তবু চাপে পড়ে গ্লাস হাতে তুলে নিতে হয় অবনীকে। ওরা বাইরে থেকে এসেছে। ওদের সঙ্গ দেওয়া দরকার। গ্লাসে চুমুক দিতেই গা গুলিয়ে উঠল অবনীর। বমি ঠেলে উঠল গলার ভেতর। তবু হাজার চেষ্টা করে মাত্র এক ঢোঁক গিলল সে। তারপর গ্লাসটা নামিয়ে রাখল পাশে।
বেলা বাড়ছে, শুধু মদ খেয়ে সময় কাটালে চলবে না। ডাক্তারবাবু নিশ্চয়ই তাদের জন্য পথ দেখছেন। সময়ে না গেলে ভুল বুঝবেন। বাবুদের ভুল বুঝতে বেশি দেরী লাগে না।
পরপর দুবোতল মদ গিলে দুলারী আর জয়কিষাণের হাঁটা চলার ক্ষমতা ছিল না। নেশার ঘোরে কথাও জড়িয়ে যাচ্ছিল ওদের। এসব দেখে শুনে ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল অবনীর। আসল কাজটাই যদি না হয় তাহলে কী ভাববেন ডাক্তারবাবু। দোষ তো তাকেই দেবেন।
বহু কাকুতি-মিনতির পর মাটিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল জয়কিষাণ। অবনীর শুকনো গালটা টিপে দিয়ে বলল, অত চিন্তা করো না। মাল যখন পেটে পড়েছে, তখন কাজ না মিটিয়ে আমরা যাব না।
দুলারী খিল খিল করে হাসল, কর্তা, অত ভাবনার কী আছে! এসব কাজ মাল পেটে না পড়লে হবে না। মাল হচ্ছে টনিক। টনিক খাওয়ার পর আমার গায়ের জোর দশগুণ বেড়ে যায়। তখন আমি দশটা মরদের কাজ একা করি।
দুলারীর আঁচল খসে পড়ে লুটায় ধুলোয়। ভরা শরীর ফুলে ভরা গাছের মতো শোভা পায়। অবনী সেদিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। তার শরীরে কেমন জোয়ার আসে। বুকের ভেতর ছলাৎছলাৎ ঢেউ ভাঙার শব্দ হয়। চোখ কুঁকড়ে সে ভাবে এরা জীবনটাকে ভোগ করতে জানে। এদের জীবন টবে লাগান গাছের মতো নয়। এরা জঙ্গলের ভেতর বেড়ে ওঠা আদিবৃক্ষ। অবনী হঠাৎ ধুলোয় বসে যাওয়া দুলারীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সাহায্যের জন্য। দুলারীও নিঃসংকোচে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল তার হাত। উত্তাপ বিছিয়ে দিল অবনীর পুরো শরীরে। গলায় আব্দার মিশিয়ে বলল, কর্তা, তোমার কাজ তো হয়ে যাবে। বলল, তুমি আমার একটা কাজ করে দেবে? দুলারী মোহনী চোখে তাকাল, দৃষ্টিতে লজ্জা মিশিয়ে বলল, পেটে আমার তিনমাসের ছানা। এ সময় মন করছে শুয়োরর মাংস দিয়ে ভাত খেতে। তুমি আমাকে কালো দেশী শুয়োরের মাংস খাওয়াবে কর্তা?
অবনী হাঁ-হয়ে দেখছিল দুলারীর পুরো শরীর। ওর কুঁড়ি ধরা শরীরে যৌবন-লাবণ্য কই মাছের মতো ছড়ছড় করছে। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে সে বলল, শুয়োরের মাংস খাবে এ আর এমন কি বড়ো কথা! যাওয়ার পথে হাঁড়িপাড়া থেকে মাংস কিনে নিয়ে যাব। তুমি মুখ ফুটিয়ে খেতে চেয়েছ, তোমাকে না খাওয়ালে আমার পাপ হবে।
সব দিন শুয়োর মারে না পাড়ায়, আর মারা হলেও খদ্দের জোটে না ঠিকমতন। শুয়োরের মাংস যারা খায় সেই সব মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বড়ো কম এ গ্রামে। অবনী জানত সে গিয়ে দাঁড়ালেই সের দুয়েক মাংস অবশ্যই পেয়ে যাবে। কাছে এত টাকা নেই, তবু টাকার জন্য আটকে যাবে না কেনাকাটি। এ পাড়ার সবাই তাকে চেনে, মান্য করে। ধার দেওয়া নিয়ে তাদের কোনো সংশয় নেই মনে।
পাকা রাস্তায় ওদের দাঁড় করিয়ে অবনী চলে গেল পাড়ার ভেতর। ফিরে এল হাসি মুখে। পাতায় জড়ানো মাংসর পুটলি দুলারীর হাতে দিয়ে সে বলল, মাংস আমি এনে দিলাম। তোমাকে এবার বেঁধে-বেড়ে খেতে হবে।
-কেন তোমার বউ?
