গাঁয়ের বাজারে কোনো হোটেল নেই। দুটো মানুষ খাবে কোথায়? এই চিন্তায় কাজের গতি শ্লথ হয়ে যাচ্ছিল অবনীর। কোথাও কিছু না পেলে শেষপর্যন্ত হাসপাতালের কিচেন ঘরে খাওয়ার ব্যবস্থা করবে সে। জয়কিষাণ আর দুলারী এসেছে সরকারি কাজে। ওরা কিচেনে খেলে কেউ ওদের মানা করবে না। বরং খুশি হবে সবাই। ওরা সবার কাজে এসেছে। ওরা না এলে ভয়ের জীবাণু উড়ত হাসপাতালের কোণায় কোণায়।
একমানুষ মাটি কেটে হাঁপিয়ে পড়েছিল জয়কিষাণ। দুলারী চটের থলি থেকে মদের বোতলটা এগিয়ে দিল ওর দিকে। গলা ভিজিয়ে ছিপি বন্ধ করে আবার বোতলটা ফিরিয়ে দিল জয়কিষাণ। দুলারী ছিপি খুলে দুকে মেরে নিয়ে ঢেঁকুর তুলে বলল, আজ খুনোখুনি রোদ উঠেছে। আর দেরী করা ঠিক হবে না। এবার যাও মড়িঘর থেকে লাশ নিয়ে আসো। যাওয়ার আগে ভালো করে মুখে গামছা বেঁধে নিও। পচা লাসের গ্যাসটা ভেষণ খারাপ।
হাসপাতাল থেকে ব্লিচিং পাউডার আনিয়ে রেখেছে অবনী। ব্লিচিং পাউডারের ঝাঁঝাল গন্ধে মশা মাছি পোকামাকড় কাছে ঘেঁষতে পারবে না। দুর্গন্ধ থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যাবে।
মড়িঘর থেকে চ্যাং-দোলা করে লাশ বয়ে আনল জয়কিষাণ আর অবনী। সামান্য পথ তবুহাঁপিয়ে গেল ওরা। কপালের ঘাম মুছে জয়কিষাণ রসিকতা করে বলল, মরে গেলে মানুষের ওজন বুঝি বেড়ে যায়। কী ভারী লাশ! হাতের কলকজা ক্ষয়ে যাবার যোগাড়।
অবনী হা-করে দেখছিল বউটার মুখ। কী গায়ের বর্ণ-চোখ ফেরান যায় না। এ যে চড়ুই নয়, বনটিয়া। মনে মনে বিড়বিড়িয়ে উঠল সে। চেহারা দেখে অনায়াসে বোঝা যায় বড়ো ঘরের বউ। কাদের ঘরের বউ? কি দোষ করেছিল সে? রোগজ্বালা কি দোষের?
মুখে গামছা বাঁধা অবস্থায় অবনী বসে পড়ল ঘাসের উপর। সে দেখতে চায় না তবু তার চোখ বারবার করে চলে যায় বউটার মুখের উপর। বুকের খোদল থেকে কান্না গুমরে উঠছে বাধা পাওয়া বানের জলের মতো। বউটা তার কেউ হয় না তবু এই কান্নার বেগ তাকে বড়ো অসহায় করে তোলে।
দুলারীর চোখ এড়ায় না কোনো কিছু। সে অবনীর মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে বলে, কর্তা, তোমার চোখে জল এসেছে। গামছার খুট দিয়ে মুছে নাও গো। পরের জন্য কাদা ভালো স্বভাব। তুমি যে ভালোমানুষ এ নিয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই।
অবনী কোনো কথার উত্তর দিতে পারে না। কথা বলতে গেলেই ধরা পড়ে যাবে তার দুর্বলতা। চোখের কুল ছাপিয়ে অসহায় হয়ে পড়বে সে।
অবনী হাত এলিয়ে দিয়েছে মাটির উপর। জয়কিষাণ বলল, কর্তা, মাছি উড়ছে। দুর্গন্ধে টেকা যাচ্ছে না। যা করার তাড়াতাড়ি করো। কবর দেওয়ার কাজটা তাড়াতাড়ি চুকিয়ে দিলে আয়েশ করে দু-টোক মারা যাবে।
