–আমার কিছু হবে না, দাদা। আমি দোজকের কীট। আমাকে কেউ ছোঁবে না।
রাত পাহারার ডাকেও বুঝি এই অভিমান মিশে আছে গিয়াসের। অবনীর ঘুম আসছিল না, অস্বস্তিতে সে এপাশ ওপাশ করে। সারাটা দিন তার চিন্তাভাবনার বিরাম নেই। এরফানের সঙ্গ তার কাছে সাধুসঙ্গ মনে হয়। মানুষটাকে মনে হয় যেন ফেরেস্তা। রাজমিস্ত্রির কাজ করলেও ওর মন রাজার মতো।
টানা বারান্দায় পাশ ফিরে শুলো অবনী। মশার ডানা কাঁপানো শব্দ তার কাছে ঘুমপাড়ানীর গানের মতো মনে হয় না আর। হাসপাতালে মশার বড়ো উৎপাত। আজ মশারী আনতে ভুলে গেছে সে। তাছাড়া দিদিমণি মশারী টাঙালে রাগারাগি করেন। বলেন, কেউ এসে গেলে চাকরিটা যাবে তোমার। অন-ডিউটিতে মশারী টাঙিয়ে ঘুমাতে তোমার লজ্জা লাগবে না? রুগীরা দেখলেই বা কি জবাব দেবে?
সব বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকে অবনী। পেটের দায় মহা দায়। তাকে তো অস্বীকার করা যায় না। আবার ঘুমও চাই। ঘুম না হলে শরীর ভাঙে। থানার পেটা ঘড়িটা ঢং-ঢং করে রাত বাড়ার জানান দিল। স্তব্ধতা ভেঙে খান খান হল ক মুহূর্ত। ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে বাইরে থেকে। একটা কুকুর ডাকতে-ডাকতে চলে গেল। এই হিম ঝরা রাতে সামান্য শব্দ যেন হুলু সুলু বাধিয়ে দেয় কানের ভেতর। বাথরুমে এসে চোখে-মুখে জলের ছিটে দিতে গিয়ে অবনী শুনতে পায় সেই কাতর আর্তনাদ, জল, জল। মরে গেলাম গো…!
আওয়াজটা চেনা। তবু এই মুহূর্তে মনে হয় অচেনা এই স্বর। একটা ভৌতিক আবহের পরিমণ্ডল তৈরি হয় এই স্বরে। গায়ের নোম চাগিয়ে ওঠে অবনীর। তবু সে কান পেতে শোনে, জল, একটু জল…! মরে গেলাম গো-ও-ও-ও! ভয়ে বাথরুম থেকে ছুটে সে চলে যায় ডিউটি রুমে। একটা ছায়া তার পেছন পেছন আসে। অবনী তাকিয়ে দেখে কানুকুড়ো। দাঁত বের করে খি-খি করে হাসছে। এ হাসি যেন মানুষের নয়, প্রেতাত্মার। ভয়ে গলা কেঁপে ওঠে অবনীর, তোমার আবার কি হল, খ্যাখ্যা করে হাসছো যে!
–হাসি পায়, হাসি ঠেকাতে পারি না। টেনে টেনে জবাব দেয় কানুকুড়ো।
–এত বড়ো রাত, ঘুমোও। তোমার কি ঘুম আসে না, দাদা?
–ঘুম আসে না, ভাইরে! কপালে হাত দিয়ে সটান দাঁড়িয়ে থাকে কানুকুড়ো।
তার এই ভঙ্গি দেখে আরও বিরক্ত হয় অবনী, ঘুম যখন আসছে না, তখন ঘুমের বড়ি চেয়ে নাও দিদিমণির কাছ থেকে। একটায় ঘুম না এলে দুটো খাও। তবু তুমি ঘুমোও। তোমাকে আর দেখতে ভালো লাগছে না রাতকালে।
-গরীবকে দেখতে কারোরই ভালো লাগে না, ভাই। কানুকুড়ো গলায় দুঃখ-ঝরিয়ে বলল, গরীবের মরে যাওয়া ভালো। বিশেষ করে বয়স হলে বেশিদিন বাঁচা ভালো নয়। কে তারে খেতে দেবে, পরতে দেবে?
