-আজ কোনোমতেই যাওয়া যাবে না। এরফান জোর গলায় বলল, কাজ ফেলে আমি যাই কী করে। ঠিকেদারবাবু হঠাৎ এসে গেলে আমাকে বেইমান ভাববে। তার চোখে আমি ছোট হতে পারব না। আমি যদি যাই তো রবিবারে যাব, তার আগে কোনোভাবে সম্ভব নয়।
–ঠিক আছে তাহলে টাকা পয়সা আমাকে বুঝিয়ে দাও। আমি গিয়ে দিয়ে আসি। বাবলু বলল, রবিবারের অনেক দেরি। ততদিন কি উপোষ দেবে খয়রা বিবি?
–আমি তার কি জানি। এরফানের কথায় তেড়ে গেল বাবলু, তুমি জানবে না তো কি পাড়ার মোড়ল জানবে?
প্রায় হাতাহাতি হবার উপক্রম, লাট্টু থামিয়ে দিল ওদের, তোমরা বাপবেটায় থামবে! বিদেশ বিভূঁইয়ে মান-সম্মান না খুয়ালে দেখছি তোমাদের ভাত হজম হবে না।
দু-জনকে দুহাত দিয়ে সরিয়ে দিল লাট্টু।
হাঁপাতে হাঁপাতে এরফান বলল, কারোর চোখ রাঙানির আমি এত ধার ধারি না। যাকে জন্ম দিয়েছি তার এত গলা আমি সহ্য করব না।
–তাহলে ওকে টাকা দিয়ে দাও, ল্যাটা চুকে যাক। লাট্টু বলল।
এরফান অসহায় গলায় বলল, টাকা থাকলে তো দেব! গেল হপ্তায় জোগালদারদের হপ্তা দিতে পারিনি। ঠিকেদার বাবু যা টাকা দিয়েছিল–তা প্রায় শেষের দিকে। যতদিন তিনি না আসেন আমাকে তো দল চালাতে হবে।
বাবলু ঠোঁট কামড়ে আগুন উগলান চোখে তাকাল, তাহলে দুজনকে সমান ভাগে টাকা দিয়ে আসতে পারতে। তাহলে কারোর কিছু বলার থাকত না। তোমার একপক্ষ বিচার দেখে আমার মাথায় বিছে কামড়ে দিয়েছে।
সকালের রাগটা আবার উঠে এল দুপুরবেলায়।
পুকুরে ডুব দিয়ে এসে বাবলু দেখল তখনও ভাত ফুটছে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে। দুটোর আগে খাওয়া না হলে বাস বেরিয়ে যাবে কৃষ্ণনগরের। এরফান বলেছিল, সে যেখান থেকে হোক টাকা ধার করে এনে দেবে।
দুটোর বাস চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। এরফান ফিরে এল শূন্য হাতে। হতাশ হয়ে বলল, ভেবেছিলাম ডাক্তারবাবুর কাছ থেকে ধার এনে দেব। এতক্ষণ বসে বসে ফিরে এলাম। ডাক্তারবাবু কোথায় নেমতন্ন খেতে চলে গিয়েছে। ফিরতে অনেক দেরি হবে। ফুটন্ত ভাতের মতো ভেতরে ভেতরে ফুটছিল অস্থির বাবলু। মা তার নয়নের মণি। মায়ের অমর্যাদা সে কোনো কালে সহ্য করতে পারে না। এরফানের ব্যবহারে সে তিতিবিরক্ত। নিজের অসহিষ্ণুতা বোঝাবার জন্য সে হুঙ্কার ছেড়ে ছুটে গেল ভাতের হাঁড়ির দিকে, চিৎকার করে বলল, আমার যখন যাওয়া হল না তখন এ ভাত আমি কাউকেই খেতে দেব না।
একটা জ্বলন্ত কাঠের টুকরো উনুন থেকে বের করে সে ছুঁড়ে মারল ভাতের হাঁড়িকে লক্ষ্য করে। চোখের নিমেষে চুলা থেকে উল্টে গেল ভাতের হাঁড়ি, দাউ দাউ আগুনে লুটিয়ে পড়ল ফেন সমেত সাদা ভাত।
