সবুজ হাত তুলে ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টারটা দেখিয়ে দিল।
একজন মাঝবয়েসী, বছর পঞ্চাশের মানুষ একটা খাম হাতে এগিয়ে গেল ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টারের দিকে। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলে সে ফিরে এল মিনিট দশেকের মধ্যে। তার হাসি মুখ। পান খাওয়া দাঁত দেখিয়ে বলল, বাবলু, মাল নামা। ঘন্টা খানিকের মধ্যে গাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। তুই যদি কৃষ্ণনগর চলে যেতে চাস তো যেতে পারিস। কাল সকালে এলে হাজিরা ঠিক হয়ে যাবে।
বাবলু কোনো কিছু না বলে নিরুত্তর দাঁড়িয়ে থাকল। নতুন জায়গাটা যে তার ভালো লেগেছে-এটা তার বিস্মিত চোখ-মুখই বলে দিল।
.
৪০.
বয়স্ক লোকটার নাম এরফান।
বাবলু অনেকক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, না বাবা, আমি আর কৃষ্ণনগর যাব না। এখানে আসতে হবে বলে ভোর উঠেছি। শরীর ম্যাজম্যাজ করছে। একটু শুতে পারলে ভালো হত।
ক্লান্তি-অবসাদে চোখ বুজে আসতে চাইছে বাবলুর। তবু তার ছিমছাম চেহারা এক ঝলক সবার নজর কাড়বে। কত বয়স হবে বাবলুর? বড়োজোর উনিশ-কুড়ি। টাইট সাদা প্যান্টের সঙ্গে মাঞ্জা দেওয়া জামা পরেছে সে। গলায় রূপোর চেনে একটা তাবিজ।
এরফান বলল, যা, কল থেকে হাত-পা ধুয়ে আয়। চোখে-মুখে ভালো করে জল দিবি। লাট্টুকে বলছি ইট দিয়ে চুলা বানিয়ে ভাত বসাতে। আজ আর বাজারে যাব না। সঙ্গে যা এনেছি, তা সেদ্ধ দিয়ে দেব।
কালো রঙের রোগা ছিপছিপে লাট্টু দাঁড়িয়েছিল আদেশের অপেক্ষায়। ভাত রাঁধতে হবে শুনে সে আর দাঁড়াল না, হাসপাতালের দিকে চলে গেল থান ইটের জন্য। শুধু এই হাসপাতাল নয়, আরো অনেক হাসপাতালের কাজ সেরে তাদের এখানে আসা। এসে ভালোই করেছে। এখানে মাথা গোঁজার জন্য তাবু টাঙ্গাতে হবে না। সব শোনার পর ডাক্তারবাবু নিজেই বললেন, একটা কোয়ার্টার ফাঁকা পড়ে আছে, ওখানে আপাতত থাকতে পারো। কেউ এলে তখন কিন্তু চলে যেতে হবে।
খুশিতে ঘাড় নেড়েছিল এরফান। নাহলে এতক্ষণে তাবু টাঙ্গানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত। তাঁবু টাঙ্গাতে সময় বেশি লাগে না। তাবুতে থেকেও আরাম। তবে সাপখোপ ঝড়-ঝঞ্জার ভয় আছে। তাবু উড়ে গেলে মাথা বাঁচানো দায় হয়। নানা
অভিজ্ঞতার সাক্ষীবট এরফান।
লাট্টু ইট খুঁজে এনে চুলা বানিয়েছে জব্বর। বাবলু রান্নার বিরোধী। মুখ কাঁচুমাচু করে সে বলল, আজ হোটেলে খেয়ে নিলে হত না? তার কথা শুনে পান খাওয়া দাঁত দেখিয়ে হেসে উঠল এরফান, এখানে পাউরুটি পাওয়া যায় না আর ভাত পাওয়া যাবে। রাত আটটার পরে ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায় বাজারের। বাইরের লোক আসে না বললেই চলে। বাইরের লোক ছাড়া ভাতের হোটেল চলবে কি করে? গাঁয়ের মানুষ তো সখ করে হোটেলে খেতে যাবে না। তারা পয়সা চেনে। টাকাকে ভালোবাসে।
