কানকুড়োর কেস আলাদা।
পালবাড়ির নারকেল গাছ ঝুরতে গিয়ে সে গাছ ব্যাঙের মতো ঠিকরে পড়েছে কঠিন মাটিতে। পড়েই আর উঠতে পারে নি, যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়েছে। ওর ভাগ্য ভালো মাজায় লেগেছে কিন্তু হাড় সরেনি। ডাক্তারবাবু চিকিৎসা করেছেন নিজের হাতে। পাক্কা দেড়মাস তার বিশ্রাম। দেড়মাস পরে সে পুরোপুরি সুস্থ। কিন্তু সুস্থ মানুষ হাসপাতালে থাকে কোন অধিকারে? ডাক্তারবাবু প্রায় এসে বলেন, কাল তোমাকে ছুটি দিয়ে দেব, ঘরে চলে যেও।
ঘরে গিয়ে খাবে কি কানুকুড়ো? এখানে দুধ-পাঁউরুটি, চা-বিস্কুট-ভাতের কোনো অভাব নেই। ঘরে গিয়ে কি শুকিয়ে মরবে? কে খেতে দেবে তাকে? ছেলের বউ দুচোখে দেখতে পারে না। মনে মনে গালমন্দ করে, বুড়োটা মরলে বাঁচি। ঘর জুড়ে বসে বসে শুধু খাওয়া আর বাঁশবন ভরানো। ছা:, এমন কুঁড়ে মানুষের মুখ দেখাও পাপ।
পাপ-পুণ্য অনেক দূরের পথ। তার অনেক জটিল হিসাব। আপাতত খেয়ে-পরে বাঁচতে চায় কানুকুড়ো। দরকার হলে সে ডাক্তারবাবুর পা জড়িয়ে ধরবে, তবু সে হাসপাতাল ছেড়ে যাবে না।
তিন বেলা ওষুধ দিয়ে যায় নার্স দিদিমণি। সেই ওষুধ পরে খাবো বলে মুঠো করে ফেলে দেয় বাথরুমে। কারোর সাধ্যি নেই যে কানুকুভোর কেরামতি ধরে। শুধু ইনজেকশান নেওয়ার সময় তার দৃষ্টি যেন মরা মাছের ঘোলাটে চোখ। কাতর হয়ে বলে, আর ইজিসিন দেবেন না গো, ইনজিসিন নিয়ে নিয়ে হাত দুটো আমার ঝাঁঝরা হয়ে গেল। বড্ড বিদনা হয়।
সরকারি ভাত মাগনা হয় না, সুঁচের ফোঁড়াই তো খেতে হয়। এখন কোমরের ব্যথা সেরে গিয়ে হাতে তার ভীষণ ব্যথা। সোজা হয়ে দুহাত নাড়াতে পারে না। যেন সখের হাত দুটো তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে চলে গেছে। শুধু বসে বসে কথার জাবরকাটা ছাড়া তার আর কিছু করার নেই।
সেই কানুকুড়ো অবনীকে দেখতে পেয়ে হাত গুটিয়ে নিল দাপনার কাছে।
ব্যাপারটা নজর এড়ায়নি অবনীর, চটপট সে শুধোল, কী গো বড়দা, হাতের ব্যথা সেরে গেছে?
-ব্যথা-বিদনা কি সারে ভাই? বয়স কালের ব্যথা-বিদনা চিতায় যায়। আফশোষ ধ্বনিত হল কানুকুভোর গলায়, সেই বসন্ত হওয়া বউ মানুষটা জল-জল করে চেঁচাচ্ছিল, এখন এটু থেমেছে। কেমন চেঁচানী গো, শুনলে গায়ের লুমা চেগিয়ে ওঠে।
অবনী অসহায় গলায় বলল, মনে হয় আর বেশিদিন নেই! কেন যে ভগবান এত কষ্ট দিচ্ছে বুঝি না। কী তার লীলাখেলা বোঝা দায়।
কানুকুড়ো অন্যমনস্ক হয়ে গেল কমুহূর্ত, পরে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল, ভগমান যা করে মঙ্গলের জন্য। জানো তো ভাই, কারোর পৌষমাস, কারোর সর্বনাশ। দেখ দিনে দিনে কি হয়?
