ব্যাগ হাতে মিষ্টির দোকানে নয়–সে এগিয়ে গেল ভুষিমাল দোকানে। ফর্দ অনুযায়ী দরকারী জিনিসপত্তর কিনল সে। টাকার কথা মাথায় রেখে কেনাকাটি সারল সে।
ফিরে আসার সময় গড়িয়ে গেল বেলা।
হাসপাতালের মাঠে ঢুকে লাট্টু দেখল বাবলু ভাব জমিয়ে ফেলেছে স্টাফ-কোয়ার্টারের ছেলেগুলোর সঙ্গে। সবার সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা ওর প্রচুর। সবাইকে মানিয়েও নিতে পারে।
বিদেশ বিভূঁইয়ে এই গুণটুকু না থাকলে চলে না।
এরফান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল অবনীর সঙ্গে। কথার ফাঁকে-ফাঁকে গাল ভরিয়ে হাসছিল সে।
অবনী শুধোল, এখানে তাহলে কতদিন থাকা হবে?
এরফান বলল, যত তাড়াতাড়ি পারি কাজ শেষ করে চলে যাব। কাজ তো একটা নয়, অনেক বাকি আছে। সারা জেলা ঘুরে ঘুরে কাজ হয় আমাদের। ঠিকেদারবাবু সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে দিয়েছে।
–তা তো দেবেই। যোগ্য মানুষকে দায়িত্ব দেয় সবাই। অবনী এরফানের মুখের দিকে তাকাল। রোগা প্যাংলা চেহারা নয়-ছিমছিমে গতর। বয়স হয়েছে–এক নজর দেখলে অনুমান করা যায়। বয়স হলেও শ্রী হারায়নি চেহারা। চোখের দৃষ্টি এখনও ঠিক আছে।
এরফান বলল, একটু চা বানাই। সন্ধে নেমে এল। এদিকে মনে হয় ভালো শীত পড়ে।
অবনী বলল, শীতকালে শীত তো পড়বেই। তবে খুব বেশি শীত পড়ে না এদিকে। যেটুকু শীত পড়ে তা সহ্য করা যায়।
চা খেল না অবনী। তার মন পড়ে আছে হাসপাতালে। ডিউটি চলছে। ডিউটিতে ফাঁকি দেওয়া অপরাধ। তাছাড়া অতসী দিদিমণি রাগ করেন। গাল ফুলিয়ে বলেন, যারা ডিউটিতে ফাঁকি দেয় তাদের আমি দেখতে পারি না। কই তারা তো মাইনে নেবার সময় কম নেয় না।
অতসী দিদিমণির সঙ্গে ডিউটি থাকলে অবনী বেশি বেরতে পারে না। আবার এক জায়গায় বসে থাকতেও তার মন করে না। ঘুরে বেড়ানো স্বভাব তার সাথ দিল না। ডিউটি রুমে গিয়ে সে শুনল, পেসেন্ট এসেছে গায়ে পকস নিয়ে। ডাক্তারবাবু বলেছেন, রোগীটাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে নিয়ে যেতে। বসন্ত ছোঁয়াচে রোগ। এ রোগী ওয়ার্ডে রাখা যাবে না।
হাসপাতালের বারান্দায় কুঁকড়ে-মুকড়ে শুয়েছিল বউটা। শাড়িটাই চাদরের মতো ঢাকা দিতে চাইছে জ্বরে কাতর শরীর। অবনী পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল বারান্দায়, বউটার মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তার গায়ের লোম। সুন্দর মুখটা ছেয়ে গিয়েছে জলবসন্তে। শরীরের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে জলঠোসা পড়েনি। ঘায়ে জ্যাবজ্যাব করছে পুরো দেহ। বউটা এমনভাবে পড়েছিল যে ওর নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই। বোঝা গেল প্রচণ্ড জ্বরে ধুঁকছিল সে।
অতসী দিদিমণি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, তুমি যখন ওর কাছে গিয়েছ তখন ওর নামটা জেনে নাও। বাড়ি কোথায়, ঠিকানা কি এসব তো জানা দরকার। এসব না জানলে আমি হাসপাতালের ফর্ম ভরব কি করে?
