–যা ঠিক হবার নয়, তা কি করে ঠিক হবে?
বিছানায় ফিরে এসে আক্ষেপে মাথার চুল ছেড়ে কানুকুড়ো। অতসী দিদিমণি এসে বলে গিয়েছেন, জিনিসপত্তর সব গুছিয়ে রেখো। কাল তোমার ছুটি হয়ে যাবে। ডাক্তারবাবু লিখে দিয়ে গিয়েছেন।
কথাটা শোনার পর থেকে মাথাটা ঠিকঠাক কাজ করছে না কানুকুড়োর। আর একটা দিন ডাক্তারবাবুর হাতে-পায়ে ধরে থাকতে পারলে ভালো হত। যাওয়ার আগে আর একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবে সে। ভাগ্যে থাকলে হবে নাহলে পগার পার হয়ে যাবে।
রাত যত বাড়ে, ভয় তত থাবা বসায় বুকের পাঁজরায়। লোহার খাটে কুঁকড়ে মুড়ে শুয়ে থাকে কানুকুড়ো। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ ঝরে পড়ে। তার ব্যথা-বেদনা সব ভালো হয়ে গেছে অনেকদিন হল। অনেকদিন আগেই তার ছুটি হয়ে যাবার কথা। কিন্তু ছুটি হলে সে মরে যাবে। খাবে কি? এখানে টাইমে খাবার। চা থেকে পাউরুটি সব টাইমে দেয়। ঘরে ছেলের বউ ফিরেও তাকায় না। মুখ ঝামটায়। চাপা গলায় বলে, মুনিষ খেটে খাও গো যাও। যদি মুনিষ খাটতে না পারো তো ভিক্ষে করে খাও। আর তা যদি না পারো তো ভাড়া দিচ্ছি দেবগ্রাম স্টেশনে চলে যাও। ওখানে কৌটো নাড়িয়ে ভিক্ষে কর। দেখবা–সারাদিনের পেটের ভাতের যোগাড় হয়ে যাবে।
জীব দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি। কানুকুড়ো আবার দার্শনিকের মতো বিড়বিড়িয়ে ওঠে। তার সুখে থাকা কেউ সহ্য করতে পারে না। সবার মাথায় যেন বজ্র পড়ে তার হাসিখুশি চেহারা দেখলে। কেন কি করেছে সে? কার পাকা ধানে মই দিয়েছে?
মনে মনে সে ভাবল-কাল যেন ডাক্তারবাবু না আসে সকালে। হে ভগবান, কাল থেকে ডাক্তারবাবুর যেন পাতলা পায়খানা হয়। ডাক্তারবাবু যেন কদিন বিছানা ছেড়ে না উঠতে পারে। ডাক্তারবাবু না এলে তাকে আর কেউ ছুটির কথা বলবে না। অন্তত আর কটা দিন সে এখানে কাটিয়ে দিতে পারবে। এরপর সে ঘরের সবাইকে মানা করে দেবে হাসপাতালে আসতে। বুড়িটা রোজ দু-বেলা আসে, এসে খোঁজখবর নিয়ে যায়। তাকে মানা করতে বুক ভেঙে যাবে তবু নিজের স্বার্থের কথা ভেবে কথাটা তার মুখের উপর বলতে হবে। বাড়ির লোকজনদের দেখলে ডাক্তারবাবুর মেজাজ বিগড়ে যেতে পারে, আর অনিবার্যভাবে মনে পড়ে যাবে বুড়োর কথা। তার চেয়ে কেউ না এলেই সব দিক থেকে মঙ্গল। কোমরে চোট না লেগে যদি পুরো শিরদাঁড়াটা তার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেত তাহলে বুঝি সব চাইতে খুশি হত সে নিজে। অল্প আঘাত স্বল্পদিনে সারে। আঘাত জোর হলে কে তাকে খেদাত হাসপাতাল থেকে?
