তাড়াহুড়ো করছিলেন অতসী দিদিমণি। তার তাড়াহুড়োর কোনো কারণ বুঝতে পারল না অবনী। হাত বাড়িয়ে কাগজে মোড়ানো ওষুধগুলো নিয়ে নিল সে। এখানে জলের কোনো ব্যবস্থা নেই। ওষুধ তো হাওয়া দিয়ে গেলানো যাবে না। বিরক্ত অবনী দিদিমণিকে বলল, একটু জলের ব্যবস্থা করে দিন। ওষুধগুলো আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
-ঠিক আছে আমি জল নিয়ে আসছি। তুমি দাঁড়াও। ফুল তোলা রুমালে কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছলেন অতসী দিদিমণি, তারপর ব্যস্ত হয়ে বললেন, আমি যাব আর আসব। তুমি কোথাও যেও না অবনী। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, কী ফ্যাসাদ! কী যে হবে–ভগবানই জানে!
কাচের বড়ো গ্লাসে জল নিয়ে এলেন দিদিমণি। চোখ-মুখ তার শুকিয়ে গিয়েছে ভয়ে। বেশি কথা বলতে চাচ্ছেন না ইচ্ছে করে। কথা বললে দুর্বলতা যদি ধরা পড়ে যায় অবনীর কাছে, তাহলে সেবার নাম করে মহান সাজবেন কি করে?
অবনী বহু কষ্টে ওষুধ খাওয়াল বউটাকে, অতসী দিদিমণি তাকে ছুঁয়েও দেখলেন না। এমন কি কাছেও গেলেন না তিনি। শুধু আপন মনে বিড়বিড়িয়ে বললেন, কার কপালে যে কি লেখা আছে কে জানে! যা ছোঁয়াচে রোগ! ভাবতেই পারছি না।
অতসী দিদিমণি চলে যাওয়ার পর একা হয়ে গেল অবনী। দুর থেকে বউটার মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যথায় বুক ভেঙে গেল তার। মানুষ এত নিষ্ঠুর হতে পারে? কিসের জন্য তাহলে এই পৃথিবীতে আসা। মানুষ না হয়ে পাথর হলে বুঝি ভালো হত। এত কষ্ট পেতে হত না। রোগ জ্বালায় জ্বলে পুড়ে মরতে হত না। দেখে-শুনে যা মনে হয় বউটা নিশ্চয় কোনো বড়ো ঘরের। যারা তাকে ফেলে পালিয়েছে তারাও নিশ্চয়ই বড়োঘরের। অসুখ-বিসুখ কি ঘর বুঝে আসে!
মনে একদলা ঘেন্না নিয়ে অবনী ডিউটি রুমের কাছে এসে দাঁড়াল।
অতসী দিদিমণি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, কোয়ার্টারে যাও। এখানে আর দাঁড়িও না। তোমার গা দিয়ে পচা-দুর্গন্ধ বেরচ্ছে। তাড়াতাড়ি জামা-কাপড় ছেড়ে স্নান করে নাও। না হলে কী হয় বলা যায় না তো! যা দেখলাম-চোখও এর আগে এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখেনি। হায় ভগবান, কেন দেখলাম!
০৯. চুনকাম আর মেরামতির কাজ
৪১.
