অবনী বলল, তুমি ফের বিয়ে করাতে ওর একটু অভিমান হয়েছে। অভিমান হওয়া তো স্বাভাবিক। ছেলে বড়ো হয়েছে। এবার ওর বিয়ে দিয়ে দাও। দেখবে–আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।
এরফান ঘাড় নেড়ে সায় দিল, হ্যাঁ, তুমি যা বলেছ ঠিক বলেছ। বিয়েটা দিয়ে দিলে ছেলের হয়ত রাগ পড়ত। কিন্তু ভালো মেয়ের সন্ধান পাচ্ছি কই। তোমার যদি নজরে পড়ে, আমাকে বলল। দু-হাত এক করে দেব।
সন্ধে লাগার আগে ওরা ফিরে আসে হাসপাতালের সীমানার মধ্যে। আইসোলেশন ওয়ার্ডের বউটা চিৎকার করে কাঁদে, জল, একটু জল।
তার গোঙানী ভরা কথাগুলোয় ভয়ের রেণু ছড়িয়ে থাকে। অবিকল ভূতের মতো লাগে তার গলা। মনে হয় পাতালপুরীর ভেতর থেকে কোন এক প্রেতাত্মা নিজেকে উদ্ধার করার জন্য মরিয়া হয়ে সাহায্য প্রার্থনা করছে। হাসপাতালের অনেকেই এখন আর ঐ ঘরটার পাশ দিয়ে যায় না। আসা-যাওয়ার রাস্তা ভয়ে অনেকে বদলে ফেলেছে এখন। রাস্তা বদলালেও ভয়ের কোনো কম বেশি হয় না। ভয় হচ্ছে অলতার মূল। যার শেকড় খুঁজে পাওয়া দায়।
অতসী দিদিমণি কেন, এই হাসপাতালের কোনো নার্স-দিদিমণি বউটাকে ওষুধ খাওয়াতে যায় না। এমন কী ডাক্তারবাবুও ভয়ে চুপচাপ। শুধু কাগজে ওষুধ লিখে নিজের দায়িত্ব সেরে দেন।
কারা যে বউটাকে এখানে রেখে পালিয়ে গেছে এ নিয়ে প্রচুর আলোচনা, গবেষণা হল হাসপাতালে। মুখটা কারোরই চেনা নয়। আশেপাশের গ্রামে বাড়ি হলে কেউ না কেউ চিনত বউটাকে।
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে অবনী বলল, বউটা মনে হয় বাঁচবে না। যেভাবে বসন্ত ফুটেছে ওভাবে কারোর বুঝি হয় না।
এরফান বিজ্ঞের স্বরে বলল, যার যা ভাগ্যে লেখা আছে তা তো হবেই। নসিবকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। তবে তোমার মুখে শুনে আমারও ভীষণ খারাপ লাগছে। কষ্ট পাওয়ার চেয়ে চলে যাওয়া ভালো।
চুপ করে থাকল অবনী। কারোর মৃত্যু কামনা করা অশোভন। তবু মনে মনে সে চাইল–এভাবে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। চলে যাওয়াই ভালো। সুস্থ হয়ে সে ফিরে যাবে কোথায়? যাওয়ার সব রাস্তা তার বন্ধ। যারা অসুখে ফেলে পালায় তাদের কাছে সুস্থ হয়ে ফিরে যাওয়ার কোন অর্থ হয় না।
সরস্বতী সন্ধেবেলায় শুভকে নিয়ে বসেছে পড়াতে। হ্যারিকেনের আলোয় মাতাল হয়ে উড়ছে শ্যামাপোকা। সেই আলোর দিকে তাকিয়ে কত কথা মনে পড়ছে তার। বিশেষ করে বালিঘাইয়ের স্মৃতি সে ভুলে থাকতে পারে না। বাবার কথা তার বারবার করে মনে পড়ে। বুকের গভীর থেকে উঠে আসে কান্না। সে কাঁদে একা একা।
অবনী যখন এরফানকে নিয়ে ঘরে এল তখনও উদাস হয়ে বসেছিল সরস্বতী। আজ সন্ধেবেলায় সে চুল আঁচড়ায়নি, সিঁদুরও পরেনি। কেমন ভার হয়ে আছে তার সুন্দর মুখটা। দেখলে মনে হয় চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে সে।
পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকাল সরস্বতী। কপালে নড়ে উঠল বিরক্তির রেখাগুলো, এই বুঝি ঘরে ফেরার সময় হল! এত বাউণ্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়ালে সংসার পাতার কি দরকার ছিল?