সেই ভাতের দিকে হাঁ-করে চেয়ে রইল এরফান। এই প্রথম সে টের পেল আগুনও রাগের কাছে নিভে যায়।
লাট্টুর চোখের সামনে সবকিছু যেন ছায়াছবির মতো ঘটে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় সে মূক, বিহ্বল। ধিকিধিকি জ্বলা মনের ক্ষোভ আগুন আজ প্রতিকুলতার হাওয়া পেয়ে দাউ দাউ জ্বলে উঠেছে–এই আগুন সহজে প্রতিরোধ করা যাবে না। এর যে শেষ কোথায় তাও জানে না সে। বাবলুকে সে অনেক বোঝনোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু কিছুতেই বুঝবে না বাবলু। নুরির নামটাকে সে সহ্য করতে পারে না। ওই একটি মেয়ে তাদের সুখের সংসারে ভাঙন ধরিয়েছে। তাই নুরিকে সে ছেড়ে কথা বলবে না, সুযোগে পেলে সে এর হিসাব সুদে-আসলে বুঝে নেবে।
অনেকক্ষণ পরে লাট্টু বলল, বাপের উপর রাগ করে ভাতের হাঁড়ি উল্টে দেওয়া তোর উচিত কাজ হয়নি।
বাবলু ফুঁসে উঠল, অমন চরিত্রহীন বাপের ভাত আমি কাউকে খেতে দেব না।
এ তোর রাগের কথা। লাট্টু বোঝাবার চেষ্টা করল, অত মাথা গরম করলে চলবে? সংসারে থাকতে গেলে সব কিছুকে মানিয়ে নিতে হবে। না হলে পদে পদে ঠকবি। রক্তের তেজ দেখিয়ে জীবনের হিসাব মেলে না-বুঝলি।
–যোগ-বিয়োগ যা করার তোমরা করো। বাবলু গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল, আমি চললাম।
–কোথায় যাবি, এখন তো বাস নেই?
-বাস না থাকুক, দুটো পা তো আছে। বাবলু হারবার ছেলে নয়, আমি হেঁটেই দেবগ্রাম চলে যাব। আর আসব না।
-পাগলামী করিস নে। লাট্টু ছুটে গিয়ে তার পথ আটকে দাঁড়াল।
হাত ছাড়িয়ে নিল বাবলু। রাগে ফুঁসতে-ফুঁসতে বলল, মার অসুখ। তার কাছে খরচাপাতি কিছু নেই। আমি না গেলে সে না খেয়ে শুকিয়ে মরবে। বাপ দেখল না বলে ছেলে যে মুখ ঘুরিয়ে নেবে এমন তো হয় না। আমাকে যেতেই হবে।
ঘাড়ে ঝোলানো একটা ব্যাগ নিয়ে বাবলু বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তার পথের দিকে শুকনো চোখে তাকিয়ে থাকল এরফান।
রোদ পড়তেই সুফল ওঝা এল ভূত খেদাতে।
তার কাঁধের উপর দিয়ে ঝুলছিল লম্বা একটা কাপড়ের থলি। তাতে রাজ্যের শেকড়-বাকড় ভরা।
সুফল ওঝার কপালে লম্বা সিঁদুরের টিপ। ওটাকে টিপ না বলে তিলক বলা ভালো। সে হাসপাতালের গেট দিয়ে নেমে সটান চলে গেল আউটডোরের দিকে। তার হাঁটা-চলা রাজার মতো।
হাসপাতালে ভূত ঘুরছে–এই খবরটা তার কানেও গিয়েছে।
বউটা গত হবার পর থেকে লম্বা কথার গুজব হাজার ডালপালা ছড়িয়েছে লোকের মুখে মুখে। রাতকালে হাসপাতালের ভেতর জল জল করে চিল্লিয়ে ওঠে সেই বউটা। তার সেই কান্না অনেকেই শুনেছে। ভয়ে হাসপাতালের দিকে এখন আর কেউ একা যাওয়া-আসার সাহস দেখায় না। ফিমেল ওয়ার্ডের রুগীরা সব পালিয়েছে বেড ছেড়ে।
