-তোমাকে আর ভগবান সাজতে হবে না। নিমেষে উত্তেজিত হয়ে উঠল সরস্বতী, পরের জন্য ঢের করেছ। এবার নিজের জন্য ভাবো। তোমার কিছু হলে আমাদের কে দেখবে?
দুঃশ্চিন্তায় মেঘলা হয়ে গেল সরস্বতীর মুখমণ্ডল।
অবনী আপন মনে বিড়বিড়িয়ে বলল, বউটা আর বাঁচবে না। একফোঁটা জলের জন্য ও যে ভাবে কাঁদে-তা কানে শোনা যায় না। সবাই পাথর হলে আমাকে যে পাথর হতে হবে তার কোনো মানে নেই।
-তোমার কিছু হলে তোমাকে কে দেখবে?
–তোমরা তো আছ। তোমরা দেখো।
রাত্রি বাড়ছিল। এরফানের ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। এ সময় রাতের বাতাস বেশ ভারী। বাতাসে হিম মিশে থাকে।
অবনী এরফানকে এগিয়ে দেবার জন্য বাতাবী লেবুর গাছ অবধি এল। তারপর এরফানই বলল, দাদা, আর আসার দরকার নেই। এবার আমি চলে যাবো।
আর একটা বিড়ি ধরাল অবনী। এরফানকে একটা বিড়ি দিয়ে বলল, আজ মনে হচ্ছে শীতটা বাড়বে। দেখ হাওয়ায় কেমন কনকনে ভাব।
বিড়ি ধরিয়ে ঘাড় নাড়ল এরফান। তারপর অন্ধকারে মিশে গেল।
ঘরে ফিরে এসে নাইট-ডিউটির তাড়ায় মেতে উঠল অবনী। ব্যাগ গুছিয়ে সে খেতে বসল রান্দায়। আজও গরম ভাত রাঁধেনি সরস্বতী। জল ঢালা ভাতের উপর দুপুরের কুমড়ো ঘাট আর একটা পেঁয়াজ এগিয়ে দিল সে।
খুব নিরুত্তাপ গলায় অবনী শুধোল, আজ ভাত করোনি?
-বললাম তো আমার শরীর ভালো নেই। নিস্তেজ গলায় উত্তর দিল সরস্বতী, যা আছে আজকের মতো খেয়ে নাও। কাল দেখা যাবে।
শীতকালে ভিজে ভাত খেতে মন করে? অবনী কিছুটা প্রতিবাদী হবার চেষ্টা করল, ঠাণ্ডা ভাত খেয়ে গেলে রাতে ঘুম পায়। ডিউটিতে ঘুমিয়ে গেলে দিদিমণি বকেন।
এবার মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল সরস্বতী, কত ডিউটি করো সব আমার জানা আছে। গিয়ে তো বিছানা পেতে ঘুমাও। রাতে এ হাসপাতালে ভূতই আসে না তো রোগী আসবে।
-ওরকম তোমার মনে হয়। অবনী বোঝাতে চাইল, রোগ-জ্বালা দিনরাত্রি মেনে আসে না। বলে-কয়েও আসে না।
সরস্বতী হাসল, যাও, আমাকে আর বোঝাতে এসো না। আমি সব বুঝি– খেয়ে-দেয়ে ব্যাগ নিয়ে চলে যাচ্ছিল অবনী। সরস্বতী ছুটে এসে সামনে দাঁড়াল, শোন, আজ আর ওই বউটার কাছে যাবে না। দিদিমণি বলছিল-বড়ো ছোঁয়াচে রোগ। আমার খু-উ-ব ভয় করে। যদি তোমার কিছু হয়ে যায়।
ভয়-মনে মনে হাসল অবনী। নিরাপত্তাহীনতা এ পৃথিবীর কেউ চায় না। সরস্বতী-ও তার ব্যতিক্রম নয়। সেই জলছবি অন্ধকারে ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে।
হাসপাতালমাঠের ঘাস বিক্রির টাকায় মুনিষ দিয়ে রাস্তায় মাটি ফেলেছেন ডাক্তারবাবু। পায়ের চড়া পড়া পথ এখন অনেকটা উঁচু। এত বড়ো বৃষ্টি গেল তবু জল জমেনি রাস্তায়।
