চুনারামকে দেখে রঘুনাথ জলের মাছের মতো স্মৃতিতে টগবগে হয়ে উঠল, দাদু, আজ আমি নতুন-গাঁয়ে যাচ্ছি। আমার সঙ্গে সূর্য আচে।
কে সূর্য? সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল চুনারাম।
বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে রঘুনাথ মিষ্টি করে হাসল, নতুন গাঁয়ে ঘর। তুমি ওকে দিনের বেলায় দেখেচো। ওর বাপের নাম কপোতাক্ষ। পার্টি করে। কাঁধে ঝোলা নিয়ে ঘোরে গো!
.
০৫.
অন্ধকারের হাজার রূপ। আঁধার রাতে রঘুনাথের বুঝি চোখ জ্বলে, সে সাঁই সাঁই করে সাইকেল হাঁকায়, এঁড়ে গোরুর মতো হাঁপিয়ে ওঠে তবু ক্লান্তির কথা সে মুখ ফুটিয়ে সূর্যাক্ষর কাছে বলে না। সাইকেল চালানো এখন তার কাছে নেশার চাইতেও বেশি কিছু। সূর্যাক্ষ তার এই অতিরিক্ত আগ্রহকে ভয় পায়, বলা যায় না কখন কি হয়, তখন বিপদে পড়ে যাবে ওর পরিবার।
গাঁয়ে ঢোকার আগেই আলোর ফুটকিগুলো নাচতে লাগল চোখের তারায়। একটা পেঁচা গোমড়া মুখ নিয়ে উড়ে গেল পিটুলিগাছের মাথা থেকে। ঢালু বলে সাইকেল থেকে নেমে পড়েছে সূর্যাক্ষ আর রঘুনাথ। ধুলো পথে ওরা পাশাপাশি হাঁটছে। দুপাশে বাঁশবন আর ছোট ছোট ঝোপঝাড়। ঝিঁঝি পোকার ডাকের ভেতর থেকে আলো ছুঁড়ে দিচ্ছে অসংখ্য জোনাকি পোকা। আলোগুলো জ্বলছে, নিভছে বেশ ছন্দোবদ্ধ, চোখে রাতের আবেশ বুলিয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। ধুলোভরা পথের শরীর এখন নরম হয়ে আছে, এদিককার ধুলোর রূপ ভারী সুন্দর, বড়ো ঘরের ফর্সা টুকটুকে মেয়ের মতো তার ঘি-বর্ণ গায়ের রঙ, মোলায়েম, নরম একেবারে ধূলিচন্দনের চেয়েও সুন্দর। এই ধুলো পথ দু একবার বৃষ্টি হলেই মাখা ময়দার মতো চ্যাটচ্যাটে হয়ে যাবে, তখন কাদায় ভরে যাবে সারা পথ, হাঁটা চলায় মানুষের রাজ্যের অসুবিধা।
আজ আকাশে ফ্যাকাসে একটা চাঁদ উঠেছে, হাওয়া বইছে মৃদুমন্দ। আশেপাশের ঝোপ থেকে ভেসে আসছে রাতফুলের ঘ্রাণ। বেশ উগ্র সেই সুগন্ধ। সূর্যাক্ষ হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়াল, দাঁড়া তো। আঃ, কী সুঘ্রাণ রে! মনে হচ্ছে কাঁঠালীচাঁপা ফুল ফুটেছে। গন্ধটা চিনতে পারছিল না রঘুনাথ, সূর্যাক্ষ নির্দিষ্ট করে বলাতে সে মনে মনে মিলিয়ে নিল গন্ধটা, দুইয়ে-দুইয়ে চার হয়ে যেতেই তার পুরু ঠোঁটেও খুশি গড়িয়ে পড়ল, ঠিক বলেছিস সূর্য, এ ঘ্রাণ কাঁঠালীচাঁপা ফুলের ছাড়া অন্য কোনো ফুলের হতে পারে না। দিনের বেলায় হলে এক ছুটে গিয়ে তোকে ফুল পেড়ে দিতাম।
সূর্যাক্ষর কমনীয় কণ্ঠস্বর, জানিস রঘু, মা কাঁঠালীচাঁপা ফুল ভীষণ পছন্দ করে। আমাকে প্রায় বলে ফুল এনে দিতে। কিন্তু রাস্তার ধারে গাছ, কখন ফোটে, কে তুলে নিয়ে যায় টের পাওয়া যায় না।
