মায়ের কথাগুলো এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে শুভ। সাত- সকালে পড়ার কথা শুনতে কার ভালো লাগে? এখন বাঁধের ধারের মাঠগুলোয় ছোলার গাছ ভর্তি। এ সময় ফল আসে গাছগুলোয়। শিশিরে ভিজে কেমন আদুরে দেখায় ওদের। ফলগুলোকে ছুঁতেও মায়া হয়। তবু না ছুঁয়ে তো উপায় নেই। হোড়া-পোড়া করে খেতে হবে যে!
হোড়া পোড়ায় ছোলা সমেত গাছ তুলে এনে আগুনে ঝলসে নিতে হয়। এতে ফলগুলো সেদ্ধ হয়ে যায়, খেতে মিষ্টি লাগে-এটা এমন মিষ্টি যা কোনো দোকানে পাওয়া যাবে না। শুভ শুয়ে শুয়ে ভাবল।
আমগাছতলায় আগুন ধরিয়েছে কারা। শুকনো পাতা পুড়ছে পড়পড়িয়ে। আমের পাতাগুলোয় বুঝি তেল থাকে। সবুজ তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টিতে। শুভ গিয়ে একটা শুকনো পাতা ছুঁড়ে দিল সেই আগুনের উপর। খেজুরের ডাল ভেঙে উসকে দিল আগুন। যা শীত, উত্তাপের প্রয়োজন।
কাল বাঁধের ধার থেকে ছোলার গাছ তুলে এনেছিল সবুজ। রোজই আনে সে। ছোলার গাছ তুলে আনা মুখের কথা নয়। জমির মালিক দেখতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না। গালমন্দ করে ভূত ভাগিয়ে দেবে। এসবে সবুজের কোনো ভয় নেই। যা করতে হবে তা তো যেমন করেই হোক করতে হবে। ছোলার গাছগুলো সে না বলে নিয়ে এসেছে। বললে একদিন দেবে, রোজ রোজ তো আর দেবে না?
ধুঁয়োর মধ্যে ছোট-ছোট ফুলিঙ্গ উড়ছে আগুনের। সাত সকালে শীত হাওয়ার বুঝি দাপাদাপি খেলা চলছে। উত্তাপ পেতে আগুনের কাছাকাছি সরে বসল শুভ। ঘুমের ভাবটা এখন ছেড়ে গেছে শরীর থেকে। বেশিক্ষণ এখানে আর বসে থাকা যাবে না। সরস্বতী কোয়ার্টার থেকেই ডাক ছাড়বে পড়ার জন্য। সবাই শুনতে পাবে তার চিৎকার। শুভর বাজে লাগে এসব। এখন বড়ো হচ্ছে সে। এখন কি চামচে দুধ খাওয়ার সময়। তবু মা বুঝতে চায় না। চোখে চোখে রাখতে চায়।
হাত দুটো গনগনে আগুনের দিকে ঠেলে দিয়ে আবার গালের কাছে চেপে ধরল শুভ। বেশ আরাম লাগছিল এতে। হাতের তালুর উত্তাপ ছড়িয়ে যাচ্ছিল পুরো শরীরে। ছোলার সবুজ গাছটাকে চেনা যায় না এখন। আগুন ঝলসে দিয়েছে তার শরীর। সবুজতা হারিয়ে গিয়ে তার এখন পোড়া কালচে রঙ।
সবুজ শুভর চোখের দিকে তাকাল। আর বেশিক্ষণ ওরা আগুন পোহাবে না। ছোলার গাছগুলো ঝুলিয়ে নিয়ে ওরা চলে যাবে হাসপাতালের মাঠটায়। ওদিকটায় বেশ নির্জন। শুধু পাখির ডাক ছাড়া আর কিছু শব্দ কানে আসে না। ওখানে আরাম করে বসে ছোলার ফল ছাড়িয়ে খাবে। আধসেদ্ধ ফলগুলো খেতে তো মন্দ লাগে না। আমতলায় বড্ড বেশি ভিড়। এখানে দিতে দিতেই সব শেষ, নিজেদের জন্য কিছু থাকে না।
