তিন দিন হয়ে গেল বউটার লাশ পড়ে আছে মড়ার ঘরে। বেওয়ারিশ লাশ, কবর না দিলে দুর্গন্ধ যাবে না। কিন্তু কবরটা দেবে কে? গাঁয়ের কোনো মানুষই সাহস করে এগিয়ে আসছে না একাজে। ফলে দুর্গন্ধে বিষিয়ে উঠেছে বাতাস। শুধু ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়ে এই তীব্র দুর্গন্ধ রোখা যাবে না।
বাতাস সর্বত্রগামী।
সারা হাসপাতাল চত্বরে ভয়ের একটা মেঘ ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মতো ভয়ংকর আকার ধারণ করছে মুখে মুখে। যে যেমন পারছে গুজবের পালক গুঁজে দিচ্ছে আতঙ্কভরা বাতাসে।
তিন দিনের পচা লাশ ছুঁতে চায় না কেউ। তবু অবনী আগ বাড়িয়ে বলল, সঙ্গে আর একজন কাউকে পেলে আমিই সত্ত্বার করে দিতাম। সকার হয়ে গেলে ভয়ের আর কোনো কারণ থাকত না।
ডাক্তারবাবু দিদিমণিরা সব শুনলেন যে যার মতো। হাসপাতালে এমন ঘটনা এই প্রথম। ভয়ের যতই আলোচনা হোক না কেন-ফুঙ্কারে সব উড়িয়ে দেন ডাক্তারবাবু। জোর গলায় তিনি বলেন, আমি ওসব ভূত-ফুত মানিনে। ভূত বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। ওসব দুর্বল মনের গল্পকথা।
দিদিমণিরা দু-দিকেই আছেন। তাদের মুখে হা-না কোনো জবাব নেই। এর মধ্যে অতসী দিদিমণি বলেন, একটা মেয়েলী গলার স্বর আমি বহুবার শুনেছি। কান্নাটা মেল-ওয়ার্ডের কাছ থেকে আসে। সারা হাসাপাতালের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। এগুলো তো মিথ্যে নয়। সব নিজের কানে শোেনা।
-সব মানলাম কিন্তু… ডাক্তারবাবু বিরক্তিতে চুপ করে গেলেন। দশ চক্রে ভগবান ভূত-এর বেশি কিছু তিনি জানেন না।
থানায় খবর পাঠিয়েছেন তিনি। থানা থেকে পুলিশ এসেছে হাসপাতালে। দু-জন পুলিশ রাতে ডিউটি দেয় এখন। তারাও শুনেছে এই আর্তনাদ। ভয়ে কাঠ হয়ে আছে তারা।
পঞ্চায়েত প্রধান হাসপাতালে ঘুরে গিয়েছেন বার তিনেক। সব শুনে তার কপালেও ভাঁজ পড়েছে চিন্তার। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়েছে সদর থেকে জমাদার আসবে লাশ পুঁততে। তাকে সাহায্য করবে অবনী। মাটির তলায় শরীর ঢেকে গেলে ভয়ও চাপা পড়ে যাবে। এই আশায় সময় পার করছেন ডাক্তারবাবু। যত তাড়াতাড়ি এই আলোচনা বন্ধ হয়–ততই মঙ্গল।
থানার ওয়ারলেসে সদরে খবর পাঠিয়েছেন ডাক্তারবাবু। থানার ওসি তার পাশে আছেন। তিনি সাহস দিয়ে বলেছেন, আমি আপনার সঙ্গে আছি। ভয় পাবেন না। কোনোরকম চাপের কাছে মাথা নত করবেন না। কোনো কিছু হলে আমাকে খবর পাঠাবেন। আমি ঠিক পৌঁছে যাবো।
অবনীর আগে আগে হাঁটছিল সুফল ওঝা। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে তাকে জামাই আদরে বসাল অবনী। খবরটা কানে যেতেই বিরক্তি প্রকাশ করলেন ডাক্তারবাবু, সুফল ওঝাকে আবার কে ধরে আনল? ওকে এখান থেকে চলে যেতে বলল। ওর এখানে কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের বিপদ আমারই সামলে নিতে পারব।
