বস্তিতে ঘর ভাড়া নিল এরফান। নুরিকে নিয়ে উঠল সে নতুন ঘরে।
খয়রা বিবি তার প্রতীক্ষায় থাকে। রাত ভোর হয়ে যায়। এরফান তবু আসে না। বাবলুর চোখে ঘুম আসে না। উত্তেজিত হয়ে সে তার মাকে বলে, এতবড়ো অন্যায় আমি সহ্য করব না, মা। তোমাকে যে কাঁদাবে তার চোখই আমি উপড়ে নেব।
-না বাপ, চুপ যা। খয়রা বিবি বোঝাত, তোর বাপের শরীরের বদ রক্ত যাবে কোথায়? কয়লা যতই ঘো ময়লা তার যায় নারে! ওকে ওর মতো সুখী হতে দে। আমি ঠিক তোর মা হয়ে বেঁচে থাকব।
পয়সা ছাড়া কি বাঁচা যায়? ভরণ-পোষণ আসবে কোথা থেকে? খয়রা বিবি খেয়ে থাকে, দু-বেলা উপোস দেয়–তবু মুখ ফুটিয়ে সে কারোর কাছে কিছু বলতে পারে না। সবার কাছে কি সব কথা বলা যায়? তবে বাবলু কি ভাবে সব বুঝে ফেলে। গলার রগ ফুলিয়ে বলে, ও যদি আমারে জন্ম না দিত কবে ওর গলা টিপে খতম করে দিতাম। শুধু বাপ বলে পার পেয়ে যাচ্ছে। তবে বেশিদিন এমন চলবে না। যেদিন আমার মাথায় খুন চড়ে যাবে–সেদিন কেউ আর পার। পাবে না।
ধোঁয়া ওঠা ভাত কলাই করা থালায় বেড়ে দিয়েছে লাট্টু। আজ আর তরকারি নেই, শুধু সেদ্ধ। এরকম তো প্রায় দিনই হয়।
খেতে বসে বাবলুর দিকে আড়চোখে তাকাল এরফান, ছেলের চোখে রাগ আছে কি না বোঝার চেষ্টা করল সে। বাবলু ঘাড় না তুলে খেয়ে যাচ্ছে। এরফানের মনে হল যেন খেপা ষাঁড়। সব তছনছ করে দেবে। ভয়ে ভাত আটকে গেল তার গলায়।
টিনের গ্লাসে জল ভরে এগিয়ে দিল লাট্টু, সাবধান করে বলল, এত তাড়াহুড়ো করার কি আছে, আজ তো আর কাজ হবে না! দেখে-শুনে খাও। শ্বাসনালীতে ভাত আটকে গেলে বিপদে পড়ে যাবে যে।
এরফান ঘামছিল কথা শুনে।
খেয়ে দেয়ে এঁটো থালা নিয়ে কলতলায় চলে গেল বাবলু। এরফান গলা উঁচিয়ে বলল, কলপাড়ে এঁটো ধুবি নে, বাবুরা রাগ করবে। বালতিটা নিয়ে যা। বালতিতে জল ভরে দূরে কোথাও ধুয়ে নে।
ভাতের গন্ধে দুটো কুকুর এসে হাজির হয়েছে কলতলায়। বাবলু কঠিন চোখে কুকুর দুটোর দিকে তাকাল। ওরা পিছু হটছিল। লাট্টু দুর থেকে বলল, খেদাস নে ওদের। অনেক ভাত বেঁচেছে, দিয়ে দেব।
রোজই কত ভাত বাঁচে। অথচ খয়রা বিবির দুটো ভাত জোটে না সময়মতো। কী কপাল করে এসেছে মেয়েমানুষটা!