অন্ধকার লেপটে শুয়ে আছে হাসপাতালের ঘরগুলো। সব মিলিয়ে কুড়ি বেডের হাসপাতাল। রবিবার বাদে আউটডোরে বসেন ডাক্তারবাবু। রুগীরা ওষুধ নিয়ে চলে যায়। খুব বড়ো ধরনের সমস্যা হলে তখন ভর্তির প্রসঙ্গ এসে যায়। রাত-বেরাতে কখন যে রুগী আসবে বলা যায় না। তাই চব্বিশ ঘণ্টা নার্স থাকেন ডিউটি রুমে।
নাইট ডিউটি থাকলে অবনী কামাই করে না একদিনও। গাঁয়ের হাসপাতালে রাতের ডিউটি আরামের ডিউটি। তেমন খারাপ কোনো রুগী না থাকলে বিছানা পেতে ঘুম দেয় অবনী। বেশি খারাপ রোগী কৃষ্ণনগর সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন ডাক্তারবাবু।
এ হাসপাতালে একটা মাত্র অ্যাম্বুলেন্স। ফলে ড্রাইভারও একজন। চিত্রভানু একাই সেই অ্যাম্বুলেন্সের হর্তাকর্তা। এ হাসপাতাল চত্বরে তার কথার বেশ ওজন আছে। ড্রাইভার মানুষ। কেউ সহজে তাকে চটাতে চায় না।
হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারে ঢেলায় হোঁচট খেল অবনী। উঃ যন্ত্রণার শব্দ ছিলা পিছলান তীরের মতো আচমকা বেরিয়ে গেল মুখ থেকে। শীত হাওয়া ঝাঁপিয়ে পড়ছেশরীরের উপর চাবুকের মতো। তুষের চাদরটা ভালো মতন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয় অবনী।
হাসপাতালের মেইন দরজার মুখে অদ্ভুত ভঙ্গিতে দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়েছিল দাসপাড়ার কানুকুড়ো। রোজই সে এই সময়টাতে বাইরে আসে। এলোমেলো কপা হেঁটেই আবার নিজের বিছানায় ফিরে যায়। সারাদিন তার শুয়ে থাকা কাজ। কাঁহাতক আর বিছানা আঁকড়ে শুয়ে থাকতে ভালো লাগে। বয়স হয়েছে। এখন ঘুম চাপড়ার বিলে চরতে আসা শীতের পাখির মতো, শরীরে স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধতে জানে না, কেবলই উড়ু উড়ু স্বভাব। ঘুম না এলেও নিয়ম করে খিদে পায় তার। হাসপাতালের ভাতে তার পেট ভরে না, বুড়ি তাই দুপুরবেলায় আউস ফুটিয়ে আনে তার জন্য। কানুকুড়ো এত খায় বলে বুড়ির মনে চাপা রাগ। প্রায় শুধোয়, হ্যাঁ গো, তোমার পেট সাফ হয় তো। পেটে গ্যাস-অম্বল হয় না তো?
কানুকুড়ো ফোকলা মাড়ি দেখিয়ে হাসে, ভগবান এই হজমশক্তি ছাড়া আর কোনো কিছু আমাকে দেয় নি। সে বড়ো কৃপণ গো! তার সাথে দেখা হলে আমার হাতাহাতি হয়ে যেত।
দাসপাড়ার ঘরগুলো হাসপাতালের বারান্দা থেকে দেখা যায়। দায়ে-অদয়ে মানুষজন চিকিৎসার জন্য ছুটে আসে এখানে। এ গ্রামে হাতুড়ে ডাক্তার ছাড়া পাস করা ডাক্তার নেই। একজন হোমিওপ্যাথি পুরিয়া দেয়। তাতে কারোর রোগ সারে, কারোর আবার সারে না।
কানুকুড়ো ঠাট্টা করে বলে, নেশা-ভাং করলে ঐ গুড়ো ওষুধে কোনো কাজ হয় না। বুড়ি বলে, কাজ হয় গো, কাজ হয়। শ্রদ্ধা-ভক্তি ভরে খেতে হবে। ছটফট করলে ও ওষুধে কাজ হবে না।