–আমাদের পাড়ায় একটা মস্ত কাঁঠালীচাঁপা গাছ আছে। ওর পাতাগুলান এই খরার দিনেও তেলতেলে। রোদ পড়লে দেবদারু পাতার মতো চকচক করে। জানিস, আগে আমার মায়ের মুখ ওই কাঁঠালীচাঁপা পাতার চেয়েও চকচকে ছিল। এখন খাটতে গিয়ে খসখসে ডুমুরপাতা। মাকে দেখলে আমার ভেতরটা কষ্টে মোচড় দিয়ে ওঠে। আমার আর তখুন বেঁচে থাকতে সাধ যায় না। রঘুনাথের গলার স্বর আর্দ্র হয়ে উঠল, তুই দাঁড়া, আমি দেখচি কাঁঠালীচাঁপা ফুল পাওয়া যায় কিনা। আমি ঘেরাণ শুঁকে ফুলের কাছে পৌঁছে যেতে পারি।
-না। খবরদার যাবি নে। সূর্যাক্ষ চেঁচিয়ে উঠল ভয়ে, ওখানে সাপ আছে। কাঁঠালীচাঁপা ফুলের গন্ধে বিষধর সাপ আসে। দিনেরবেলায় এ গ্রামের বহু মানুষ তা দেখেছে।
-সাপ আমার কি করবে রে, সাপকে আমি থোড়াই ডরাই! আমি বুনো ঘরের ছেলে, সাপ-পোকামাকড় আমার কুনো ক্ষতি করতে পারবে না। রঘুনাথ কথা না শুনে রাস্তা থেকে নেমে ঝোপের দিকে চলে গেল। কাঁঠালীচাঁপা গাছটা অন্ধকার গায়ে জড়িয়ে সাঁওতাল যুবতীর মতো শুয়েছিল আকাশের তলায়। রঘুনাথ হাতড়ে হাতড়ে আন্দাজে ঠিক পৌঁছে গিয়ে ছুঁয়ে দিল গাছের সরু ডাল। মনে মনে ভাবল চাঁদ যদি আর একটু জ্যোৎস্না দিত তাহলে কত ভালো হত। তবু সে দমল না। হাত বাড়িয়ে একসময় খুঁজে নিল ফুলটা। পৃথিবী জয় করে আসার আনন্দ তার ভেতরে ছড়িয়ে পড়ল। কাঁঠালীচাঁপা ফুলটা সূর্যাক্ষর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, যাক মনে বড়ো শান্তি হচ্ছে। যদি ফুলটা পাড়তে না পারতাম তাহলে মনে মনে এট্টা দুঃখ হোত।
সূর্যাক্ষ চুপ করে থাকল। আর ক’পা এগোলেই বুড়ো নিমগাছটাকে দেখতে পাবে সে। এখানে মাচা বেঁধে বয়স্করা তাস পেটায়। হাজার কথার ফোয়ারা ছোটে সন্ধের পর থেকে। দীনবন্ধু নতুন রেডিও কিনেছে কালীগঞ্জ বাজার থেকে। সেই রেডিওটাকে গোল করে ঘিরে থাকে প্রায় জনা দশেক মানুষ। ওরা খবর শোনে, গান শোনে। যাত্রা বা নাটক হলে এই ভিড়টা আরও বেড়ে যায়, তাদের হল্লা থামাতে দীনবন্ধু মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে ওঠে, এই তোরা থামবি, যদি না থামিস তাহলে রেডিও আমি ঘরে দিয়ে আসব। ঘরে মেয়েরা শুনবে, তখন বুঝবি মজা।
রেডিও চলে যাওয়া মানে আসরের প্রাণ চলে যাওয়া ফলে হৈ-হট্টগোল থেমে যায় চোখের পলকে। মানুষের আগ্রহ-কোলাহল ফুটরসের গুড়ের মতো জুড়াতে থাকে। রাত বাড়লে এই আসর ভেঙে যায়, তখন যে যার মতো ঘরে ফিরে যায় বিড়ি ফুঁকতে-ফুঁকতে। গ্রামসমাজে বিড়ির প্রভাব অনস্বীকার্য। দীনবন্ধু রসিকতা করে বলে, কেঁদুপাতা আমাদের কাঁদিয়ে ছাড়বে গো! ধোঁয়া গিলতে গিলতে আমাদের ফুসফুস ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। তবু আমাদের হুঁশ নেই।