চুনকাম আর মেরামতির কাজ চলছে পাশাপাশি।
এরফানের হাতের কাজে মুগ্ধ সবাই।
অবনী বলল, এমন মানুষ লাখে একটা পাওয়া যায়। এমন সাচ্চা মানুষ আজকাল নজরে পড়ে কম।
কথাটা চুপচাপ শুনছিল সরস্বতী। আর থাকতে না পেরে বলল, হ্যাঁ-হ্যাঁ, কেমন মানুষ জানা আছে। বুড়ো বয়সে যে আবার বিয়ে করেছে তার চরিত্র যে কত ভালো তা নিয়ে আমার কাছে আর ঢাক-ঢোল পিটিও না।
কথা বলতে বলতে কেমন চুপসে গেল অবনী। মনে মনে সে ভাবল-এরফান আবার বিয়ে না করলেই পারত। একটা বউ ঘরে থাকতে আবার অন্য কারোর হাত ধরা, মোটেও এটা ভালো স্বভাবের লক্ষণ নয়। সরস্বতী যা বলছে-তাকে একেবারে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সরস্বতী বলল, মানুষকে এক ঝলক দেখেই বিচার করতে যেও না। এত ঠকছু তবু শিক্ষা হয় না।
অবনী মিইয়ে গেল কেমন, তার মেলামেশাটা সবার সঙ্গে বড়োই আন্তরিক। মানুষের দোষ তার খুব কম নজরে পড়ে। এরজন্য তাকে যে ঠকতে হয়েছে তা নয়। তার কি আছে যে মানুষে ঠকিয়ে নেবে? এরফান-এর প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চাইল সে। সরস্বতী যা ভালোবাসে না তা নিয়ে হৈ-চৈ করতে মন সায় দেয় না। তবে এতদিনে তাদের মেলামেশাটা গাঢ় হয়েছে। এরফান সময় পেলেই চলে আসে কোয়ার্টারে। অবনীই তাকে ডাকে। বড়ো মুখ করে বলে, সময় যখন কাটে না তখন আমার বাড়িতে চলে এসো। গল্প করে সময় কেটে যাবে।
গল্পে-গল্পে একদিন বিয়ের কথাটা বলে ফেলেছে এরফান। সহজ সরল না হলে কেউ কি নিজের সবকথা এমনভাবে অন্যের কাছে বলতে পারে? সরস্বতী সব শুনেছে নিজের কানে। শোনার পর থেকে মানুষটার প্রতি তার ভক্তি-শ্রদ্ধা সব উঠে গেছে।
অবনী তাকে কত বুঝিয়েছে, যে যা করল তাতে আমাদের কী এসে যায়। আমাদের সাথে দু-দিনের সম্পর্ক, অত গভীরভাবে না ভাবলেই চলবে। তাছাড়া, এরফান এখানে আসে, দুদণ্ড গল্প করে চলে যায়। ও তো আমাদের কোনো ক্ষতি করেনি। এরফান এমন স্বভাবের মানুষ–ওর দ্বারা কারোর কোনো ক্ষতি হবে না। চৌবাচ্চাটা ভেঙে গিয়েছিল অবনীর, সর্বদা জল চুয়াত, গচ্ছিত জল বেরিয়ে যেত, একদিন এরফানের নজরে পড়তেই আগ বাড়িয়ে বলল, দাঁড়াও, তোমাদের চৌবাচ্চাটা আমি আবার নতুন করে বানিয়ে দেব।
কথা রেখেছিল সে। ইট-সিমেন্ট দিয়ে নতুন একটা চৌবাচ্চা বানিয়ে দিয়েছিল সে। কাঁচা সিমেন্টের প্লাস্টারের উপর কর্নিকদিয়ে লিখে দিয়েছিল অবনী +সরস্বতী। শুধু ভাব-ভালোবাসাতেই এসব সম্ভব। নাহলে কার এত অফুরন্ত সময় আছে হাতে।
অবনী আর এরফান মুখোমুখি বসে বিড়ি খায়, বিড়বিড়িয়ে গল্প করে নিজেদের মধ্যে। কত রকমের সুখ-দুঃখের গল্প। ওরা দুটিতে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় বাঁধের গোড়ায়। হাঁ-করে তাকিয়ে থাকে জল সরে যাওয়া বুড়িগাঙের দিকে। অবনী আক্ষেপ করে বলে, মানুষের জীবনও মনে হয় এই বুড়িগাঙের মতো। আজ জল আছে, কাল শুকনো খটখটে।
এরফান শব্দহীন হাসে, তা যা বলেছ। এ জীবন কোথায়, কখন যে গোত্তা খায় কেউ আগাম বলতে পারে না। অন্যমনস্ক হয়ে যায় সে, আপন মনে বলে চলে, নতুন বউকে সহ্য করতে পারে না বাবলু। আমি তাকে কত বুঝিয়েছি। সে কথা শোনার ছেলে নয়। ওর ধারণা নতুন বউ আসার ফলে খয়রা বিবির কদর কমে গেছে আমার কাছে। আমি তাকে দেখি না, শুনি না। জান ভাই–এসব ওর মনগড়া। আমি দু-জনকে সমান দেখার চেষ্টা করি।