রসের কলসী পাহারা দিতে গিয়ে রাতের বেলায় ভূত দেখেছে গিয়াস। একটা বউ সাদা শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে বাঁকা খেজুরগাছের গোড়ায়। তার আঁচল উড়ছে কুয়াশায়। গিয়াসের সাথে চোখাচোখি হতেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল বউটা। আর ঠিক তারপরেই জ্ঞান হারিয়ে ঘাসে লুটিয়ে পড়েছিল গিয়াস। হিমজলের স্পর্শে অনেক পরে তার জ্ঞান ফেরে। জ্ঞান ফেরার পরে সে আর বউটাকে দেখতে পায়নি। দেখতে না পেলেও ভয়টা তার মন জুড়ে রয়ে গেছে। এখনও সেই দৃশ্য মনে করে ভয়ে সে কেঁপে ওঠে। এসব কথা ডাক্তারবাবুকে সবিস্তারে বলতেই আবার একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়ল তাঁর কণ্ঠস্বরে, নিজের ভয়ের কথা নিজের বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখো। লোক এমনিতে ক্ষেপে আছে। আর লোক ক্ষেপিয়ে লাভ নেই।
গিয়াস মুখ নিচু করে চলে গেছে নিজের কাজে। ভূত দেখার প্রসঙ্গটায় ইতি টেনেছে সে। সকাল আটটার বাসে কৃষ্ণনগর থেকে এল জয়কিষাণ আর দুলারী। ওদের আসার সংবাদ পেয়ে ঘর থেকে ছুটে এল অবনী। এ কয়দিন তারও ঝামেলার শেষ নেই। নানা জনে নানা কথা শোনাচ্ছে তাকে। যেন যত দায় তার।
হাঁপিয়ে ওঠা অবনী বলল, তোমরা এসে গিয়েছ–যাক বাঁচা গেল! এবার একটা ফয়সাল্লা হয়ে যাবে। হাসপাতালের মানুষগুলো এবার ভয়ের হাত থেকে বাঁচবে।
তিন কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে জয়কিষাণ তার লম্বা গোঁফে হাত বোলাচ্ছিল আয়েস করে। চা-দোকানের কাঠের বেঞ্চিটাতে পাশাপাশি বসেছিল ওরা। দুলারী জয়কিষাণের বউ। সে তার ছায়া সঙ্গী। সেও সদর হাসপাতালের ঝাড়ুদার। প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ লেগে আছে ওদের। চুলোচুলি হলেও কেউ কারোর সঙ্গ ছাড়ে না, ওরা যেন একে অপরের জন্য এ পৃথিবীতে এসেছে।
দুলারীর মাথা ভর্তি কোঁকড়ান চুল, পেঁপে রঙের ত্বকের সাথে সেই চুলের অদ্ভুত একটা মিল খেয়ে যায়। কাজলটানা ওর চোখ দুটো কালী ঠাকুরের মতো, দূর থেকে দেখলে চোখ আটকে যাবে মেয়েলী শরীরের আঠায়। ওর হাসিটা মিছরি দানার চেয়েও মিষ্টি, মেটে রঙের ঠোঁটে তা যেন সর্বক্ষণ লেপটে আছে। ছাপা শাড়িতে দুলারী রানীর মতো বসে আছে কাঠের বেঞ্চিতে। পাশে বসে মন দিয়ে ও কথা শুনছে ওদের। হাত ভর্তি রঙ্গিন কাচের চুড়ি নড়াচড়ায় রিনঝিন শব্দ তুলছে বাতাসে। চা-দোকানী হা করে তাকিয়ে আছে দুলারীর গর্বিত বুকের দিকে। অবনী পাশে বসে মেয়েলী শরীরের সুগন্ধ নাক ভরে টেনে নেয়। কালোর মধ্যে দুলারীর নাক চোখ মুখ তীক্ষ্ণ। ও যে শালিক নয়, ময়না–এটা সে বুঝতে পারে।
সেই কোন ভোরে ঘর ছেড়েছে ওরা। অত ভোরে শুধু চা-ছাড়া আর কোনোকিছু পেটে পড়েনি ওদের। দুলারী হাই তুলে তুড়ি মেরে হাত দুটো আকাশের দিকে তুলল, নাস্তাপানি কিছু হলে ভালো হত। এ দোকানী টোস্ট হবেক তোমার দোকানে। চা-দোকানী ঘাড় নাড়তেই দুলারী বলল, গোটা, পাউরুটি হাফ করে সেঁকে তিন জায়গায় দাও। আগে কিছু পেটে যাক– তারপর চা খাব।