বাবলুর চোখের কোণ চিকচিকিয়ে উঠল। মার জন্য ভেবে ভেবে তার নিজের জীবনটাই বুঝি শেষ হয়ে যাবে। ওই বুড়োটাকে দেখলে তার রক্তের ইবলিশ নড়ে চড়ে ওঠে।
বিকেলবেলায় রোদ মরে গেলে শান্ত হয়ে আসে চারপাশ। পাখির কিচিরমিচির ডাক শুনতে শুনতে উদাস হয়ে যায় মন। খাওয়া-দাওয়ার পর এরফান বস্তা বিছিয়ে গড়িয়ে নিয়েছে কিছু সময়। এমন যাযাবরের জীবন-যাপনে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে ক্রমশ। বাবলুকে নিয়ে তার চিন্তা। ছেলেটা রগচটা। সারাক্ষণ শ্রাবণের মেঘের মতো গুম ধরে আছে, যে কোনোসময় বৃষ্টি নামতে পারে। এখানে কিছুতেই সে কাজে আসতে চায়নি। খয়রা বিবির শরীর ভালো যাচ্ছে না। কৃষ্ণনগরে ডাক্তার দেখিয়েছে বহু। আসলে রোগ তার শরীরে না, মনে। সর্বক্ষণ পুড়ছে সে। নুরিকে সে মেনে নেবে কি ভাবে। মেয়ের বয়সী মেয়েটা তার প্রতিদ্বন্দ্বী। দুম করে যে কাণ্ড করল এরফান–তার কোনো ক্ষমা নেই। খবরটা শোনার পর প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি খয়রা বিবি। পরে খবরের সত্যতা যাচাই করে লাজে-ঘেন্নায় এ পৃথিবী থেকে সরে যেতে চেয়েছিল সে। শুধু বাবলুর জন্য পারেনি। বাবলুই তাকে মরতে দিল না। ছেলেটার জন্য বুঝি যমে তাকে নিচ্ছে না, নাহলে কবে কবরে চলে যেত সে।
এবারে বাবলু আসতে চায়নি এরফানের সাথে। কেন চায়নি তার কারণটা এরফান ভালো মতন জানে। বাবলু রাগ করে বলেছিল, আমি খিদিরপুর চলে যাব। ওখানে কাজের খোঁজ পেয়েছি। তোমার সাথে ঘুরে আমার কোনো ফায়দা নেই। হতবাক এরফান প্রথমে কিছু বলতে পারেনি, পরে ঘোর কাটিয়ে বলেছে, তুই চলে গেলে আমার ঠিকেদারী দলটার কি হবে? দলটা যে ভেঙে যাবে, বাপ!
–ভাত ছিটালে কাকের অভাব হবে না। বাবলু মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে চাপা রাগে।
–তোর মাকে কে দেখবে? সে তো রুগী মানুষ। এরফানের চোখে-মুখে চিন্তা প্রকট হল।
–যার দেখার সে যখন দেখল না তখন আল্লা দেখবে। বাবলুর প্রতিটা কথায় অভিমান মাখানো।
এরপরে এরফানের মুখে কোনো কথা বেরয় না। বাপ-ছেলের সম্পর্কটাকে সে নিজেই জবাই করে দিয়েছে। এর জন্যও বাবলুর কোনো দায় নেই, যত দোষ সব তার। বিয়ের বয়স হয়েছে ছেলেটার। একটা ভালো মেয়ে দেখে তার শাদীটা চুকিয়ে দিলেই সংসারে বাঁধা পড়ে যেত ছেলেটা। খয়রা বিবিও স্বস্তির শ্বাস নিয়ে বাঁচত। তা যখন হয়নি তখন আর কপাল ফাটিয়ে কি হবে?
এরফান যা করেছে তার জন্য সে অনুতপ্ত নয়। মানুষ মনের দাস। ইচ্ছে শক্তি তাকে চালিত করে। নুরিকে দেখে ভালো লেগে যাওয়াটাই কাল হল। মেয়েটার বয়সের কথা তখন মাথায় আসেনি। আর মেয়েটাও বয়স নিয়ে কোনো কথার ঢেউ তোলেনি। সত্যিই সে ভালোবেসেছে তাকে। ভালোবাসা বুঝি একেই বলে। প্রথম রাতের কথা মনে পড়ছে এরফানের। ভয়-সংকোচে জড়িয়ে গেছে তার শরীর। ফণা তোলার জো নেই। নুরিই রাতভর খেলালো তাকে। এক সময় হাঁপিয়ে গিয়ে বলেছিল, আমার কোনো ভুল হয়নি গো! তোমার বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখে আমার গতরে শিহরণ আসে। তুমি যে সে মানুষ নও, যাদুকর।
