শুভ আক্ষেপের সঙ্গে বলল, দূর, বাঘাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সেদিন বাঘার কিছু করার ছিল না। ভাব তো খরগোসের পায়ে কতো ছুট। কুকুর কি খরগোসের সঙ্গে দৌড়ে জিতেছে কোনোদিন?
ছোট্ট কপালে ভাঁজ পড়ল সবুজের, সে যাই হোক, এবার কিন্তু জবরদস্ত ফিস্ট করতে হবে। শীত পড়েছে। এবার আর ছাড়াছাড়ি নয়। অতসীপিসিকে আগে থেকে বলে রাখতে হবে। না হলে সব গণ্ডগোল হয়ে যাবে।
শুভ বলল, শুনেছি পিসি এবার ডিসেম্বর মাসে দেশ-বাড়িতে যাবে। বাঘা তখন আমাদের বাড়িতে থাকবে। মা তার জন্য ভাত বেঁধে দেবে। পিসি চাল আর নগদ টাকা দিয়ে যাবে মাকে।
মন খারাপ হয়ে গেল সবুজের।
শুভ বলল, ফিস্ট নিয়ে আগাম ভেবে লাভ নেই। এখনও অনেক দেরি আছে। বড়োরা সবাই এক না হলে ফিস্ট হবে কী করে। তার চেয়ে বরং একটা কাজ করি। আমরা ছোটরা মিলে একটা বনভোজন করি। বেশি দূরে যাব না, হাসপাতালের মাঠেই করব। দরকার হলে মাকে বলব বেঁধে দিতে।
-তার আর দরকার হবে না। সবুজ বড়োদের সান্নিধ্য এড়িয়ে যেতে চাইল, ডাক্তারবাবুর মেয়ে মাধুরী আছে। শুনেছি ও ভালো রাঁধতে পারে। চল, মাধুরীকে গিয়ে সব বলি। ও যা মেয়ে, রাজি হয়ে যাবে।
উঠল বাই তো কটক যাই।
সবার আগে সবুজ, পেছনে শুভ। ওদের গন্তব্য বদলে গিয়েছে।
মাধুরীকে গিয়ে বলতেই রাজি হয়ে গেল সে।
সবুজ বাহবা নেবার জন্য বলল, আমি জানতাম ও রাজি হয়ে যাবে। এবার তাহলে বনভোজনের আয়োজন করা যাক কি বলিস?
শুভ ঘাড় নাড়ল।
বেলা বাড়ছে। এবার ঘরে ফিরে গিয়ে বই খাতা নিয়ে পড়তে বসা দরকার। না হলে মা রাগারাগি করবে, পাড়া মাথায় তুলে চেঁচাবে। সরস্বতীর বাজখাই গলা বিখ্যাত। সবাই জেনে গিয়েছে। সবুজের এসব চিন্তা নেই। ওর বাবা ভোরের বাসে চলে গিয়েছে দেবগ্রাম। দুপুরের আগে ফিরবে না। ফলে দুপুর পর্যন্ত সে রাজা। তাকে কেউ শাসন করার নেই। সে টো-টো করে ঘুরবে। খুব বেশি হলে সাইকেল নিয়ে একবার বাজার থেকে ঘুরে আসবে।
সরস্বতী সবুজের এই লাগাম ছাড়া ঘুরে বেড়ানোর স্বভাবটাকে পছন্দ করে না। তার মতে পড়ার সময় পড়ো। খেলার সময় খেলো। পড়া নষ্ট করে খেলে বেড়ান তার পছন্দ নয়। কিচেনের কাছে রোদ্দুর ঝকঝক করে হাসছে। শেয়ালকাঁটা গাছে হলুদ রঙের ফুল ফুটেছে। ভারী চমৎকার দেখতে ফুলগুলো। অথচ ঐ ফুলগুলোর দিকে কেউ তাকায় না। শুভ উঁচু হয়ে বসল দেড় হাত মাপের কাঁটাওলা গাছটার সামনে। সবুজ দুর থেকে চিৎকার করে বলল, খবরদার, হাত দিসনে। যা সরু সরু কাঁটা, ঢুকে গেলে একেবারে রক্তে চলে যাবে। তখন মরবি।
ভয় পেলেও অতি সাবধানে খানচারেক ফুল তুলল শুভ। সে জানে, এই ফুল ঠাকুর পুজোয় দেওয়া যাবে না। কেন যাবে না, তার কারণ সে জানে না। সবুজকে প্রশ্ন করতেই সে-ও না-সূচক ঘাড় নাড়ল।
