছু টাকা দেবে সে। বিনিময়ে হাড়ভাঙা খাটুনী খাটতে হবে তাকে। রাতে রসের ঠিলি পাহারা দিতে হবে তাকে। গুড় জ্বাল দিতে হবে সকালে। প্রয়োজন হলে হাটে গুড় নিয়ে বসতে হবে দুবেলা। সব শর্ত মেনে নিয়েছে রঘুনাথ। পেটের দায় মহাদায়। এখানে পিছিয়ে গেলে খাদে গিয়ে পড়তে হবে।
হাসি মনে কাজটাকে মেনে নিয়েছে রঘুনাথ। শুভকে বলেছে, জিরেন কাট রস খেতে মন হলে আসিস। মালিককে বলে তোদের মন ভরে খাইয়ে দেব। জানিস তো গিয়াস- কাকা লোক হিসাবে বেশ ভালো। মনটাও উদার। কাউকে মুখের উপর না বলতে শেখেনি।
এমন একটা কাজের ছেলের খোঁজে ছিল গিয়াসে। রঘুনাথকে পেয়ে তার একটু আরাম হয়েছে। ফি-রাতে সে গাঁয়ের ঘরে চলে যায় সাইকেল চালিয়ে। এক ঘুম দিয়ে ভোর ভোর ফিরে আসে। তখন বেশ ঝরঝরে লাগে শরীর। নাফিজারও সুখ ঝরে পড়ে শরীর থেকে। রঘুনাথ সাতসকালে ভাড় নামিয়ে কড়াইয়ে চাপিয়ে দেয় রস। গুড় হয়ে গেলে ভাড় ধুয়ে খড়ের ধোঁয়া দেয় প্রতি ঠিলিতে। গিয়াস পাটালিটা বানায় নিজের হাতে। গুড়ের পাক দেখে নামানো দরকার। দানা না হলে পাটালি জমবে না। আর পাটালি না জমলে দাম পাবে না। তখন এত পরিশ্রম বৃথা যাবে।
রসের ঠিলি পাহারা দিতে গিয়ে হাবুল চোরের সাথে রঘুনাথের দেখা হল ভোর রাতে। কারোর সর্বনাশ করে ঘরে ফিরছিল সে। মাথায় কাঁসার ভর্তি-বোরা। ঠনর-ঠনর আওয়াজ হচ্ছিল হাঁটা চলায়। দূর থেকে তাকে দেখে ছুটে এসেছিল রঘুনাথ, গলা উঁচিয়ে বলেছিল, কে যায় গো? মাথায় বস্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল হাবুল চোর। হাতের ইশারায় কাছে ডেকেছিল রঘুনাথকে। চাপা গলায় বলল, বোরাটা নামিয়ে দে দেখি মাথা থেকে। সেই কোথা থেকে হেঁটে আসছি। ঘাড় লেগে গেছে, যন্ত্রণা হচ্চে।
-তুমি কে? রঘুনাথের প্রশ্নে দাঁতে দাঁত ঘষে হেসেছিল হাবুল চোর, তুই আমাকে চিনবি কি করে? তোর বাপ-ঠাকুর্দা চেনে। চেনে তোর কাকা লুলারাম। আর চেনে থানা-পুলিশ-দারোগা চৌকিদার। আমাকে চেনে না এ গাঁয়ে এমন মানুষ আছে নাকি? হাবুল চোর দাঁত টিপে হাসল। রঘুনাথ খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল উত্তর শুনে। হাবুল চোর তার বিস্ফারিত মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, আমার নাম হাবুল চোর। অনেকে বলে, পাঁকাল মাছ। সিদ কাটায় এ তল্লাটে আমার মতো কেউ নেই। আমি ঘুমপাড়ানী মন্ত্র জানি। সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে আমি কাজ হাসিল করে বেরিয়ে আসি। আমি হলাম গিয়ে রেতের বনবেড়াল।
আজ কার আবার কপাল পোড়ালে? রঘুনাথের প্রশ্নে আবার এক চোট হাসল হাবুল চোর। মাথা চুলকে বলল, আজ বেশি দুর যাইনি। ঘরের কাছেই কাজ হয়ে গেল। কাঁসা-পেতল ছাড়া টাকা-পয়সা সোনাদানা কিছু পাইনি। কাঁসা-পেতলে আজকাল আর দাম পাওয়া যায় না। ঝুঁকি অনেক। এসব মাল এখানে কাটবে না। বেথুয়া নয়ত পলাশী নিয়ে যেতে হবে। নাহলে মাল কাটানো যাবে না। তার উপর ধরা পড়ে গেলে ছাল-চামড়া ছাড়িয়ে গাঁয়ের মানুষ ডুগডুগি বাজাবে। ভয়ে ভয়ে জীবন কাটেরে ব্যাটা…। কী করব, পেটের দায়।