অবনী দরজা লাগিয়ে ফিরে এসেছে ডিউটি রুমে। চেয়ারে থাকলে অতসী দিদিমণি তাকে বেশি পাত্তা দেন না। একটু দূরত্ব রেখে কথা বলেন। তবু অতসী দিদিমণির ব্যবহারে অখুশি নয় অবনী। জামার পকেট থেকে একটা মোড়ান পোস্টকার্ড বের করে বলে, দিদি, দেশ-গাঁয়ে একটা চিঠি লিখে দিতে হবে। অনেকদিন চিঠি দেওয়া হয়নি।
কার কাছে লিখেবে? অতসী দিদিমণি চিঠি লেখার সময় চশমাটা নাকের উপর ঝুলিয়ে নেন। চশমা পরলে তাকে হাই-ইস্কুলের দিদিমণির মতো লাগে।
-বড়দার কাছে চিঠি দিতে হবে। ধান কাটা শেষ হয়েছে। আগাম না জনিয়ে দিলে এবছরও ভাগ পাব না। অবনী টুল সরিয়ে দিদিমণির কাছে সরে এল, আপনি তো জানেন দিদি, প্রতিবছর ওরা আমাকে কত ঠাকায়। দেশে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসি আমি। ফসল ভালো হলেও বড়দা আমাকে ফসলের ভাগ দেয় না। ওদের যে এত কিসের অভাব বুঝি না।
অতসী দিদিমণি চুপচাপ শোনেন, এ ব্যাপারে তাঁর কোনো মন্তব্য করা উচিত হবে না। দাদা-ভাইয়ের ব্যাপার। রাগারাগি, মান-অভিমান থাকলেও একটা আত্মীয়তার আলো আছে এই সব সম্বন্ধের মধ্যে।
পোস্টকার্ডটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলেন তিনি, চিঠি লেখার আগে ঠিকানাটা যত্ন নিয়ে লিখলেন লাল কালির কলমে। বেশ গোটা গোটা পরিষ্কার লেখা। হ্যারিকেনের আলোয় জ্বলজ্বল করছে লাল রঙের লেখাগুলো। পোস্টকার্ডটা পুরো ভরে দিলেন তিনি। যা লিখেছেন তা পড়ে শোনালেন একবার। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ঠিক আছে তো, অবনী? আর কিছু জুড়তে হলে বলো লিখে দিচ্ছি।
-আপনার লেখার উপর কারোর কোনো কলম চলবে না দিদি, অবনী মুখ ভরিয়ে প্রসন্ন হাসল, এ তো লেখা নয় উকিলের চিঠি। দেখি এবার দাদা কি জবাব দেয়। এক মাসের মধ্যে উত্তর না পেলে আমি ছুটি নিয়ে দেশে চলে যাব। দেখি এবার কেমন করে ফসলের ভাগ না দিয়ে থাকতে পারে।
ডিউটি রুমের বাইরে পেঁচাটা ডেকে ওঠে কর্কশ স্বরে। লাঠি নিয়ে খেজুর গাছের ঠিলি পাহারা দেয় গিয়াস। তার গলার স্বর বাতাস ভেদ করে অবনীর কানে ধাক্কা মারে। গিয়াসের জন্য অবনীর মনটা বিচলিত হয়ে ওঠে। অমন ভালো মানুষটার সঙ্গে বিপথগামী নাফিজা ভালো ব্যবহার করে না। প্রায়ই কথায় কথায় দুঃখ দেয়। কোলের ছেলেটাকেও সে খেয়াল রাখে না। খেলতে খেলতে কাচের গুলি গিলে ফেলেছিল ছেলেটা। ডাক্তারবাবু বঙ্কষ্টে তা বের করেন। তবু নাফিজার ব্যবহারে কোনো অনুশোচনা নেই। সে বুঁদ হয়ে আছে মকবুলের প্রেমে। সব জেনে বুঝে ঝিম ধরে আছে গিয়াস। আল্লা ছাড়া তাকে দেখার আর কেউ নেই। গুড় জ্বাল দিতে গিয়ে পোড়ের সামনে ঝিম ধরে দুলতে থাকে গিয়াস। অবনী বহুবার তাকে মানা করেছে। সাবধান করে বলেছে, রাতজাগা শরীর নিয়ে অমন পোড়ের কাছে চুলো না। বিপদ কখন ঘটে যাবে কেউ বলতে পারে না।