এখনও ইলেকট্রিক আসে নি এ গাঁয়ে। ফলে পুরো হাসপাতাল ডুবে আছে অন্ধকারে। বাবলা গাছের মাথা থেকে উড়ে যায় কালপেঁচা। হাসপাতালের টানা লম্বা বারান্দায় দৌড়-ঝাঁপ খেলে চামচিকি। দিনের বেলায় ওরা যে কোথায় গা ঢাকা দিয়ে থাকে বোঝা যায় না। রাত হলে ওদের দাপাদাপি বাড়ে। ওদের ওড়াওড়ি কেমন ভৌতিক আর রহস্যময় মনে হয়।
ডিউটি রুমে খাতা সারছিলেন অতসী দিদিমণি। অবনীর পায়ের শব্দে তিনি মাথা তুলে তাকালেন। তারপর ঘাড় সোজা করে বড়ো দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালন। রাত সাড়ে আটটা। তার মানে আধঘণ্টা লেটে ডিউটি এসেছে অবনী। অতসী দিদিমণি এই লেট শব্দটাকে একদম সহ্য করতে পারেন না। নিজে আসেন কাঁটায় কাঁটায় আটটায়। তাকে দেখে ঘড়ি মেলানো যায়।
অবনী ব্যাগটা প্রতিদিনের মতো দরজার গোড়ায় ঠেস দিয়ে রাখল।
অতসী দিদিমণি অসন্তুষ্ট গলায় বললেন, আজও আধঘণ্টা লেট করে এলে? নাইট ডিউটিতে লেট এলে আমার চিন্তা হয়। এত বড়ো হাসপাতালে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। ভাবো তো–কোনো অঘটন ঘটে গেলে কি হবে?
অবনীর মুখে কোনো কথা নেই। দেরিতে এসে বড়ো মুখ করে কিছু বলা শোভা পায় না। এতে দিদিমণি আরও রেগে যাবেন। তার চাইতে চুপ করে থাকা ভালো।
দুটো হ্যারিকেন জ্বলছিল পাশাপাশি। তার একটা তুলে নিয়ে অবনী নিজেকে শুনিয়ে বলল, যাই, দরজাগুলো বন্ধ করে আসি।
হ্যারিকেনটা তুলে নিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল অবনী।
সদর দরজার কাছে এসে সে দেখল তখনও হা-করে মড়িঘরের দিকে তাকিয়ে আছে কানুকুড়ো, তার বয়স্ক চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে অন্ধকারে। অন্ধকারে মড়িঘরের দিকে তাকিয়ে কি দেখছে সে? মানুষের শেষ পরিণতিই মড়ার ঘর। দার্শনিক ভাবনায় হঠাৎ বুঝি আপ্লুত হল কানুকুড়ো। অবনী তার কাছে গিয়ে আলতো করে ঘাড়ের উপর হাত রাখল, বড়দা, চলো গো। রাত মিলা হল। আমি দরজা বন্ধ করব।
.
যেন আকাশ থেকে পড়ল কানুকুড়ো। অবনীর মুখের দিকে তাকিয়ে সে নিমেষে ভেঙে পড়ল ঝাঁকুনি দেওয়া কান্নায়, মন ভালো নেই, মন ভালো নেই গোয় আমার মনের যে কী হলো! মনে হচ্ছে আমার আর বেশিদিন নেই, মরে যাবো। মন বড়ো কু গাইছে। আজ আমার কী হল গো…শুধু ওপরওলা জানে। যত কথা বলে তার শতগুণ কান্না এসে ঠোকরায় তার গলা। কিসের দুর্ভাবনায় দুলে ওঠে তার শরীর। কাঁদতে কাঁদতে নাকের জল-চেখের জলে একাকার হয়ে যায় সে, বার্ধক্যজনিত ভাঙা স্বরের কল্যাণে তাকে মোটেও চিনতে পারে না অবনী। সে শুধু গায়ে হাত রেখে সান্ত্বনার গলায় বলে, চুপ করো। মাথার উপর তিনি আছেন। সব ঠিক করে দেবেন। ভেবো না তো।
