আঁচলটা তর্জনীতে জড়াতে জড়াতে পাথরের মূর্তি হয়ে গেল সরস্বতী, গলার কাছে ঢেলার মতো জমতে থাকল কান্না। এসব দুঃখ ক্ষোভের কথা কাকে বলবে সে। কে শুনবে তার জ্বালা-যন্ত্রণার ইতিহাস। উপর দিকে থুতু ছুঁড়লে নিজের গায়ে পড়ে। তবু শরীর জুড়ে জোয়ার আসা কাঁপুনীকে প্রতিহত করতে চাইল সে। পরপুরুষের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়লে কী ভাববে লোকে? অবনী যে বিপথগামী হচ্ছিল তার আঁচ পেয়েছিল সে। পদ্মর স্বভাব ভালো নয়। সে তো টোপ দিয়ে মাছ ধরবে। তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। দাঁতে দাঁত টিপে সরস্বতী আগুন চোখে তাকাল। আজ একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক। সবাই দেখুক ভালো মানুষটার পরিণতি! আজ খুলে যাক মুখোশ…মানুষটাকে চিনুক সবাই।
হেঁটে নয়, একরকম দৌড়ে দাসপাড়ায় এল সরস্বতী। হাঁপাচ্ছিল সে। ভিতরটা কাঁপছিল রাগে। পদ্মকে দেখতে পেলে নখ বসিয়ে দেবে তার বুকে। পাপড়ি ছিঁড়ে উড়িয়ে দেবে বাতাসে। ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার করে দেবে তাকে। এতদূর স্পর্ধা স্বামী খেদানো বউটার? কলপাড়েই পদ্মর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল সরস্বতীর।
চোখে চোখ পড়তেই পদ্ম বলল, দিদি, তুমি!
–হ্যাঁ, আমি। সে কোথায়?
–কে? কার কথা বলছ?
–ন্যাকামী করো না। বলল, শুভর বাবা কোথায়?
-কে কোথায় যায় আসে আমাকে কি বলে যায়? পদ্মর মোটা ঠোঁটে চলকে উঠল পাতলা হাসি, ঘরের মানুষটাকে মদের ঠেক অব্দি পৌঁছে দিয়েছ, কাজটা ভালো করনি, দিদি। এর ফল তোমাকে ভুগতে হবে। আমাকে ভুল বুঝো না, তোমাকে জানিয়ে দিলাম।
পদ্ম যেন শিক্ষা দিতে চাইল সরস্বতীকে।
কিছুটা বিপর্যস্ত সরস্বতী নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, পুরুষমানুষকে তো আর আঁচলের চাবি গোছর মতো বেঁধে রাখা যায় না। ওরা খাঁচার পাখি নয়, বনের পাখি। যেখানে দানা পাবে সেখানে স্থিতু হবে।
তা হলে তোমার এত চিন্তা কিসের? পদ্ম ঝুঁকে পড়ল সরস্বতীর মুখের উপর। তার তাতা নিঃশ্বাস কাঁপিয়ে দিল সরস্বতীর চটকে যাওয়া কলিজাটাকে। কাঁদবে না ভেঙে পড়বে কিছুই বুঝতে পারল না সে। শুধু নিজের প্রতি চরম ক্ষোভে গাছের মতো নীরব হয়ে গেল সে। বেশ ঘাবড়ে গিয়ে সরস্বতী বলল, ও এলে ওকে আর মদ দেবে না।
কেন দেব না? খদ্দের আমার কাছে লক্ষ্মী। পদ্ম কঠিন চোখে তাকাল। তার সেই চাহনিতে মাথা নীচু হয়ে এল সরস্বতীর। তার গোছানো শরীরের উপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেল এমন বিধ্বস্ত দেখাল তাকে।