রামায়ণ থামাও। ধমক দিয়ে ডিউটি-রুমে ঢুকে গেল অবনী।
টেবিলে মাথা দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন অতসী দিদিমণি। পায়ের শব্দে চোখ মেলে তাকিয়েছেন তিনি, কেমন ঘুমজড়ানো তন্দ্রামাখানো চোখ-মুখ। তিনি স্বাভাবিক হওয়ার আগেই অবনী হড়বড় করে বলল, দিদি, মনে হচ্ছে বসন্ত ওয়ার্ডের বউটার অবস্থা খুব খারাপ।
-কী করে বুঝলে? পালটা প্রশ্ন করলেন অতসী দিদিমণি, হ্যারিকেনের বাতি উসকে তিনি যেন কিছু খুঁজছিলেন।
অবনী বলল, শুনতে পাচ্ছেন না জল, জল আওয়াজ।
এবার জানলা খুলে বাতাসে কান পাতলেন অতসী দিদিমণি। হুড়মুড়িয়ে শব্দের সঙ্গে ঢুকে এল হিম। শব্দগুলো হাড় কাঁপানো। ভয়ে অতসী দিদিমণির চোখ-মুখ শুকিয়ে গেল, একবার তো ওখানে মানবিকতার খাতিরে যাওয়া দরকার। তুমি কি বলো অবনী?
হ্যাঁ। ঘাড় নাড়ল অবনী, আপনি আমার সঙ্গে চলুন। যা হবার হবে–আমি ভয় পাই না। বেশি কিছু হলে সঙ্গে কানুকুড়ো বুড়োকে নিয়ে নেব।
-হ্যাঁ, তাই চলো। দিদিমনি উঠে দাঁড়ালেন।
কানুকুড়ো বুড়োকে আর ডাকতে হল না, সে নিজেই এসে হাজির। হাতজোড় করে বলল, আমি যতক্ষণ আছি ভয় পাবেন নি গো মা জননী। ভূত-প্রেত সব আমার কাছে মশা-মাছির সমান। আমি থাকতে ওদের বাপেরও সাধ্যি নেই কিছু করার।
–তুমি চুপ করবে! ধমক দিয়ে তাকে থামিয়ে দিল অবনী।
অতসী দিদিমণির গা হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপছিল। মনে ভয় ঢুকেছে তাঁর। সেই ভয়ের কথা তিনি কাউকে মুখ ফুটিয়ে বলতে পারছেন না। এ এক অসহনীয় যন্ত্রণা।
হিমঝরা রাতের পৃথিবী পড়ে আছে মরা মাছের মতো। একটা নেড়ি কুকুর ঘেউঘেউ ডাকতে ডাকতে চলে গেল পালপাড়ার দিকে। মেয়েলি কণ্ঠের চিৎকারটা কাছে যেতেই তীক্ষ্ণ হয়ে কানে বিধল ওদের। এর মধ্যে কোনোমতে ওষুধ খাইয়ে ফিরে এলেই দায়িত্ব শেষ। এই কাজটুকুই কত বড় কাজ হয়ে ধরা পড়ছে এখন।
অবনী যেন দিদিমণির মনোভাব বুঝতে পারল। সে তাকে আশ্বস্ত করবার জন্য বলল, আপনাকে ভেতরে ঢুকতে হবে না দিদি। আপনি এখানে পঁড়ান। জল আর ওষুধগুলো আমার হাতে দিন। আমি ঠিক খাইয়ে দেব।
ওষুধ আর জলের গ্লাসটা অবনীর হাতে দিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন অতসী দিদিমণি।
-তাড়াতাড়ি এসো। তোমার দেরী হলে আমার চিন্তা হবে। ঢোঁক গিললেন দিদিমণি। মাজা পড়া বয়স্ক কানুকুড়ো তাকে অভয় দিয়ে বলল, মোটে ভয় পাবেন নি। আমি আছি। আমি থাকতে ভয় কিসের মা জননী। বলেছি না ভূত প্রেত সব আমার তাকে গোঁজা।
অবনী ভয়হীন চিত্তে মাথা উঁচু করে ঢুকে গেল আইসোলেশন ওয়ার্ডে। হ্যারিকেন নিভে গেছে তেল নেই বলে। সেই ভৌতিক আঁধারে দেশলাই জ্বেলে হ্যারিকেনটা জ্বালাবার চেষ্টা করল সে। পারল না কোনোমতে। হ্যারিকেনটা মেঝের উপর নামিয়ে রাখল সে। লালচে আলোয় দেখতে চাইল বউটার মুখখানা। ফর্সা ধবধবে মুখখানা গুটি বসন্তের প্রকোপে বাসি লুচির মতো জড়িয়ে আছে। তার ভেতরে জ্বলজ্বল করছে শেষ যাত্রার দৃষ্টি। কী যেন বলতে চায় ওই চোখদুটো। অবনী সাত-পাঁচ ভেবে বসে পড়ল বউটার মাথার কাছে। মিহি গলায় শুধোল, কিছু বলবে? খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার?
