যাদুকর! মনে মনে হেসে উঠল এরফান। এই বয়সে প্রেম চিটে ধানের মতো আবার নষ্ট না হয়ে যায়। পৃথিবীর আর কাউকে সে ভয় করে না, শুধু বাবলুকে ছাড়া। এই ছেলেটাই জন্মাবার সময় জান কেড়ে নিচ্ছিল খয়রা বিবির। হাসপাতালের ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, কেন্স ক্রিটিক্যাল। হয় বেবি নয়ত মা দুজনের একজনকে হারাতে হবে। তবু আমরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখব না।
মসজিদে গিয়ে এরফান দোওয়া মেজেছিল আল্লার। মা-ছেলে দুজনেই বিপদ কাটিয়ে ঘরে ফিরে এল। সেদিন এরফানের আর আনন্দ ধরছিল না। বস্তিতে জনে জনে ডেকে মিঠাই বিলিয়েছিল সে। সেদিনের সেই সুখ আজও চোখ বুজলে স্পষ্ট দেখতে পায় সে। মনে হয় যেন সেদিনের কথা। সময় কী ভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কিছু বুঝি মানুষের আয়ত্তের মধ্যে নেই। এখন।
ব্যাগ হাতে লাট্টু এসে দাঁড়িয়েছে এরফানের সামনে।
ঘোর কাটিয়ে সামনের দিকে তাকাল এরফান, কিছু বলবি?
লাট্টু ঘাড় নাড়ল, রাতে তো খেতে হবে। যা সঙ্গে করে এনেছিলাম তা তো দুপুরে ঠেকা দিতে চলে গেছে। টাকা দাও। বাজার থেকে ঘুরে আসি।
এরফান অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়াল, বাজার তুই চিনিস?
-না চিনলেও জিজ্ঞেস করে চলে যাব। লাট্টু বলল, এখানে মাস দুয়েক থাকতে হবে। ঠিকেদারবাবু বলেছিল–এ হাসপাতালে অনেকদিন কোনো কাজ হয়নি। শুধু চুনকাম নয়, জানলা-দরজার কাজও এখানে হবে। সিমেন্টের কাজ তো আছেই।
এরফান ঘাড় নাড়ল। একটা কাপড়ের ব্যাগ থেকে টাকা বের করে লাট্টুকে দিল। ভাইয়ের প্রতি তার বিশ্বাস অটুট। এই ভাইজান তার সুখ-দুঃখের সঙ্গী। জ্ঞান পড়ার পর থেকে এই ভাই তার সঙ্গ ছেড়ে যায়নি। তবু এরফান সতর্ক গলায় বলল, বুঝে-শুনে খরচাপাতি করবি। ঠিকেদারবাবুর আসতে সময় লাগবে। সে না আসা পর্যন্ত একটা ফুটা কড়িও পাবো না। এছাড়া হপ্তায়-হপ্তায় ঘরে টাকা পাঠাতে হবে। টাকা না পাঠালে ওরাই বা খাবে কি? ওরা তো আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
অনেক কথা ভিড় করে আসছিল লাট্টুর মনে। বড়দার সামনে সব কথা কি বলা যায়? তবু সে রেখে ঢেকে বলল, ভাবীকে অনেকদিন তুমি টাকা দাও নি। টাকা না দিলে তারই বা চলে কি করে? বাবলু রাগারাগি করছিল। ও তোমার ছিমুতে কিছু বলতে পারে না। যা বলার আমাকে সব বলে। আমি তোমাকে জানিয়ে দিলাম। এবার তুমি যা ভালো বোঝ করো।
এরফানের মুখে মেঘ নেমে এল সহসা, হ্যাঁ, আমি সব বুঝতে পারি। সে তার নতুন মাকে মেনে নেয়নি। মেনে নেওয়া না নেওয়া সব তার ব্যাপার। আমি আর কারোর পায়ে তেল মাখাতে যাব না। আমি যা ভালো বুঝেছি, করেছি।
এরফান চুপ করে গেল।