অবনী দেখল–শবদেহ দেখার জন্য হাত দশেক দূরে ভিড় জমিয়েছে উৎসাহী মানুষের দল। তার মধ্যে সবুজ আর শুভকে দেখতে পেল সে। ভয়ে শিউরে উঠল তার শরীর। মারণব্যাধি বসন্ত ছোঁয়াচে রোগ। ওরা এখানে কেন এল এ সময়। অবনী বিরক্তিতে এগিয়ে গেল ওদের সামনে। চাপা ধমক দিয়ে বলল, এখানে এসেছিস কেন? যা পালা।
শুভ চলে যাচ্ছিল। কিছুটা গিয়ে সে ঘুরে দাঁড়াল। অবনীর চোখে চোখ রেখে সে বলল, মা বলেছে ঘরে খেতে। সদর থেকে যারা এসেছে তারাও আমাদের ঘরে খাবে। মা ওদের জন্য রান্না করছে। কাজ মিটে গেলে তুমি ওদের নিয়ে ঘরে যেও।
মেঘলা আকাশ সরে গিয়ে যেন রামধনু ফুটল অবনীর মনে। এটাই মনে মনে সে প্রার্থনা করেছিল। অতিথির সম্মান রক্ষা পেলেই গৃহস্বামীর মর্যাদা বাড়ে। এই বোধ এবং বিশ্বাসে তার অন্তরাত্মা পূর্ণ। সরস্বতী হয়ত তার ব্যথিত মনের আঁচ পেয়েছে। নাহলে সে যা জেদী মেয়ে পরের জন্য রান্না করতে যাবে কেন? ও বরাবরই নাক উঁচু স্বভাবের মেয়ে। এক ঝলক দেখলে লোক ভাববে-বউটা ভীষণ অহঙ্কারী।
কাজ মিটে গেল চটজলদি।
দা-দিয়ে শ্যাকুল গাছের ঝোপ কেটে আনল দুলারী। ওগুলো কবরে পুঁতে দিয়ে সে বলল, শেয়াল এসে আবার লাশ না তুলে ফেলে। কর্তা, তুমি আধলা ইট কয়েকটা খুঁজে আনো। ইট আর কাঁটা চাপা দিলে শেয়ালের বাপের ক্ষমতাও হবে না লাশ তুলে ফেলার। তাড়াতাড়ি করো কর্তা, আমাদের আবার বাস ধরে ফিরে যেতে হবে। সাঁঝের মধ্যে ঘর না ফিরলে ঝামেলা।–
-খাবে না? তোমার জন্য এত কষ্ট করে রান্না করল আমার বউ। অবনী গর্বিত দৃষ্টি মেলে তাকাল।
জয়কিষাণ বলল, নিশ্চয়ই খাবো। না খেয়ে কোথাও নড়ব না। যা ধকল গেল অনেকদিন মনে থাকবে।
পাল পুকুরে সাবান ঘষে চান করল দুলারী আর জয়কিষাণ!
অবনীও বার দশেক ডুব দিয়ে পাড়ে উঠে এসে দেখল পদ্ম দাঁত টিপে হাসছে তার ভেজা গতর দেখে। তার দৃষ্টি জোঁকের মতো লেপটে গেল শরীরে।
কেঁপে উঠল অবনী, কিছু বলবা?
–অনেকদিন আমার ওখানে আসোনি। আমার উপর বুঝি রাগ হয়েছে। রোদে ঝলসে যাওয়া পদ্মের মতো মুখ নীচু করে দাঁড়াল স্বামীখেদান বউটা।
-না, না রাগ করব কেন? অবনী বলল, সময় পাইনে। সময় পেলে ঠিক যাব।
দুলারী ভেজা শরীরে পাড়ে উঠে এল পানকৌড়ি পাখির মতো। গলায় রহস্য মাখিয়ে বলল, কর্তা, এ বউটা কে গো? এর চোখে তো পীরিতের আঠা। সাবধানে থেকো। জড়িয়ে গেলে সংসারে আগুন ধরে যাবে। তোমার যা বউ টের পেলে তোমাকে শেষ করে দেবে।
বিষণ্ণ হাসল অবনী। এড়িয়ে গেল সব কথা।
খাওয়া-দাওয়ার পর্ব চুকতে বেলা গড়িয়ে গেল অনেকটা।
