লাট্টু খাওয়া-দাওয়া সেরে গল্প করার জন্য এসেছে অবনীর ঘরে। এ কথা সে কথার পরে সে বলল, বাঁশতলায় কী কাজে যেন গিয়েচিলাম। ফেরার সময় দেখি জল জল বলে কে কাঁদছে। বাঁশ পাতা উড়ছে ফরফরিয়ে পাখির মতো। ভয়ে জান নিয়ে পালিয়ে এসেছি। আর ভুল করেও ও দিকে যাইনি।
অবনী জোর গলায় বলল, ওসব তোমাদের মনের ভুল ধারণা। মাটির তলায় চাপা পড়ে আছে। বউটা। যা কষ্ট পেয়ে মরেছে–ও আর এ পৃথিবীতে আসবে না।
দুলারী হি-হি করে হেসে উঠল কথা শুনে। অবনীকে সমর্থন জানিয়ে গায়ে চাঁটি মেরে বলল, তুমি ঠিক বলেছ কর্তা। মেয়েমানুষ একবারই জন্মায়, একবারই মরে। বারে বারে সে কষ্ট ভোগ করতে আসে না।
দুলারীর ঘনিষ্ঠ হয়ে সরে আসা ভালো চোখে দেখল না সরস্বতী। সে চাইছিল এরা যত তাড়াতাড়ি বিদেয় হয় ততই ভালো। এত গায়ে পড়া মেয়েমানুষ তার ভালো লাগে না। ওদের চোখে পুরুষ ধরার ফাঁদ আছে। যে কেউ আটকা পড়তে পারে সেই ফাঁদে। তখন ভেসে যাবে তার সাজানো সংসার। অবনীর মতো ভালো মানুষকে ফাঁদে ফেলতে বেশি সময় লাগবে না দুলারীর মতো মেয়েদের। সরস্বতীর চোখের তারা কটকটিয়ে উঠল।
দুলারী জর্দা-পান মুখে পুরে বলল, মাসোটা বড়ো ভালো বেঁধেছ বৌদি। যদি বেঁচে থাকি তাহলে আবার আসব তোমার হাতের মান্সাে রান্না খেতে। অনেক দিন মনে থাকবে তোমাদের কথা। ছোট কাজ করেও মনটা তোমরা বড়ো রেখেছো দেখে ভালো লাগল। তোমাদের কথা আমি ওখানে গিয়ে জনে জনে গল্প করব। যাওয়ার সময় জয়কিষাণ শুভর হাতে একটা দশ টাকার নোট দিয়ে বলল, এই টাকাটা রাখো। তোমাদের জন্য কিছু আনতে পারিনি, খালি হাতে চলে এসেছি।
শুভ টাকাটা নেবে না। শেষে অবনী বলল, নে। জ্যাঠা দিচ্ছে। না নিলে দুঃখ পাবে।
সন্ধের বাসে ওরা ফিরে গেল সদরে। মাথা হেঁট করে পিচ রাস্তা থেকে একা ফিরে এল অবনী। এত ধকল সহ্য করার পরেও আজ তাকে নাইট ডিউটিতে আসতে হবে। তার হয়ে ডিউটি করার কেউ নেই। অতসী দিদিমণি বলেছেন, অবনী না এলে আজ ছুটি নিয়ে নেবেন।
ডাক্তারবাবু তাই সমস্যায় পড়েছেন। অবনীকে ডেকে বললেন, আমি খবর পেয়েছি সব কাজ মিটে গেছে। তুমি আজ যা করলে আমার তা মনে থাকবে। একটা অনুরোধ তোমাকে। অতসী দিদিমণি একা নাইট করতে পারবে না। অন্তত আজকের মতো তুমি নাইটটা করে দাও। কাল থেকে পরপর দু-দিন ডিউটি না করলেও চলবে।
অবনী ঘাড় নেড়ে বলল, ঠিক আছে। আমি সময়মতো ডিউটিতে চলে আসব। আপনি দিদিমণিকে বলে দেবেন।
রাত বারোটার পরে শুনশান হয়ে গেল হাসপাতাল চত্বর। চামচিকি আর বাদুড়ের দৌরাত্ম্য বাড়ে তখন। বাবলাগাছে বসে পেঁচা ডাকে একনাগাড়ে। মড়িঘরের পায়রাগুলো কাঠ হয়ে পড়ে থাকে অন্ধকারে। অত উঁচুতে বেডাল উঠতে পারে না, না হলে একে একে ধরে খেয়ে ফেলত ওরা।
ডিউটি আসার সময় সরস্বতী বাতাবীলেবু তলা অব্দি এগিয়ে দিল তাকে। ফিরে যাওয়ার সময় তোমার কিছু হয়ে গেলে আমাদের দেখার কেউ নেই। ফলে বুঝে শুনে চলবে। লোকের তালে তাল মিলিয়ে নেচো না।
