জয়কিষাণ গোঁফ নাচিয়ে হেসে উঠল, সেই ভালো। খালি পেটে লাশ খালাস হয় না। পেটে ডেড-বডির গ্যাস ঢুকে গেলে উলটি হবে।
দুলারী চিমটি কেটে ইশারা করল জয়কিষাণকে, সব কথা সবখানে বলা কি ঠিক?
অবনী সায় দিল তার কথায়। চা আর টোস্ট খেয়ে বিড়ি ধরাল ওরা। অবনী জয়কিষাণকে একটা বিড়ি দিতেই অভিমানে ঠোঁট ফুলাল দুলারী, আমি কি দোষ করলাম গো কর্তা? এক যাত্রায় আমি কেন বাদ যাবো?
তার কথা বুঝতে পারল না অবনী, সে বিস্ফারিত চোখে জয়কিষাণের দিকে তাকাল। জয়কিষাণ অবনীকে ঠেলা মেরে বলল, আমার বউয়ের ভাগটা দিয়ে দাও। আমরা খাবো, ও কি তাকিয়ে দেখবে নাকি?
এর অর্থ দুলারীও ধূমপান করে। মেয়েমানুষকে সে বিড়ি খেতে এর আগে দেখেনি। মেয়েরা বিড়ি খেলে কেমন দেখতে লাগবে–এই কাল্পনিক ভাবনায় সে রোমাঞ্চিত হল। ক্ষমা চেয়ে নিয়ে অবনী বিড়ি এগিয়ে দিল দুলারীর দিকে; এই নাও, ধরাও। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে গো। আমি তো জানতাম না।
দুলারীর পুরুষ্ট ঠোঁটে হাসি ঢেউ হয়ে ছড়িয়ে গেল, বিড়িতে টান দিয়ে সে বলল, নোংরা কাজে নেশা-ভাং না করলে চলে না। এসব কাজে মনটাকে একটু হালকা-ফুলকা রাখতে হয়। মন চাঙ্গা না হলে অপরের দুর্গন্ধ সাফ-সুতরো করা যায় না।
তিনজনে বিড়ি টানতে টানতে হাঁটছিল।
রাস্তার লোকে হাঁ করে দেখছিল ওদের। দুলারী আর জয়কিষাণের কোনো হৃক্ষেপ নেই ওসবে। সামান্য অস্বস্তিতে পথ হাঁটছিল অবনী। চেনা-জানা কেউ দেখে ফেললে মুশকিল। হাজার-গণ্ডা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। মানুষের মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ অনেক সময় বিরক্তির কারণ হয় অন্যের।
অবনী দ্রুত পায়ে কদবেলতলার পাশ দিয়ে মড়িঘরের কাছে চলে গেল। রোদে থৈ থৈ করছে চারপাশ। পিচরাস্তার ওপাশে বাঁশ ঝাড়ে একটা ঘুঘু এক নাগাড়ে ডেকে চলেছে। সেই একটানা শব্দে ক্লান্তির আভাস ফুটে ওঠে। অবনী যাবতীয় ক্লান্তি মুছে ফেলে মুক্তি প্রার্থনা করছিল এই বিপদ থেকে। মাত্র তিনদিনেই বিষিয়ে উঠেছে হাসপাতালের পরিবেশ। একটা বউ ঘুম কেড়ে নিয়েছে সবার। মরার আগেও বউটাকে ভয় করত সবাই। মরার পরে সেই ভয় চারগুণ ছাপিয়ে গিয়েছে। লাশ দেখে এসে হাত-পা ছড়িয়ে চারা আমগাছতলায় বসে পড়ল জয়কিষাণ। কপালের ঘাম মুছে সে বলল, এ যে পচে-গলে খতরনাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহুৎ বাস মারছে বডি থেকে। এ বাসটাই খারাপ। নাকে ঢুকলে শরীলের তাগত হারিয়ে যাবে। যা কিছু করতে হবে মুখে গামছা বেঁধে করতে হবে। তবে সবার আগে গাড্ডা খোঁড়া দরকার। আর গাঁজার জন্য কোদাল ঝুড়ি গাঁইতির দরকার। আমরা তো এখানে খালি হাতে এসেছি। তা কর্তা, তোমাকে এসব যোগাড় যন্তর করে দিতে হবে।