হাসপাতালের এই কিচেনটা’ শুভ আর সবুজের কাছে সপ্তম আশ্চর্যের একটা। এখানকার ছাইটিপির উপর থেকে সে একটা বেড়ালছানা ধরে নিয়ে গিয়েছিল ঘরে। সরস্বতী বেড়ালছানাটাকে দেখে সাথে সাথে বিদায় করেছে তাকে। মায়ের চোখে এত ঘেন্না ভালো লাগেনি শুভর। বেড়ালছানা তো কোনো দোষ করেনি তবু তার কেন ঘরে জায়গা হবে না? শুধু সরস্বতী নয় অবনীও এ নিয়ে তার পক্ষে একটাও সাওয়াল-জবাব করে নি।
মনের দুঃখে সেই বেড়ালছানাটাকে আবার কিচেন-এ রেখে এসেছিল শুভ। সবুজ তাকে জ্ঞান দিয়ে বলল, বেড়াল থেকে ডিপথেরিয়া রোগের সৃষ্টি হয়। বেড়ালের লালা আর লোম পেটে গেলে মানুষের ভীষণ ক্ষতি হয়।
সবুজ এ বয়সে অনেক কিছু জানে যা শুভ জানে না। এর জন্য মন খারাপ হয়ে যায় তার। ব্যস্ত হয়ে বলে, আজ কপালে দুঃখ আছে। মাকে তো জানিস কেমন বদরাগী। পড়তে না বসলে শুধু আমাকে নয়, বাবাকেও বকে।
সবুজ মজা পেরে হা-হা করে হেসে উঠল। আর ঠিক তখনই একটা ম্যাটাডোর হর্ন বাজাতে বাজাতে ঢুকে এল হাসপাতালের মাঠে। দূর থেকে ওরা দেখল সেই চার চাকার ছোট-লরিটার মধ্যে পেল বাঁশ আরও কত কি যে আছে।
শুভ উৎফুল্ল হয়ে বলল, মনে হচ্ছে গ্রামে সার্কাস এসেছে। দারুণ মজা হবে তাই না? সবুজ ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল তাকে, সার্কাস যদি আসবে তত বাস-স্ট্যান্ডের মাঠে প্রথমে যাবে। এখানে কেন আসবে? এটা তো হাসপাতাল।
ঘাড় চুলকে শুভ বলল, কেউ হয়ত অসুস্থ হয়েছে–সেইজন্য। চল, আমরা কাছে গিয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে আসি। ভাব জমাতে পারলে পরে আমাদের লাভ হবে।
সবুজ আর শুভ পাশাপাশি ছুটছে। ওদের আর আনন্দ যেন ধরে না।
গাড়িটার কাছে এসে থমকে দাঁড়াল শুভ। ততক্ষণে ড্রাইভার সিট থেকে নেমে পড়েছে বছর পঁচিশের একজন যুবক। সবুজ তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গলা ঝেড়ে নিয়ে শুধোল, এটা কি সার্কাসের গাড়ি?
যুবকটি থতমত খাওয়া চোখে তাকাল, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে হা-হা হাসিতে গলা ভরিয়ে বলল, এ গ্রামে মনে হয় বহুদিন সার্কাসের দল আসেনি?
ঘাড় নাড়ল সবুজ।
যুবক ড্রাইভার বলল, আমরা এই হাসপাতালে কাজ করতে এসেছি। আমরা কনট্রাক্টরের লোক। হাসপাতাল, কোয়ার্টার সব চুনকাম করা হবে। সেই সঙ্গে ছোটোমোটো সিমেন্টের কাজও করব আমরা। কথা থামিয়ে ঢোঁক গিলল ছোকরা-ড্রাইভার, আচ্ছা,খোকা, ডাক্তারবাবুকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে? ওর পারমিশন ছাড়া তো মালপত্তর আমরা নামতে পারি না।
