বউটার মুখে কোনো উত্তর নেই, শুধু গড়িয়ে নামছে চোখের জল। ফুলে-ফুলে উঠছে বসন্ত খুবনো ঘেয়ো ঠোঁট দুটো।
অবনী ঝুঁকে পড়ে বলল, মুখ ফাঁক করো। আমি তোমার জন্য ওষুধ এনেছি। ভালো হয়ে যাবে। পাখির বাচ্চার মতো মুখটা ফাঁক করল বউটা। অবনী প্রথমে ওষুধ না দিয়ে এক চামচ জল দিল তার মুখে। জলটুকু ঢক করে গেলার শব্দ হল। দ্বিতীয়বার আর এক চামচ জল দিতে গেলেই জলটা মুখে নিয়ে কস বেয়ে গড়িয়ে দিল বউটা। নিমেষে ঝাঁকুনি দেওয়া তার শরীরটা বন্ধন ছিন্ন করতে চাইল মাটির। এই প্রথম অবনীর সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল ভয়ে। বিপদ বুঝতে পেরে সে পাগলের মতো ছুটে এল বাইরে।
–দিদিমণি, ভেতরে চলুন। খিচুনি উঠেছে। অবস্থা ভালো বুঝছি নে।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘরের ভেতরে ব্যস্ত পায়ে ঢুকে এলেন অতসী দিদিমণি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি দেখলেন বউটার শরীর ধনুকের মতো ঠেলে উঠল উপরে, তারপর ঝড়ে ভেঙে যাওয়া কাঠটগরের ডালের মতো লুটিয়ে পড়ল মাটির বিছানায়।
চোখ ভরে জল এল অতসী দিদিমণির, অবনীকে শুনিয়ে বললেন, চলে গেল! আহা, বহু কষ্ট পেয়ে মরল বউটা। ওর আত্মার যেন সক্ষতি হয়।
অবনীর মুখে টুঁ শব্দটি নেই। সে দিদিমণির নির্দেশে ছুটল ডাক্তারবাবুকে খবরটা দিতে।
গায়ে সোয়েটার চাপিয়ে ডাক্তারবাবু এলেন পনের মিনিট পরে। সবকিছু দেখেশুনে তিনি বললেন, অবনী, এই সাদা চাদরটা দিয়ে ওর মুখটা ঢেকে দাও যাওয়ার আগে দরজার হুকটা লাগিয়ে দিও। অন্তত বাহাত্তর ঘণ্টা ডেড-বডি রাখতে হবে। এখানে বরফের কোনো অ্যারেঞ্জমেন্ট নেই। দেখি শেষ পর্যন্ত কী করতে পারি। বেওয়ারিশ লাশের এই এক ঝামেলা…।
ডাক্তারবাবু আসার সংবাদ পেয়ে ওখান থেকে সটকে গিয়েছে কানুকুড়ো। একটা খেজুরগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে জুলজুল চোখে সে খুঁজছিল বেঁচে থাকার উপায়।
.
৪২.
ধোঁয়া ওঠা আগুনের দিকে তাকিয়ে বাবলু বলল, আজ আর তোমার কাজে গিয়ে লাভ নেই, আব্বা। ড্রাইভারের হাতে মা চিঠি পাঠিয়েছে। তার কাছে কোনো পয়সা-কড়ি নেই। তুমি গিয়ে তার খায় খরচের ব্যবস্থা করে এসো। আর যদি কোনো কারণে তুমি না যেতে পারো তাহলে আমাকে দাও, আমি কেনগর গিয়ে সব ব্যবস্থা করে আসি।
আগুনের দিকে হাত বাড়িয়ে সেঁক নিচ্ছিল এরফান। কাল রাতে ছোটবিবির স্বপ্ন দেখেছে সে। কুয়োয় পড়ে গিয়েছে নুরি আর উঠতে পারছে না। অন্ধকার কুয়োয় দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। শুধু বাঁচাও বাঁচাও আর্তনাদ। কেউ নেই। শুধু বাবলু পাঁড়িয়ে আছে কুয়োপাড়ে। হা-হা হাসিতে বুক ভরিয়ে সে বলছে, যেমন কর্ম তেমন ফল। অন্যের সুখ কেড়ে নিলে নিজের কপালে আগুন ধরে।
বাবলুর চোখ থেকে আগুনের ফুলকি ছুটে যাচ্ছে নুরির দিকে, সেই ফুলকি খাক করে দিতে চায় নুরির সাজানো শরীর।
লাট্টুর ঠেলায় ঘুম ভেঙে যায় এরফানের, কী আবোল তাবোল বকছ গো বড়ভাই। উঠে বসে গিলাস খানিক পানি খাও। শোওয়ার পর বিড়বিড়ানী স্বভাব তোমার আর গেল না! স্বপ্ন ভেঙে গেছে কিন্তু তার রেশ ছড়িয়ে ছিল এরফানের চোখে-মুখে, আতঙ্কে সে নীল হয়ে শুধিয়েছিল, বাবলু কোথায়?