অবনী সঙ্গে সঙ্গে বলল, ওসব নিয়ে তোমাদের ভাবতে হবে না।
–তাহলে তো আর কথা নেই। জয়কিষাণ নড়েচড়ে বসল, তবে এসব কাজে নামার আগে গলা ভেজানো দরকার। দারু-পানি এখানে কোথায় মিলবেক? দেশী হলেই চলবে। অবনী হাসল, সবই পাওয়া যায় এ গাঁয়ে। শুধু টাকা থাকলেই হল। টাকা থাকলে এখানে বাঘের দুধও পাওয়া যাবে।
-তাহলে সবার আগে চলো ঐ কাজটা সেরে আসি। জয়কিষাণের কথায় অবনী খুশি হল, সেই ভালো। চলো তাহলে।
পাকা রাস্তা শেষ হলে বাঁশবাগানের ছায়ায় ঘেরা পথ। মাটির পথ কুলবেড়িয়া হয়ে সোজা চলে গিয়েছে পলাশী। বেশি দূর নয়, বাজার ছাড়িয়ে ক পা গেলেই বাঁশবাগানের ভেতর মাটির হাঁড়িগুলো যত্ন করে সাজানো। ওখানে দেশী মদ বিক্রির দোকানটা লোকচক্ষুর আড়ালে। বাঁশের বাতা দিয়ে বেঞ্চি বানিয়ে সাজিয়ে রেখেছে মালিক। দোকানদার থাকে একটা গুমটি দোকানের ভেতরে। পয়সা সঠিক পেলেই মদের বোতল এগিয়ে দেয় সে। নচেৎ ঝগড়াঝাটি হাতাহাতি লেগেই আছে। প্রায়ই পুলিশ আসে এখানে। হপ্তা নিয়ে চলে যায় থানায়।
জয়কিষাণ আর দুলারী বোতল কিনে একটা পিটুলি গাছের ছায়ায় গিয়ে বসল। সেদ্ধ ছোলা এখানে চাট হিসাবে পাওয়া যায়। তা ছাড়া চানাচুর ওদের সঙ্গে ছিল।
মদের বোতল হাতে নিয়ে জয়কিষাণ উশখুশ করছিল ছিপি খোলার জন্য। অবনী আসার পরে সে আর কালবিলম্ব করল না। নেশা করাটা তার কাছে জীবনের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ। এ কাজে অযথা বিলম্ব সে পছন্দ করে না।
তিনটে কাচের গ্লাসে মদ ঢালল জয়কিষাণ।
অবনী প্রথম থেকেই মানা করল, এসব আমি ছুঁয়েও দেখিনি জীবনে। তোমরা প্রাণ ভরে খাও। আমি তোমাদের পাশে বসে দেখব। ওতেই আমার নেশা হয়ে যাবে। হায়-হায় করে উঠল জয়কিষাণ, গলায় আফসোস ফুটিয়ে বলল, তা কি হয় কর্তা। এক জায়গায় দু-রকম বিচার হয় না গো! খেলে তিনজনে মিলে খাবো। নাহলে খাবো না টান মেরে ছুঁড়ে ফেলে দেব।
অবুঝ হয়ো না। পয়সার জিনিস নষ্ট করা পাপ। অবনী বোঝাতে চাইল জয়কিষাণকে। জয়কিষাণ শোনার মানুষ নয়। সে ডানে-বাঁয়ে ঘাড় দুলিয়ে বলল, খেলে তিনজনে মিলে খাবো নাহলে খাবো না। এই নাও কর্তা, ধরো। টুকে খেলে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না।
লাভ-ক্ষতির কথা নয়, অবনী ভাবছিল শুভ আর সরস্বতীর কথা। ওরা মাতাল মানুষকে একদম দু-চক্ষে দেখতে পারে না। মাতাল দেখলে ভয়ে সরস্বতীর গলা শুকিয়ে আসে। শুভ নাক কুঁচকে বলে, যারা মাতাল তারা দাঁতাল হাতির সমান। পাগলা হাতির যেমন কোনো জ্ঞানগম্যি নেই-মাতালেরও ঠিক তেমন দশা।
