ঘটনাটা প্রথম থেকেই সন্দেহ হয়েছিল চিত্রভানুর। অত বড়ো মেল-ওয়ার্ডে কানুকুড়ো ছাড়া আর কোনো রুগী নেই। এটাও তাঁর সন্দেহের অন্য একটা কারণ। কানুকুড়োর সঙ্গে দিনের বেলায় কথা বলেছেন তিনি। ভূত নিয়ে তার ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে গল্প বলার ধরণ মনে সন্দেহের একটা দাগ কেটে দেয়।
সেই থেকে তক্কে তক্কে ছিলেন চিত্রভানু। মওকা বুঝে বুদ্ধি খেলিয়ে ঠিক তাকে ধরে ফেলেন তিনি।
সমস্ত ঘটনা শুনে তাজ্জব হয়ে যান ডাক্তারবাবু। অবনীর মুখেও কোনো কথা সরে না। সব শুনে রাগে ফুঁসছেন অতসী দিদিমণি। তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, একে কোনোমতেই ক্ষমা করা উচিত হবে না। এর জন্য আমার হার্ট-স্ট্রোক হয়ে যেত ভয়ে। ঈশ্বরের অশেষ দয়া যে বেঁচে গেছি! হাঁফ ছেড়ে অতসী দিদিমণি বললেন, এই পাপীটাকে থানায় দিন, ডাক্তারবাবু। হাসপাতালের ভাত খেয়েছে, এর এবার জেলের ভাত খাওয়া দরকার। নাহলে শিক্ষা হবে না বুড়োটার।
থানা-পুলিশের কথা শুনে ভয়ে গলা ফাড়িয়ে কেঁদে উঠল কানুকুড়ো। ছুটে গিয়ে সে জড়িয়ে ধরল ডাক্তারবাবুর পা।
-না খেয়ে মরব সে-ও ভালো, আর কোনোদিন হরবোলা সাজব না গো। আমারে ছেড়ে দিন গোগা, আমারে ছেড়ে দিন….। কান্নায় ভেঙে পড়ল কানুকুড়ো। পরের দিন ভোর হওয়ার আগে কানুকুড়োর আর কেউ দেখা পায় না। বুড়ি এসে হাসপাতালের দোরগোড়ায় কাঁদে আর কপাল ঠোকে।
.
৪৩.
রস চুরি করতে গিয়ে গিয়াসের হাতে ধরা পড়ে গেল সবুজ আর শুভ। বাঁকের ঘায়ে মাথা ফাটিয়ে দিত গিয়াস, শুভ ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে তার হাত চেপে ধরল, কাকা, মেরো না গো। যাকে তুমি মারবে সে তো টিকেদারবাবুর ছেলে সবুজ।
গিয়াসের উত্তেজনায় জলের ছিটে পড়ল তবু রাগের ঝাঁঝ কমল না, যার ছেলেই হোক চুরি করার শাস্তি পেতেই হবে। টাকা দিয়ে গাছ কিনেছি আমি। রাত জেগে ঘরদুয়ার ছেড়ে পড়ে আছি অপরের পেট ভরানোর জন্য নয়। গরম নিঃশ্বাস পড়ছিল গিয়াসের বুক টুইয়ে, হাঁপিয়ে উঠে সে বলল, কদিন থেকে আমার ঠিলিতে পেরেক পুঁতে চলে যাচ্ছে কেউ। গেল সপ্তাহ এক সেরও গুড় পাইনি। এভাবে লস হলে আমারই বা চলবে কি ভাবে? আমাকে তাহলে গলায় ফাঁস নিয়ে মরতে হবে। ঘরে-বাইরে এত বিপদ আমি আর সামাল দিতে পারছি না। বাঁকটা পাশে নামিয়ে রেখে ডুকরে উঠল গিয়াস।
গেল হপ্তায় খরচাপাতি নিয়ে ঘর গিয়েছিল সে। ভেবেছিল ছেলেটার চাঁদমুখে চুমা খেয়ে রাতটা নাফিজার সঙ্গে কাটিয়ে ফিরে আসবে। কিন্তু এ কী দেখল সে নিজের চোখে!