বাবার কথা শুনে বেশ অবাক হল বাবলু। এখানে আসার আগে সব খোঁজখবর নিয়ে এসেছে মানুষটা। নাহলে সঙ্গে করে আলু চাল পেঁয়াজ কেউ বয়ে আনে।
কাঠ ফাড়িয়ে জ্বাল দিচ্ছে লাট্টু। বড়ো হাঁড়িতে ভাত ফুটছে চড়বড়িয়ে। সেই ফুটন্ত ভাতের দিকে তাকিয়ে বড়ো আনমনা হয়ে গেল এরফান। ঘরে নতুন বউ নুরিকে রেখে এসেছে। সারা রাত ধরে নুরি কত অনুনয়, বিনয় করল তার বুড়ো শরীর আঁকড়ে। যতটুকু পেরেছে নুরিকে সুখ দেবার চেষ্টা করেছে এরফান। নুরি কাতর হয়ে বলেছে, কিরে কেটে বলল, তুমি ঐ বুড়ি ধেমড়িটার কাছে যাবে না।
এরফানের মুখে কুলুপ আঁটা।
নুরি সুর করে বলেছে, যা টাকা-পয়সা সব আমাকে দেবে। আমি টাকা জমিয়ে একটা সোন্দর পারা কোঠা দালান বানাব। ওটা হবে তোমার আমার তাজমহল।
এরফানও স্বপ্ন দেখেছে–তাকে কিছু করতে হবে। খয়রা বিবি বছরের মধ্যে ছমাস তো রোগে ভোগে। শরীরও টসকে গেছে বহুদিন আগে। এখন কাছে এসে বসলে বয়সের ছায়ায় বুড়ি দেখায়। সেই আগের মতো গালে আর টোল পড়ে না, চোখে আর বিদ্যৎ খেলে না। এখন সে ভাটার নদী। কিছু নেই, শুধু চ্যাটচেটে কাদা। এরফান কেন যাবে তার কাছে। মৌচাকে মধু না থাকলে মৌমাছি কি সেখানে আশ্রয় নেয়?
ফোঁটা ভাতের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে ধরল এরফান। রাজমিস্ত্রির কাজে শরীর ক্ষয় হয় সাত তাড়াতাড়ি। সা শদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয় তাকে। বাবলুও রাজমিস্ত্রির কাজটা শিখে নিয়েছে। ওর হাতের কার্নিক যাদুকাঠির মতো নড়ে। আর কি নিখুঁত কাজ। এরফান জানে-খয়রা বিবির ছেলের কোনোদিন ভাত কাপড়ের অভাব হবে না। যেখানে যাবে কাজের গুণে বিশ্বজয় করে ফিরবে।
ছেলের জন্য মনে মনে গর্ব অনুভব করে এরফান। তবে সে বাবলুর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে না। গলা বুজে আসে। এই বয়সে শাদী করে কাজটা ভালো করেনি এরফান। লাট্টু বুঝিয়েছিল অনেক। কাকুতি-মিনতি করে বলেছিল, বড়ভাই, ও ভুল করো না। ঘরে তোমার সোমত্ত ছেলে। নিজে না বিয়ে করে তার বিয়ে দাও। লোক হাসিয়ে কি লাভ হবে বলো তো!
লাট্টুর কথা কানে তোলেনি এরফান। তার তখন বুড়ো গাঙে ছলাৎছলাৎ ঢেউ। নুরী রোজ হাসপাতালের চাপাকলে জল নিতে আসত। এরফান কলপাড়ে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলত তার সঙ্গে। অভাবী নুরির টাকার ভীষণ দরকার। মুঠো মুঠো টাকা ছড়িয়ে নায়ক হয়ে গেল এরফান। একদিন ঝোঁকের মাথায় নিকেও করে ফেলল।
নতুন বউ থাকবে কোথায়? পুরনো ঘরে তাকে মানায় না। এরফানও চাইল না নুরি খয়রা বিবির সঙ্গে থাকুক। এক সাথে থাকলে ঝামেলার শেষ নেই। রাতদিন চুলোচুলি লেগে থাকবে। তার চেয়ে আলাদা থাকা ভালো।