সরস্বতী শুকনো মুখে ফিরে গেল। তার ভাবনা বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছিল অবনীকে। যত দিন যাচ্ছে সরস্বতী যেন বুঝে নিতে চাইছে তার দায়িত্ব। অবনীর এসব ভালো লাগছিল ভাবতে। একটা মেয়েমানুষ ধীরে ধীরে তার ভাবনার শরিক হয়ে উঠছে এটাই বা কম পাওয়া কিসে? তার বেশি কিছু চাওয়ার নেই। একটু সুখ পেলে সে দম ছেড়ে বাঁচে। অন্তত গর্ব করে বলতে পারে–আমাদের সংসার। এই সংসারের ভালো হোক, মঙ্গল হোক।
বিছানা পেতে এই সব আবোল-তাবোল ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুম এসে গিয়েছিল অবনীর তা আর মনে নেই।
জল জল আর্ত-চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল তার। ভয়ে সিঁটিয়ে গেল দেহ। চোখ খুলতে সাহস হচ্ছিল না তার। কে যেন ঘাড়ের উপর ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস ছাড়ছে। কান খাড়া করে সে আবার শুনতে পেল সেই একই স্বর। আশে পাশে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই, শুধু ভয়ের ছায়ামূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অতসী দিদিমণি। কাঁপতে কাঁপতে বলছেন, খেতে না পাই সে-ও ভালো, এই হাসপাতালে আর একদিনও ডিউটি করা নয়। অবনী চলো–আমরা ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বলি। তিনি বিচক্ষণ মানুষ। তার কাছে নিশ্চয়ই সুবিচার পাব।
তাদের যাওয়ার পথ আটকে দেয় চিত্রভানু, অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার।
বেশ উত্তেজিত গলায় তিনি বললেন, ভূত আমি ধরে ফেলেছি। আপনাদের আর ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। পিছন ঘুরে তিনি গলা ধাক্কা দিয়ে মেঝের উপর ফেলে দিলেন কানুকুড়োকে। পড়েই কিছুদূর হেঁচড়ে গেল বুড়োটা। তারপর নাকি সুরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ভূত-ফুত কিছু নেই গো, আমি হলাম সেই আসল ভূত। ডাক্তারবাবু হাসপাতালের খাতা থেকে আমার নাম কেটে দেবেন বলেছেন। নাম কেটে দিলে আমি ঘরে গিয়ে খাবো কী? আমার যে বড়ো খিদে পায়। খিদে পেলে আমার কোনো জ্ঞানগম্যি থাকে না। নিজেকে বাঁচাবার জন্য আমি ভূত সেজেছি গো! ছোটবেলায় পাখপাখির ডাক নকল করে ডাকতাম। কুকুর ছাগল বেড়াল সব কিছু ডাকতে পারতাম অনায়াসে। সেই ছোটবেলার হরবোলা- বিদ্যে বাঁচার জন্যি কাজে লাগাই। বউটা মারা যাওয়ার পর ওর গলাটা আমি নিজের গলায় তুলে নিলাম। এতেই কাজ হল। কটা দিন তো থাকতে পারলাম হাসপাতালে।
চিত্রভানু ডাক্তারবাবুকে ওই রাতে ডেকে আনলেন হাসপাতালে। ভূত ধরা পড়েছে–এটা কোনো সামান্য খবর নয়। চিত্রভানু সারারাত মশার কামড় খেয়ে অন্ধকারে লুকিয়েছিলেন হাসপাতালে। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে লোহার খাট থেকে নেমে আসে কানুকুড়ো। অন্ধকারে হামাগুড়ি দিয়ে সে চলে যায় বাথরুমে। ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের বিজ্ঞাপনের টিনগুলোর উপর চড়ে বসে সে। তারপর গলায় হাত ঢুকিয়ে শুরু করে তার অদ্ভুতবিদ্যা। অবিকল মেয়েলী গলায় জল-জল বলে কাঁদতে থাকে সে। বার কয়েক কেঁদে-ঝাঁকিয়ে সে আবার নেমে এসে খাটে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