বিকেল বেলায় মকবুলকে নিয়ে শুয়েছিল নাফিজা। লুঙ্গি পরা মকবুল অসময়ে তাকে দেখে বাঘ দেখার মতো চমকে ওঠে। তক্তপোষের এক পাশ থেকে জামাটা তুলে নিয়ে সে ঘর থেকে ছিটকে গিয়েছিল রকেটগতিতে। যাওয়ার সময় সে তার সিগারেটের প্যাকেট আর ম্যাচিস বাক্স ফেলে গেল। আর নাফিজার অবস্থা চোখে দেখা যায় না। তার ভরা শরীরের সম্পদ নুয়ে পড়া স্তন যুগলে দু-হাত চেপে অসহায় চোখে সে তাকিয়েছিল গিয়াসের দিকে। তক্তপোষে পড়ে থাকা ছাপা শাড়িটা টেনে নিয়ে সে যে বুকে চাপা দেবে তার এমন ক্ষমতা ছিল না।
হাতেনাতে ধরা পড়ে গেল নাফিজা।
বাঁচার কোনো পথ না পেয়ে সে দৌড়ে এসে পা চেপে ধরেছিল গিয়াসের। চোখের জলে পা ভিজিয়ে দিয়ে বলেছিল, ইবলিশটা জোর করে আমাকে ছিঁড়ে খেল। আমি কতদিন আর বাঁধা দিয়ে ঠেকিয়ে রাখব। গেল হপ্তায় তুমি ঘর আসোনি। এ হপ্তায় ঘর আসবে কিনা কোনো খবর পাইনি। আমার তো রক্ত-মাংসের শরীল। আমি হেরে গেছি গো। আমাকে মারো ধরো যা খুশি করো। আমি আর কোনো রা কাড়বোনি।
নাফিজা সময়ের সাথে নেচে কেঁদে মান-অভিমান করে মানিয়ে নিল নিজেকে। এত বড়ো চোট সামাল দেওয়া মুখের কথা নয়। গিয়াস বোবা হয়ে গিয়েছিল ক মুহূর্ত। তারপর হুঁশ ফিরতেই সে ছুটে গিয়েছিল চোরাকুঠুরীর ঘরে। পাটে দেওয়া বিষতেল নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসেছিল নাফিজার কাছে। ছিপি খুলে মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেছিল, আমি মরলে তোর পথের কাঁটা সরে যায়। আমি মরে তোকে বাঁচিয়ে যাব। এই দেখ।
নাফিজা চিলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই বিষডিবার উপর। টান মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল উঠোনে। তারপর গিয়াসের বুকের উপর চড়ে বসে পাগল-চুমায় ভরিয়ে দিয়েছিল তার শরীর। বাধা দেওয়ার কোনো ক্ষমতা ছিল না গিয়াসের, নারী হাতের কোমল স্পর্শে তার শিথিল শরীরের শিরাগুলো টান টান হয়ে উঠেছিল ধনুকের ছিলার মতো। নাফিজার দক্ষ শরীরী খেলায় এক সময় হেরে গেল গিয়াস। বুক উজাড় করে নিজের সর্বস্ব দিয়ে গিয়াস মুখের ঘাম মুছে শুধু একবার তাকিয়েছিল নাফিজার সুন্দর মুখের দিকে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে কিছু বলতে গেলে শঙ্খলাগা ভঙ্গিতে নাফিজা ঘাড়ের কাছে হাত দিয়ে যেন নামিয়ে আনে শালগাছের মতো শরীর, তারপর দুচোখে দীর্ঘস্থায়ী চুম্বন এঁকে বলে, এরপরে আর কোনো প্রশ্ন করো না। খোদাকসম, আমি তোমার কোনো কথার জবাব দিতে পারব না কেননা জবাব আমার জানা নেই। আমার যা ছিল তা সব দিয়ে আমি তোমার রোজা ভাঙলাম। এবার আমাকে মারতে হলে মারো, কাটতে হলে কাটো। আমি মুখ দিয়ে টু শব্দও করব না।
নাফিজার যাদুটোনা মনের জয় হল।
হাসপাতালের ছাউনীতে ফিরে এসে বেশ খুশি-খুশি দেখাচ্ছিল গিয়াসকে। সে তো ভালোবাসার কাঙাল। নাফিজার মন থেকে মকবুলকে সে মুছে দিতে পেরেছে–এর চেয়ে বিরাট জয় আর কি হতে পারে। গিয়াসের অন্ধকার মনের বনে হাজার ছোট ছোট ফুলের আলো আর সুগন্ধে মাতোয়ারা পাগল ভ্রমর যেন সে। তার আর কোনো দুঃখ কষ্ট নেই। এবার সে রাতের পর রাত জাগতে পারবে বিনা ক্লান্তিতে।