পদ্ম বুক নাচিয়ে বেপরওয়াভাবে বলল, মদ না বেচলে আমার দিন চলবে না। যে আসবে সেই আমার খদ্দের। বুঝলে? পদ্ম জল নিয়ে চলে যাচ্ছিল, কিছুটা গিয়ে পিছন ফিরে বলল, একটা কথা বলি দিদি যদি কিছু মনে না করো। তোমার ঘরের মানুষটা হল কাঁচা সোনা, তাকে যেমন খুশি গড়া যায়। সোনাকে কাদার তাল ভেবে দুরে ঠেলে দিলে একদিন ধুলো পথে বসে তোমাকে কাঁদতে হবে। সেদিন আমি কেন, কেউ তোমার চোখের জল মুছিয়ে দিতে আসবে না। আজ ইচ্ছে করলে আমি ওকে হারিয়ে দিতাম, কিংবা নিজেই হেরে বসে থাকতাম। শুধু তোমার মুখ চেয়ে আমি ও-পথে পা বাড়াই নি। এর পর যদি তোমার পাখি বুকের খাঁচায় না আটকে রাখতে পারো তাহলে কোনো অঘটন ঘটে গেলে আমাকে দোষ দিও না। তোমার রূপের দেমাগ আছে শুনেছি। রূপ দিয়ে অন্যকে পোড়াও। নিজেই যদি নিজের রূপের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাও তাহলে কেউ তোমাকে বাঁচাতে আসবে নি। এখনও সময় আছে চোখ জোড়া থেকে ঘেন্নার পাঁকমাটিগুলো সরিয়ে ফেল। নিজের মানুষকে নিজের করে কাছে টেনে নাও।
পদ্মর মুখের উপর কোনো কথা বলার ছিল না, শুধু বুকের ভেতরটা তছনছ হয়ে গেল সরস্বতীর। নিজেকে বদলে ফেলার সময় এসেছে তার, না হলে সে হেরে যাবে। পায়ের তলার মাটি সরে গেলে সে দাঁড়াবে কোথায়? মাটি হারানো মানুষের যে কোথাও জায়গা হয় না। মাতাল অবনীর হাত ধরতে আর ঘেন্না হল না তার।
অনেকদিন পরে গভীর রাতে তক্তপোষ থেকে নেমে এল সে। শুভ বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, কোনো সাড়া নেই।
সরস্বতী নিশূপ পায়ে অবনীর মাথার কাছে গিয়ে বসল। শরীর টানটান হয়ে আছে উত্তেজনায়। বাইরে হিম পড়ছে টুপটাপ। হিম নয় যেন ফুল ঝরে পড়ছে। ঝি-ঝি পোকার মিহি সুরে আজ এক অন্য উন্মাদনা। সরস্বতীর চোখের তারা কাঁপছিল নতুন বউয়ের মতন। বহু সংকোচে অবনীর খসখসে কপালে হাত রাখল। হয়ত জেগে ছিল অবনী। হঠাৎ সে চোখ মেলে তাকাল।
সরস্বতী অভিমান ভরা গলায় ফিসফিসিয়ে বলল, তুমি আমাকে এত বড়ো শাস্তি দিতে পারলে? তোমার হাত ধরে এতদূর এসেছি। এবার যমের দুয়ার অব্দি ঠিক পৌঁছে যাবো। আমাকে কেউ আটকে রাখতে পারবে না। ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বলল অবনী। কাঁপা হাতে সরস্বতীকে টেনে আনতে চাইল নিজের নিঃশ্বাসের আওতায়।
স্বর্ণলতার মতো বহুদিন পরে সরস্বতী নিজেকে ভেঙে ছড়িয়ে দিল বিছানায়।
একটা ভোরের জন্য মুখিয়ে ছিল শুভ। শীতকালটা তার কোনো সময়ে প্রিয় সময় নয়। এ সময় খসখস করে গায়ের চামড়া, খড়ি ফোটে শরীরের। সকালে ঘুম ভাঙলেও কাঁথার বাইরে বেরতে মন করে না। একটু রোদ উঠুক তারপর বিছানা ছেড়ে উঠবে সে। এই আলিস্যি তার চিরদিনের। সরস্বতী বলল, আর শুয়ে থাকিস নে। এবার চোখ-মুখ ধুয়ে পড়তে বস। যারা শুয়ে থাকে, তাদের ভাগ্যও শুয়ে থাকে।