–ওই তো শুয়ে আছে।
–ওঃ। বুকে হাত দিয়ে আশ্বস্ত হয়েছিল এরফান। বাস্তবিক নুরির চিন্তায় তার ভালো ঘুম হয় না। শাদী করার পর থেকে কদিনই বা সান্নিধ্য পেয়েছে বউটার। যদি কোনো উপায় থাকত তাহলে সাথে করে আনত নুরিকে এখানে। নতুন বউ, তার যে একা থাকতে কী ভীষণ কষ্ট হবে তা একমাত্র খোদাই জানে। এরফান এখানে এসেও যেন তার উষ্ণ সান্নিধ্য পেতে চায়। এসব ভাবনা দুর্বল করে তোলে তাকে। ভালোবাসা সোহাগ মানেই দুর্বলতা। এসব কাটিয়ে ওঠা এরফানের পক্ষে সহজ কাজ নয়। তার আবেগ যে কোনো যুবকের চাইতে বেশি। মন করে বাস ধরে চলে যেতে কৃষ্ণনগরে। রাত কাটিয়ে ফিরে এলে কে আর টের পাবে।
লাট্টু আর বাবলু দুজনে যেন দুই দারোয়ান। ওদের চিল চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সস্তা নয়।
আগুন থেকে হাত সরিয়ে বাবলু বলল, হাত-চিঠিতে মা লিখেছে, তার শরীর ভালো নেই। ডাক্তার দেখাতে হবে। হাতে টাকা পয়সা নেই।
এরফানের কানে অসহ্য লাগছিল বাবলুর ঘ্যানর ঘ্যানর। বিরক্ত হয়ে সে বলল, তোরও তো মা। তুইও তো যেতে পারিস। শুধু আমার কি একার দায়িত্ব?
এবার আগুনে ঘি ঢালার মতো জ্বলে উঠল বাবলু, এখন নতুন বিবি পেয়ে পুরনা বিবির কাছে যেতে শরম লাগছে বুঝি? তোমার মতলবটা আমার আর বুঝতে বাকি নেই।
ছোট ছেলে ছোট ছেলের মতো থাক, মেলা ফড়ড় ফড়ড় করিস নে। তেতে উঠল এরফান, আমার এই দু-চোখ দুজনকে সমানভাবে দেখে। অধর্ম আমার দ্বারা হয় না।
-হ্যাঁ, তা যা বলেছ। বাবলু গালে হাত বুলিয়ে নিষ্ঠুর চোখে তাকাল, সেইজন্য আসার সময় ছোটবিবিকে দিলে আড়াইশো টাকা। আর খয়রা বিবির বেলায় মাত্র পঞ্চাশ টাকা। বলি পঞ্চাশ টাকায় কি হয় একজনের? কদিনই বা খেতে পারে? সে-কথা শুনে আঁতকে উঠল এরফান, ঢোঁক গিলে বলল, তুই যা জানিস সেটা সঠিক নয়। এসব কথা তোকে কে বলেছে?
কে আবার বলবে! যে বলেছে–সে তোমার পাশে বসে আগুন সেঁকছে। বাবলু তির্যক দৃষ্টি মেলে লাট্টুর দিকে তাকাল; বিশ্বেস না হলে পাশে বসে আছে শুধিয়ে নাও। সে তো আর মিথ্যে কথা বলবে না। সে তোমার এক মায়ের পেটের ভাই। বিপদ বুঝে চুপ করে গেল এরফান। বাবলু গলা চড়িয়ে বলল, আজই আটটার বাসে চলে যাও। বাজার হাট করে দিয়ে কাল চলে এসো। আমরা এদিকটা সামলে নেব।