আশ্চর্য ভরা চোখ মেলে তাকাল অবনী, অতসী দিদিমণিকে শুধাল, এর বাড়ির লোক কোথায়? কারা এনেছে একে?
-কে যে এনে রেখে গিয়েছে কিছুই জানি না। শীত হাওয়া ঢুকছিল বলে দরজাটা ভেজানো ছিল। আমি ডিউটি রুমে বসেছিলাম। হঠাৎ কাতরানীর শব্দ কানে যেতেই বাইরে এসে দেখি এই বউটা শুয়ে আছে। তখনও বুঝতে পারিনি স্মল পকসের রোগী। দিদিমণি হাঁফ ছাড়লেন, আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি কিন্তু কাউকে দেখতে পাইনি। কে কোন ফাঁকে একে নামিয়ে রেখে চলে গেছে। ভাব তো মানুষ কেমন শয়তান!
রাগে-ক্ষোভে লালচে হয়ে উঠেছে অতসী দিদিমণির মুখখানা।
অবনী বলল, যেই আসুক, গোরুর গাড়ি ছাড়া একে এখানে আনা যাবে না। এ রোগী সাইকেলে বসে আসতে পারবে না।
–তুমি ঠিক বলেছ। অতসী দিদিমণি বললেন, সেই থেকে আমি আর ডাক্তারবাবু অনেক ভেবেছি, কিন্তু কোনো কূল-কিনারা করতে পারিনি। এ যে কাদের ঘরের বউ বোঝা দায়। যেভাবে মায়ের দয়া হয়েছে দেখলেই ভয় লাগে। দিদিমণি নির্দেশ দিলেন, আর দেরী না করে একে আইসোলেশন ওয়ার্ডে নিয়ে যাও। রোগটা তো ভালো নয়। ছোঁয়াচে।
ইতস্তত করছিল অবনী। কিন্তু ইতস্তত করে কোনো ফল হবে না বুঝতে পেরে সে দুহাত বাড়িয়ে বউটাকে তুলে আনল বুকের কাছে। বেশ ভারী শরীর। হাত কাঁপছিল তার। এ সময় কেউ যদি সাহায্য করত ভীষণ ভালো হত। কিন্তু সে পথ বন্ধ। নাইটের লোক আসবে আটটার পরে। ততক্ষণ শীত হাওয়ায় যুঝতে পারবে বউটা? অবস্থা দেখেশুনে ভালো ঠেকে না অবনীর।
হাঁটতে হাঁটতে সে দিদিমণির দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, ডাক্তারবাবু কি বলছেন? বউটা বাঁচবে তো, দিদি?
তা আমি কি করে বলব! হাসপাতালে যখন এসেছে তখন আমাদের সবরকম চেষ্টা করে দেখতে হবে। রোগীকে তো আমরা ফেলে দিতে পারি না। অতসী দিদিমণির কথা শেষ হল না একরকম দৌড়াতে দৌড়াতে আইসোলেশন ওয়ার্ডে পৌঁছে গেল অবনী। ছোটবেলায় তার একবার বসন্ত হয়েছিল–সেই ভয় তাড়া করছে তাকে। অতসী দিদিমণি বললেন, একে একেবারে ভেতরের ঘরে ঢুকিয়ে দাও। বারান্দায় রাখলে শীতে কষ্ট পাবে। মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে তার উপর একটা সাদা চাদর পেতে দিল অবনী। বউটাকে শুইয়ে দিয়ে সে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।
অতসী দিদিমণি বললেন, যা করার তাড়াতাড়ি করো। ডিউটি রুমে কেউ নেই। আমাকে আবার যেতে হবে। তবে যাওয়ার আগে ওষুধগুলো তোমাকে দিয়ে যাই। তুমি একটু যত্ন নিয়ে খাইয়ে দিও।