ব্যাগ নিয়ে লাট্টু চলে গেল পাকা সড়কে। ধীরে ধীরে হাওয়া বইছিল, আর তাতেই উড়ে যাচ্ছিল রাস্তার দু-ধারের খড়কুটো, ধুলোবালি। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এখানকার রাস্তাঘাট। জায়গাটা মনে ধরেছে লাট্টুর। কৃষ্ণনগর থেকে আসার সময় হাটগাছায় গাড়িটা থেমেছিল একবারের জন্য। একটা হাঁস প্যাক প্যাক ডাকতে ডাকতে চাকার সামনে এসে গিয়েছিল। পাকা ড্রাইভার ছিল, ঘ্যাস করে ব্রেক কষে দাঁড়াল, নাহলে কি যে হত কে জানে। দোকানে বসে থাকা লোকগুলো ছুটে এসেছিল সামনে। ততক্ষণে হাঁসটা রাস্তা পেরিয়ে নেমে গেছে ডোবায়। অন্য কোথাও হলে গালাগালির বান ডাকত। এখানকার মানুষরা বড়ো আশ্চর্য, তারা টু শব্দটিও করল না। বরং ড্রাইভারকে সাবাসী দিয়ে বলল, তোমার জন্য হাঁসটা বেঁচে গেল ভাই। ড্রাইভার হতে গেলে চোখ-কান সতর্ক থাকা দরকার। তোমার দেখছি সব কিছু ঠিকঠাক আছে।
লাট্টু পথ চেনে না বাজারে যাওয়ার। একটা গোরুর গাড়ি কাচকোচ শব্দ তুলে যাচ্ছিল কদমতলার পাশ দিয়ে। গাড়োয়ানের গায়ে গামছা জড়ানো, তবু তার স্মৃতির যেন শেষ নেই, মেঠোয়ানিসুর থামিয়ে সে নতুন মানুষ দেখে তাকাল, বাজারে যাবে তো দেরি কেন আমার গাড়িতে চেপে বসো। আমি বাজার হয়ে কুলবেড়িয়া গাঁয়ে যাব। টালি নিয়ে ফিরতে হবে বুঝলে?
যেন কত দিনের চেনা এমন অমায়িক তার গলার স্বর।
লাট্টু গোরুর গাড়ির পেছনে গিয়ে বসল। আর মনে করার চেষ্টা করল জীবনে এর আগে সে গোরুর গাড়ি চড়েছে কি না! না, এই প্রথম গোরুর গাড়ি চড়ল সে। প্রথম গোরুর গাড়ি চড়ার আনন্দটা ফুটে উঠল তার চোখে-মুখে। খালি গায়ের গাড়োয়ান বলল, তা বাপু, কোথা থেকে আসা হয়েছে তোমার? এর আগে তো এ গাঁয়ে তোমাকে দেখিনি? তুমি বুঝি হাসপাতালে কাজ করো?
লাট্টু হা-করে শুনছিল প্রশ্নগুলো। লোকটা থামতেই সে বলল, আমরা ঠিকেদারের লোক। এ হাসপাতালে চুনকামের কাজ হবে। তাই আজই এসেছি সকালে। বাজার যাওয়ার পথ চিনি না। তোমার সাথে দেখা হল
-ওঃ, এই কথা। লোকটা গাল ভরিয়ে হাসল, গাঁয়ের পথ আর চেনা না চেনার কি আছে। আঁধার হলে গাঁয়ের পথে ভয় শুয়ে থাকে। তুমি তো দিনের বেলায় যাচ্ছে। তোমার আবার ভয় কি!
বাজার আসতেই লোকটা বলল, এইখানে নেমে পড়ো। আমি এখান থেকে চলে যাবো অন্য রাস্তায়। ঠিক আছে ভাই, চলি। তোমার সাথে আবার পরে দেখা হবে।
গোরুর গাড়িটা চলে যাবার পর পথের মাঝখানে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকল লাট্টু। সেই অর্থে জমজমাট বাজার যাকে বলে–এখানে তেমন কোনোকিছু নেই। দু-একটা দোকান চোখে পড়ল বটে তবে সেগুলো জৌলুষহীন। মিষ্টির দোকানটায় থরে থরে রসকদম্ব সাজান। দেখে লোভ হল লাট্টুর। এক এক জায়গার মিষ্টি ভালো। বিশেষ কোনো মিষ্টির কদর আছে। এখানকার সেই কদরওলা মিষ্টিটার কী নাম জানতে চাইল লাট্টু।