দুলারীর প্রশ্নে স্মিত হাসল অবনী, সে শুয়োরের মাংস ছুঁয়েও দেখে না। এমনিতে খাসীর মাংস খেতেই ঘেন্না, তার উপরে শুয়োর শুনলে আমার অবস্থা দফা-রফা করে ছেড়ে দেবে। তবে কেউ খেলে তাকে সে মানা করবে না।
-তাহলে তো তোমার ঘরে যাওয়া যাবে না। দুলারী আশাহত হল, বৌদি এত শুচিবাই আমি জানতাম না। জানলে আর ওই আব্দার তোমার কাছ করতাম না। অবনী তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, সব মানুষ তো একরকম হয় না। তবে তোমার বৌদি কারোর ক্ষতি করতে জানে না। সে নিজের খেয়ালে থাকে অন্যের পেছনে লাগার স্বভাব তার নেই।
–তুমি দেখছি ভাগ্যবান। দুলারীর কণ্ঠস্বর নেমে এল খাদে।
কোপে কোপে মাটি কাটছিল জয়কিষাণ, ঝুড়িতে করে তা ফেলে আসছিল অবনী। দুলারী কাপড় গুছিয়ে নিয়েছে ধুতি পরার মতো। কাজের জন্য টগবগ করছে সে। একটুআগের নেশা উড়ে গিয়েছে কোথায়। সে এখন সুস্থ মানুষের চেয়েও স্বাভাবিক। ডাক্তারবাবু আর হাসপাতালের ড্রাইভার চিত্রভানু এসে দাঁড়িয়েছে কাজ দেখার জন্য। ওরা মাঝে মধ্যেই উৎসাহ দিচ্ছে জয়কিষাণকে। মাটি কাটার তোড়ে গা বেয়ে ঘাম নামছে। তবু তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। বোঝা যাচ্ছে সে কত কাজপাগল মানুষ।
দুলারী ঘাসের উপর থেবড়ে বসে একটা বিড়ি ধরিয়ে টানছিল। ধোঁয়া উগলিয়ে সে অবনীকে বলল, হাঁপু লাগলে ঝুড়িটা আমাকে দিয়ে দিও। আমি তখন মাটি ফেলব। তুমি তখন বিশ্রাম নিও।
কোনো কথাই কানে ঢুকছিল না অবনীর। কাজের সময় সে একটা বুনো মানুষ। তবু মাঝে মাঝেই মনে পড়ছিল তার সরস্বতীর কথাগুলো। শুয়োরের মাংসগুলো নিজের হাতে নিল না সে, তর্জনী উঁচিয়ে বলল, ঐ চৌবাচ্চার ধারে রেখে আসো। এ মাংস আমি ঘরে ঢোকাব না। তুমি সব জেনে-শুনেও ঘরে এনেছ। তুমি দেখছি ঘরে শান্তি ফিরুক চাও না।
অবনী অপরাধীর মতো বলেছিল, সদর থেকে ওরা এসেছে, ওরা খাবে।
–আমি মাটির হাঁড়ি এনে দিচ্ছি।
এবার জ্বলে উঠেছিল সরস্বতী তুমি দেখছি ঘরটাকে হোটেল বানিয়ে ছাড়বে। তোমার মতো ঘর জ্বালানো পর ভুলানো মানুষ আমি আর জীবনে দুটি দেখিনি। অবনী স্তব্ধ হয়ে গেল কথা শুনে। সরস্বতী ফি কথায় ভুল বোঝে তাকে। মন খারাপ করে অবনী ফিরে এসেছে কাজে।