সবুজ খেজুরগাছের পাশ দিয়ে চলে এল মাঠটাতে। সবুজ ঘাসের উপর তখনও হীরে দানার মতো চকচক করছে শিশির কণা। সকালের রোদের সঙ্গে ওদের এত সখ্যতাকে জানত।
পড়ে থাকা বাবলা গাছের গুঁড়িটায় গিয়ে বসল শুভ। তার পাশে গিয়ে বসল সবুজ। তারপর স্বভাবসুলভ গলায় বলল, আমি আর ছোলর গাছ তুলতে যেতে পারব না। খেতের মালিকটা আমাকে চিনে গিয়েছে। কাল তত তাড়া করেছিল। অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। শুভ চুপ করে থাকল। ছোলার গাছ না পেলে হোড়া পোড়া’ আর হবে না। না হোক। তাতে কোনো ক্ষতি নেই। তবে কারোর ক্ষতি করে নিজেদের আনন্দ কেনা, এটা না-পছন্দ শুভর। সে এমনিতে চুপচাপ। সহজ সরল। ঝুঁকি নিতে ভয় পায়। আত্মসম্মান বোধ তার তীব্র।
সবুজ থমথমে পরিবেশকে সহজ করার জন্য বলল, খাচ্ছিস না কেন? কী হল তোর? শুভ সেঁক গিলে বলল, কাল শুধু আগুন পোহাব। কাল আর হোড়া পোড়া’ করে লাভ নেই।
তার মিনমিনে কথা শুনে হা-হা করে গলা ফাটিয়ে হেসে উঠল সবুজ, অত ভয় পেলে চলবে? হোড়া-পোড়া হবে না, এটা ভাবলি কি করে? আমি থাকলে সব হবে। ছোলার ফল ছাড়িয়ে খাচ্ছিল সবুজ, একটু ভেবে নিয়ে বলল, কাল অন্য খেত থেকে ছোলার গাছ তুলব। রোজ রোজ একই খেতে তুলতে গেলে ঝামেলা অনেক। সবার নজরে পড়ে যায়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সবারই ক্ষতি করা ভালো, এতে কারোর উপর চাপ পড়বে না।
পোড়ানো ছোলা খেয়ে ওরা যখন কোয়ার্টারে ফিরছিল তখন বাঁশ বাগানের খুপচি আঁধারে খেলা করছিল আলোর ঘোড়া। একটা ডাহুক পাঁচিল ঘেঁষে ছুটে পালাতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ডাহুকটা আবার উড়ে গেল কককিয়ে ডাকতে ডাকতে।
সবুজের হাত নিশপিশিয়ে উঠল, শুন্য চোখে তাকিয়ে সে বলল, হাতে গুলতি নেই, থাকলে মজা দেখিয়ে ছেড়ে দিতাম। জানিস শুভ অনেকদিন ডাহুকের মাংস খাইনি।
প্রায়ই পাখি শিকারে বেরয় ওরা। বাঁধের ধারের ঝোপঝাড়ে পাখির কোনো অভাব নেই। সেখানে কত যে নাম না জানা পাখি আছে দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায় ওদের। পাখি মারতে যাওয়া একটা নেশার মতো দাঁড়িয়ে গেছে ওদের। নিরীহ পাখিগুলো ওদের বুঝি চিনে গেছে। দূর থেকে দেখলেই ওরা উড়ে পালায়। হয়ত গা ঢাকা দেয় ঝোপঝাড়ে।
পাখি যেমন চালাক-চতুর, ওরাও কম যায় না পাখির চাইতে। রোজ রোজ একই ঝোপ-জঙ্গলে ঘোরাফেরা করে না শুভ। শিকারের জন্য মাঝেমধ্যে সব কিছু বদলে ফেলতে হয় ওদের। আজ চাপড়ার বিল তো, পরশু দোয়েমের চর।
হাতের ঝলকালি ঝেড়ে শুভ বলল, আজ স্কুল নেই। আজ কি শিকারে যাবি, সবুজ? সবুজ ভাবল, শিকারে যেতে এখন আর মন চায় না। সেদিন খরগোসটা মারতে গিয়েও পারলাম না! বাঘাটা বেইমানী করল, নাহলে ওটা জব্দ করতে পারতাম।