অবনী সরস্বতীর কথার ঝঝে বিব্রত, সামান্য সঙ্কুচিত। পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার জন্য সে বলল, সারাক্ষণ হাসপাতাল চত্বরে ঘুরঘুর করতে মন করে না। তাই একটু বাঁধের ধার দিয়ে ঘুরে এলাম। এ সময় বাঁধের ধারে ঠাণ্ডা হাওয়া বয়। সেই হাওয়ায় শরীরটা জুড়োয়।
সরস্বতী এরফানকে বসতে বলে চোখ তুলে তাকাল, যেখানেই যাও, সংসারের কাজ সামলে যেও। একা আমার ঘাড়ে অত দায়িত্ব দিও না। আমারও শরীর ভালো নেই। আমিও হাঁপিয়ে উঠি।
একটা কাঠের চেয়ারে গা এলিয়ে বসেছে এরফান।
শুভ হা-করে তাকিয়ে আছে মাঝবয়েসী মানুষটার দিকে। বাবলুর মুখে অনেক কথাই শুনেছে সে এরফান চাচার। সে সব অনেক কথাই এখন ভিড় করে আসে শুভর মনে।
সে কিছু বলার আগেই এরফান শুধালো, এখন তোমাদের ইস্কুল ছুটি আছে বুঝি?
ঘাড় নেড়ে সায় দিল শুভ।
এরই ফাঁকে লাল চা করে আনল সরস্বতী। একটা কাপ এরফানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, চা খান দাদা। সকাল থেকে খেটে খেটে শরীরে আর জোর পাই না। মন-মেজাজ তাই ভালো নেই।
এরফান সহজ হাসি হাসল। চায়ে চুমুক দিয়ে সে দেখছিল ঘরের চেহারাখানা। চার দেওয়ালের মাঝে এ সংসারে দেখার মতো কোনো জিনিস নেই, শুধু সরস্বতী ছাড়া।
অবনী বলল, খালি হাতে দেশ ছেড়ে এসেছিলাম। ডাক্তারবাবু না থাকলে ভেসে যেতাম, দাদা। ডাক্তারবাবুর দয়ায় আমার এই চাকরি। আজ তার দয়ায় দুটো করে খাচ্ছি।
উপকারীর উপকারের কথা ভোলেনি অবনী। কৃতজ্ঞতায় চকচক করছে তার চোখের তারা।
এরফান চা শেষ করে বিড়িতে দম দিয়ে বলল, এখনও এ সংসারে কিছু মানুষ আছে যারা আল্লার ফরিস্তা। তাদের দোয়ায় চাঁদ-সূয্যি খেলছে গো…। সরস্বতী কথা শুনছিল এক মনে। দুম করে সে বলে বসল, আমি শুনলাম তুমি বসন্ত-ঘরে বউটার কাছে যাও। বলি, তোমার কি জানে ভয়-ডর নেই?
অবনীর মুখে কোনো কথা নেই। অতসী দিদিমণি নিশ্চয়ই সব বলেছে সরস্বতীকে নাহলে হাসপাতালের ঘটনা সে জানবে কি করে?
উত্তর না পেয়ে সরস্বতী এরফানকে সাক্ষী রেখে বলল, দাদা, বলুন তো, ওর কি এত আগ বাড়িয়ে সব জায়গায় যাওয়া উচিত। ওর যে বউ ছেলে আছে এটা সে ভুলে যায়।
ডিউটিতে থাকলে না গেলে কি চলে? অবনী বোঝাতে চাইল। রোগকে ভয় পাওয়া ভালো কিন্তু রুগীকে ডরলে সে বেচারী বাঁচে কি করে?
